শীতের দিনে কাছাকাছি ঘুরে আসতে পারেন। কলকাতা থেকে ট্রেনে কিংবা গাড়িতে কোথা থেকে বেলাবেলি ঘুরে আসা যায়? ছবি: সংগৃহীত।
ঘুরে আসতে ইচ্ছা হয় অনেক সময়েই, কিন্তু ঘোরা হয় না? ছুটির দিনেও কাজের কমতি থাকে না। বরং সেই দিন ঘরদোর গুছোনো, এটা-ওটা করার ঝক্কি থাকে অনেক। তবে, চাইলে দৈনন্দিন কাজকর্ম গুছিয়ে বেলাবেলি ঘুরে আসতেই পারেন কলকাতার আশপাশের কয়েকটি জায়গা থেকে। গাড়ি থাকলে ভাল, না হলে সঙ্গী হতে পারে ট্রেন, টোটো, অটোই।
বুরুল
ঘুরে আসতে পারেন বুরুল থেকে। ছবি: এআই দ্বারা প্রণীত।
গঙ্গার পাড় এবং গ্রাম্য পরিবেশ— দুই একসঙ্গে উপভোগ্য হয়ে ওঠে বুরুলে এলে। নদীর সৌন্দর্য উপভোগের এক ঠিকানা হল দক্ষিণ ২৪ পরগনার বুরুল। শীতের মিঠেকড়া রোদে পিঠ দিয়ে, গঙ্গার ঠান্ডা হাওয়া গায়ে মেখে দিব্যি এখানে আড্ডা বসিয়ে দিতে পারেন। দেখার জন্য যে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে, তেমন নয়। বুরুল খানিকটা নিরালায় প্রকৃতি উপভোগের জন্য। এই জায়গায় লোকজন চড়ুইভাতি করেন। আবার অনেকে গঙ্গার তীরে রিসর্টে থেকে অবসরযাপনও করেন। বুরুল ফেরিঘাট থেকে যন্ত্রচালিত নৌকায় ৫৮ গেট ঘুরে আসতে পারেন। ৫৮ গেট থেকে টোটো বা অটো ধরে চলে যেতে পারেন বেলাড়ি রামকৃষ্ণ মিশনেও।
কী ভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ থেকে বজবজ লোকাল ধরুন। বজবজ স্টেশনে নেমে সেখান থেকে অটো বা টোটো করে বুরুল যাওয়া যায়। স্টেশন থেকে বুরুলের দূরত্ব প্রায় ১৯ কিমি। ধর্মতলা থেকে বাসে রায়পুর হয়েও এখানে আসা যায়। ব্যক্তিগত গাড়িতেও আসতে পারেন।
মঙ্গল পাণ্ডে পার্ক এবং গান্ধী মিউজ়িয়াম
ব্যারাকপুরে রয়েছে গান্ধী মিউজ়িয়াম। ছবি:সংগৃহীত।
দূর-দূরান্তে গিয়েছেন বহু বার। কাছেপিঠের শহরই হয়তো দেখা হয়ে ওঠেনি। এই শীতে এক বেলা সময় করে বেরিয়ে পড়ুন ব্যারাকপুর শহর ঘুরতে।১৮৫৭-য় ব্যারাকপুরের সেনাছাউনিতেই মহাবিদ্রোহের সূচনা ঘটিয়েছিলেন মঙ্গল পাণ্ডে। নদীর পারে রয়েছে তাঁর নামাঙ্কিত উদ্যান। গঙ্গার পাড়ে সাজানো গোছানো উদ্যানে রয়েছে মঙ্গল পাণ্ডের আবক্ষ মূর্তি। সেখান থেকে টোটো বা অটো করে ধোবি ঘাটের কাছে চলুন গান্ধী মিউজ়িয়াম। মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু-সহ একাধিক স্বাধীনতা সংগ্রামীর ছবি রয়েছে এখানে। প্রদর্শিত রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা নথিপত্রও। হাতে সময় থাকলে ঘুরে নেওয়া যায় গান্ধীঘাটও। এখানেই রয়েছে মহাত্মা গান্ধীর চিতাভস্ম। পাশেই রয়েছে সাজানো উদ্যান জওহর কুঞ্জ।
কী ভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরে ব্যারাকপুর স্টেশন। সেখান থেকে অটো বা টোটা করে দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে নিন।
সবুজ দ্বীপ
সবুজদ্বীপেও ঘুরে আসতে পারেন কোনও এক দিন। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
হুগলির বলাগড়ের সবুজ দ্বীপও হতে পারে শীতের দিনে ঘুরে আসার ঠিকানা। শীতের মরসুমে এখানে ভিড় জমান স্থানীয় মানুষ, আশপাশ থেকে পিকনিকের জন্য আসা লোকজন। হুগলি নদীর বুকে তৈরি হয়েছে একটি চর। গাছগাছালি ভরা সেই স্থানই সবুজ দ্বীপ নামে পরিচিত। পানকৌড়ির শিকার ধরা, গাছগাছালিতে পাখির উঁকিঝুকি দেখতে দেখতেই পৌঁছনো যায় সবুজ দ্বীপ। পায়ে হেঁটেই ঘুরে নিতে পারেন দ্বীপটি।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে কাটোয়া লাইনের ট্রেন ধরে নামতে হবে সোমরাবাজার স্টেশনে। সেখান থেকে টোটোয় ফেরিঘাট। তার পর ২০ মিনিট নৌকায় করে সবুজ দ্বীপ। কলকাতা থেকে দিল্লি রোড হয়ে বলাগড় বা সোমরাবাজার আসতে সময় লাগবে আড়াই ঘণ্টা। দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার।
চন্দননগর স্ট্র্যান্ড
চন্দননগর স্ট্র্যান্ডঘাটও থাকতে পারে ভ্রমণের তালিকায়। ছবি:সংগৃহীত।
‘ফরাসডাঙা’ বলে পরিচিত চন্দননগরের আলো আর জগদ্ধাত্রীপুজোর খ্যাতি জগৎজোড়া। তবে ভাগীরথী পাড়ের এই শহরে বছরভর আসা যায় এখানকার স্ট্র্যান্ডের টানে।ভাগীরথী অবশ্য লোকমুখে গঙ্গা। স্ট্র্যান্ড লাগোয়া ঘাটটি থামওয়ালা। বাঁধানো চত্বর। কোর্ট, ইনস্টিটিউট, কলেজ, স্কুল, মিউজ়িয়াম নিয়ে তার বিস্তৃতি। চওড়া রাস্তা, বাঁধানো ফুটপাত আর রকমারি খাবার— স্ট্র্যান্ডের নিজস্ব এক চরিত্র আছে।
এক সময় এই শহরেই আনাগোনা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-সহ অনেকের। ফুটপাথ ধরে হাঁটলে একদম শেষপ্রান্তে চোখে পড়বে পাতালবাড়ি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটির সর্বনিম্ন তলাটি ভাগীরথীতে নিমজ্জিত। স্ট্র্যান্ড ধরে পায়ে পায়ে হাঁটলে ডান পাশে চোখে পড়বে সেক্রেড হার্ট চার্চ। গথিক শৈলীতে তৈরি গির্জাটি বহু প্রাচীন। স্ট্র্যান্ডের গা ঘেঁষেই রয়েছে ফরাসি শাসক দুপ্লের নামাঙ্কিত মিউজ়িয়াম। দুপ্লে প্যালেস বলে সেটি পরিচিত। দুপ্লের ব্যবহৃত আসবাবের পাশাপাশি বহু অ্যান্টিক জিনিসের দেখা মিলবে এখানে। স্ট্র্যান্ড ধরে খানিক হাঁটলে পৌঁছবেন চন্দননগরের দুপ্লে কলেজে। সেখানেও তৈরি হয়েছে একটি মিউজ়িয়াম। এ ছাড়াও, শহরের আনাচ-কানাচে খুঁজে পাবেন আরও কিছু দর্শনীয় স্থান। শীতের একটি দিন বা একটি বেলা ঘোরার জন্য এই জায়গা কিন্তু বেশ।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া-ব্যান্ডেল শাখার মেন লাইনের ট্রেন ধরে নামুন চন্দননগর। স্টেশনের বাইরে থেকে অটো বা টোটো ধরে চলে যান স্ট্র্যান্ডে। ওই চত্বরেই সমস্ত দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
খড়দহের ২৬ শিব মন্দির
খড়দহে গঙ্গার পারেই রয়েছে ২৬ শিবমন্দির। নির্জন জায়গাটিও ভাল লাগবে। ছবি:সংগৃহীত।
কলকাতার উপকণ্ঠে প্রাচীন শহর খড়দহ। সেখানেই ভাগীরথীর পারে রয়েছে ২৬ শিব মন্দির। এক ঝলকে দেখলে কিছুটা কালনার ১০৮ শিব মন্দিরের মতো মনে হতেই পারে। বড় চত্বর জুড়ে সার দিয়ে মন্দির। টেরাকোটার মন্দিরের কিছু কাজ নষ্ট হয়ে গেলেও, এখনও রয়েছে কিছুটা।২১টি মন্দির আয়তক্ষেত্রের ছকে সাজানো হয়েছে। বাকি মন্দিরগুলি রাস্তা পার করে গঙ্গার দিকে মুখ করে নির্মিত। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ এই স্থানটি রক্ষণাবেক্ষণ করে।
এমনিতে গাছগাছালি ঘেরা জায়গাটি নির্জন। পাশেই গঙ্গার ঘাট।শোনা যায়, রামহরি বিশ্বাস নামে এক ধনী ব্যক্তি, কেউ বলেন জমিদার এই মন্দির নির্মাণ শুরু করিয়েছিলেন। তিনি ১২টি আটচালা শিব মন্দির তৈরি করান। পরে তাঁর ছেলেরা বাকি মন্দিরগুলি তৈরি করেন।
খড়দহের ২৬ শিব মন্দির থেকে হাঁটাপথেই পৌঁছে যেতে পারেন শ্যামসুন্দরের মন্দিরে। নাটমন্দিরের শেষ প্রান্ত থেকে মন্দিরটি দেখতে পালকির মতো। গর্ভগৃহে রুপোর সিংহাসনে রয়েছেন শ্রীশ্যামসুন্দর। হাতে মুরলী। প্রসন্ন গম্ভীর শান্ত মুখ। আয়ত চোখ। শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধিকাকে কলঙ্ক থেকে বাঁচাতে বৃন্দাবনে কালী রূপ ধারণ করেছিলেন। তাই দীপান্বিতা অমাবস্যায় শ্যামকে ‘শ্যামা’রূপে আরাধনা করা হয়। দোল এবং রাস উৎসবে খড়দহ যেন গুপ্ত বৃন্দাবন। এ ছাড়াও, ওই চত্বরেই রয়েছে আরও কয়েকটি মন্দির এবং রাসমঞ্চ। সেগুলি ঘুরে নিতে পারেন।
কী ভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ থেকে মেন লাইনের ট্রেন ধরে নামতে হবে খড়দহ। সেখান থেকে অটো বা টোটো বুক করে চলে যান ২৬ শিব মন্দির দেখতে। ডানলপ হয়েও সড়কপথে খড়দহ আসতে পারেন।