দার্জিলিং বা কালিম্পং নয়, উত্তরবঙ্গের ৫ পাহাড়ি গ্রাম মুগ্ধ করবে, কী ভাবে যাবেন। ছবি: সংগৃহীত।
উত্তরবঙ্গের পাহাড় মানেই চোখে ভেসে ওঠে দার্জিলিং, কালিম্পং বা কার্শিয়াং। কিন্তু এই পরিচিত পর্যটন কেন্দ্রগুলির আনাচকানাচে রয়েছে এমন কিছু অচেনা বা স্বল্প চেনা পাহাড়ি গ্রাম যেখানে গিয়ে কিছুদিন সময় কাটাতে পারলে দুশ্চিন্তা তো দূর হবেই, মনেও শান্তি পাবেন। বেশি দিনের প্রয়োজন নেই, ৪-৫ দিন ছুটি পেলেই পরিকল্পনা করে ফেলুন। কী ভাবে যাবেন, সেখানে গিয়ে কী কী দেখবেন, রইল খুঁটিনাটির খোঁজ।
রডোডেনড্রন ও এলাচের সুবাস মাখা ‘তোদে’
কালিম্পং জেলার ভারত-ভুটান সীমান্তের একটি ছোট্ট, শান্ত পাহাড়ি গ্রাম তোদে। পাহাড়ি নদী আর সবুজ উপত্যকায় ঘেরা গ্রামটি এখনও বহু পর্যটকের কাছেই অজানা। তোদেরই লাগোয়া টাংটা গ্রাম। ঘুরে আসতে পারেন সেখান থেকেও।
ছবির মতো তোদে গ্রাম।
কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি বা বিমানে বাগডোগরা পৌঁছোতে হবে। সেখান থেকে শিলিগুড়ি হয়ে মালবাজার বা চালসা হয়ে তোদে-র দূরত্ব প্রায় ৯০-৯৫ কিমি। গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি পৌঁছোনো যায়।
কী কী দেখবেন: তোদে এলাকাটি মূলত এলাচ চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানে গেলে এলাচ বাগিচা দেখতেই হবে, সঙ্গে জলপ্রপাত, পাহাড়ি নদী তো রয়েছেই। ১০০ বছরের পুরনো গির্জাও রয়েছে। ট্রেকিং প্রেমীদের খুবই পছন্দ হবে তোদে। এখান থেকে নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের গভীর জঙ্গলে ট্রেকিং করা যায়।
কোথায় থাকবেন: এখানে বিলাসবহুল হোটেল নেই। স্থানীয়দের আতিথেয়তা উপভোগ করার জন্য কিছু হোমস্টে রয়েছে। তবে যাওয়ার অনেক আগে থেকে বুক করে নেবেন।
পাইনের নিস্তব্ধতা ঘেরা দাওয়াইপানি
দার্জিলিং শহর থেকে মাত্র ১৫ কিমি দূরে অথচ সম্পূর্ণ কোলাহলমুক্ত এক গ্রাম হল দাওয়াইপানি। চারিদিকের পাইন ও ফার বনের নিস্তব্ধতা মন ভাল করতে বাধ্য। প্রায় ৬,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত গ্রামটি থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা খুব ভাল ভাবে উপভোগ করা যায়।
কী ভাবে যাবেন: হাওড়া কিংবা শিয়ালদহ থেকে দূরপাল্লার ট্রেন ধরে নিউ জলপাইগুড়ি যেতে হবে। এরপর এনজেপি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে জোড়বাংলো হয়ে দাওয়াইপানি পৌঁছোনো যায়। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। এনজেপি থেকে গাড়িতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগবে। কাছাকাছি বিমানবন্দর বাগডোগরা।
দাওয়াইপানি গ্রাম।
কী কী দেখবেন: দাওয়াইপানির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল, এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও দার্জিলিং শহরটা খুব ভাল ভাবে দেখা যায়। ঘন পাইন ও রডোডেনড্রন বনে ঘেরা এই গ্রামে রয়েছে বেশ কয়েকটি ট্রেকিং করার জায়গা।
কোথায় থাকবেন: দাওয়াইপানিতেও বিলাসবহুল হোটেল পাবেন না। হোমস্টে বুক করে নিতে হবে। সেগুলি এমন ভাবে বানানো যে ঘরে বসেই কাঞ্চনজঙ্ঘা উপভোগ করতে পারবেন।
সবুজ উপত্যকায় ঘেরা পাবং
কালিম্পংয়ের চিবো বা চড়খেড়ির কাছাকাছি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম পাবং। চাষের খেত আর পাহাড়ি ঢালে ঘেরা গ্রামটি শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে। নিরিবিলিতে সময় কাটানো বা বই পড়া যাঁদের পছন্দ অথবা অবসরে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে চান, তাঁরা ঘুরে আসতে পারেন এই পাহাড়ি গ্রাম থেকে। যাঁরা একদম নিরিবিলিতে বই পড়ে বা প্রকৃতি দেখে সময় কাটাতে চান, তাঁদের জন্য আদর্শ।
সবুজ উপত্যকায় ঘেরা পাবং
কী ভাবে যাবেন: এনজেপি বা বাগডোগরা থেকে কালিম্পং হয়ে যাওয়া যায়। অথবা তিস্তা বাজার দিয়ে সোজা পাবং যাওয়া যায়। এনজেপি থেকে দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিমি। গাড়ি করে ৩-৪ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
কী কী দেখবেন: পাবং গ্রামের মূল আকর্ষণ এর শান্ত পরিবেশ। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার রঙের পরিবর্তন দেখার মতো। কাছেই চারখোল বা লোলেগাঁও ঘুরে আসা যায়। নেওয়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যান, লাভা মনাস্ট্রি বেশি দূরে নয়।
কোথায় থাকবেন: বড় হোটেল বা রিসর্টের ভিড় নেই। কয়েকটি ছোট হোমস্টে রয়েছে। এখানকার পাহাড়ি রান্নার স্বাদ পর্যটকদের মুগ্ধ করবেই।
মেঘের বাড়ি ইচ্ছেগাঁও
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৮০০ ফুট উঁচুতে ইচ্ছেগাঁও পাইন, বার্চ আর জুনিপার গাছে ঘেরা। মাঝেমধ্যেই গোটা গ্রাম ঢেকে যায় পেঁজা তুলোর মতো মেঘে। তাই ইচ্ছেগাঁওকে বলে মেঘের বাড়ি।
কী ভাবে যাবেন: হাওড়া কিংবা শিয়ালদহ থেকে দূরপাল্লার ট্রেন ধরে নিউ জলপাইগুড়ি যেতে হবে। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে সোজা কালিম্পং। পথে আলগাড়া হয়ে ইচ্ছেগাঁও পৌঁছোনো যায়। এনজেপি থেকে দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিমি।
মন ভাল করে দেবে ইচ্ছেগাঁও।
কী কী দেখবেন: এই গ্রামের পূর্ব দিকে রয়েছে সিলারিগাঁও। উঁচু উঁচু পাইনের বন আর নানা রকম পাখি দেখতে সেখানে যেতে পারেন। রঙিম অর্কিডে ঘেরা গ্রামটিতে ট্রেক করার অনেক জায়গাও রয়েছে।
কোথায় থাকবেন: পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু আধুনিক সুবিধাযুক্ত কাঠের তৈরি ইকো-হোমস্টে রয়েছে এখানে।
জলপ্রপাত ও চা বাগানে ঘেরা রংবুল
দার্জিলিং জেলার সোনাদার কাছাকাছি অবস্থিত একটি ছোট্ট, নিভৃত পাহাড়ি উপত্যকা রংবুল। চারদিকের সবুজ চা বাগান, মেঘ-কুয়াশায় মেশামিশি মন ভাল করে দেবে।
কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে সেখান থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পাহাড়ি পথ ধরে সোনাদা পৌঁছোতে হবে। সোনাদা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই রংবুল। এনজেপি থেকে দূরত্ব প্রায় ৬০ কিমি। গাড়িতে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগবে।
চা বাগানে ঘেরা রংবুল
কী কী দেখবেন: এখানকার মূল আকর্ষণ হল ঘন জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে থাকা 'রংবুল জলপ্রপাত' বা ‘রেনবো ফলস’। ঝর্না দেখে পথ উজিয়ে যেতে পারেন ‘সানসেট পয়েন্ট’। পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখতে পারেন চারপাশের চা বাগান। চাইলে ইন্দ্রাণী ফলস পর্যন্ত ট্রেকিং করতে পারেন। আশপাশের জঙ্গলে নানা প্রজাতির পাখি দেখে সময় কাটাতে পারেন।এখান থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরেই টাইগার হিল। পরদিন ভোর ভোর উঠে সূর্যোদয় দেখতে যেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য নানা রকম ইকো-রিসর্ট এবং কাঠের হোমস্টে রয়েছে, যেখান থেকে পাহাড়ি প্রকৃতির রূপ খুব সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়।