সোনালি বালুতট-মায়াবী সূর্যাস্ত-পর্বতমালার হরিয়ালি, ডাকছে কোঙ্কন

তারকারলি সৈকতে আকাশ-পথে অ্যাডভেঞ্চার।

আরবসাগরের নীল কোলাহল, নারকেল-পাম-ক্যাসুরিনার ঝুঁকে পড়া আবডালের বিস্তীর্ণ সোনালি অথবা কোথাও রূপোলি বালুতট, কোথাও সয়ম্ভু দেবস্থান তো কোথাও বীরাসৎ স্থল— পেল্লায় সব দুর্গ, অপরূপ কারিকুরি গুহাচিত্রাবলী ও গুহাস্থাপত্য। সহাদ্রী পর্বতমালার অপূর্ব হরিয়ালি অথবা মখমলি সবুজ উপত্যকা। তুখোড় কিছু জঙ্গল ও অভয়ারণ্য তো কোথাও শুধুই পরিযায়ী ও অন্য পাখপাখালির হট্টমেলা, মৌসুমী বায়ুর আনুকূল্যে বছরের প্রায় পাঁচ মাস মায়াময় বৃষ্টিদিন। আরও রয়েছে বড় শহরগুলিতে ঝাঁ চকচকে শপিং মল, মসৃণ পথঘাট, হাইরাইজ টাওয়ার ও অত্যাধুনিক আলিশান ডাকাবুকো ভাব। মহারাষ্ট্রের নাগরিক জীবন প্রাঞ্জল প্রকৃতিকেও কোথাও কোথাও নিজের জায়গাও ছেড়ে দিয়েছে। মরাঠা ঐতিহ্য-বীর শিবাজি, পেশোয়া গৌরবগাথা, সব কিছু নিয়েই মহারাষ্ট্র।

মহারাষ্ট্রে পর্যটনস্থল প্রচুর, তবে মাত্র একযাত্রায় সব দ্রষ্টব্য ঘুরে দেখে নেওয়া অসম্ভব। সমগ্র মহারাষ্ট্রে ভ্রমণ পরিকল্পনাকে মোটামুটি দু’টি পর্যায়ে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে আট থেকে দশ দিন হাতে সময় নিয়ে ঘুরে দেখা যেতে পারে মহারাষ্ট্রের রত্নগর্ভা কোঙ্কন উপকূল।

 

গণপতিপুলে

কোঙ্কন উপকূল রত্নগিরি জেলায় অথৈ সাগরজলের মাথায় রুপোলি রোদ্দুরের চিক্কন ও ঢেউ ভাঙার প্রতিশ্রুতি নিয়ে গণপতিপুলে। শতাব্দীপ্রাচীন ‘স্বয়ম্ভু’ গণপতি থেকে এসেছে স্থানটির নাম। মরাঠি শব্দ ‘পুলে’ মানে বেলাভূমি। গণপতিমন্দির ঘিরেই ছোট্ট গ্রাম। অষ্ট গণপতির অন্যতম ‘পশ্চিমদ্বারমুখী দেবতা’। ভক্তদের ভিড়ে সদাব্যস্ত মন্দির প্রাঙ্গণ। ভোর ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে মন্দির। মাঘ শুক্লা চতুর্থীতে ‘গৌরী গণপতি’ ও গণেশজয়ন্তীতে এখানকার ‘অঙ্গার-কে-চতুর্থী’ উৎসব দেখার মতো।

দিগন্তের গায়ে ঠেস দিয়ে সামান্য বাঁক খেয়েছে অতল সাগর। সাগরকুলে মন্দির। সৈকতের কয়েক ধাপ উপরে শৌখিন কেনাকাটির দোকান, শান্তশ্রী মন্দির। এখানকার মিহি বালির সৈকত সমুদ্রস্নানের আদর্শ। পর্যটকদের জন্য রকমারি বিনোদনী রাইডের ব্যবস্থা মজুত। চাঁদোয়া লাগানো এক্কাগাড়ি, রঙিন আচ্ছাদন পিঠে উঠে ঘুরিয়ে আনবে সাগরকে পাশে নিয়ে বালিয়াড়ি ধরে খানিকটা পথ। বিকেলের কনে দেখা আলোয় গণপতিপুলের লাবণ্য অন্যমাত্রায়। সূর্যাস্তের অনেকখানি ঘন কমলা ঝুঁকে থাকে সাগর ও সৈকতে। চমৎকার বিকেল অনেকটা সময় জুড়ে অপরূপ হয়ে ওঠে গণপতিপুলে গোধূলি রঙে।

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে মুম্বই। যেখান থেকে কাঞ্চনকন্যা, মান্ডবী, জনশতাব্দী, মৎস্যগন্ধা, নেত্রবতী, মারগাঁও ডবলডেকার, মঙ্গালরু জংশন এক্সপ্রেস-সহ প্রচুর ট্রেন রত্নগিরি ছুঁয়ে যাচ্ছে। রত্নগিরি স্টেশন থেকে গণপতিপুলে ৫০ কিমি। মুম্বই থেকে সড়কপথেও ৩৭৫ কিমি দূরত্বে গণপতিপুলে পৌঁছনো যায়।

হাতছানি দিয়ে ডাকছে নীল সমুদ্র

কোথায় থাকবেন

সেরা ঠিকানা মহারাষ্ট্র পর্যটনের হলিডে রিসর্ট। সি-ভিউ কোঙ্কনী কটেজ ও  নানা ধাঁচের বহু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর আছে। ব্যবস্থাপনাও ভাল। চেক ইন সকাল সাড়ে ১০টা। চেক আউট সকাল ৯টা। পিক সিজন ১ ডিসেম্বর-৩০ জুন ও মধ্য সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর। অফ সিজনে ঘরভাড়ার তারতম্য হয়।

বুকিং যোগাযোগ: ganapatipulemtdc@maharashtratourism.gov.in

ফোন: ০২৩৫৭-২৩৫২৪৮/২৩৫০৬১/৬২

গণপতিপুলে মন্দির কমিটির অতিথিশালা ছাড়াও বহু হোটেল রিসর্ট আছে।

খাওয়াদাওয়া: কোঙ্কনী থালির স্বাদ নেওয়া যেতে পারে। সমুদ্রের টাটকা চিংড়ির পদও লোভনীয়।

কী দেখবেন

অনুমোদিত ট্যুর প্রোগ্রামে ঘুরে আসা যায় কাছেপিঠে প্রাচীন কোঙ্কন মিউজিয়াম, মরাঠা কবি কেশবমুতের জন্মভিটে, শিবাজী নির্মিত ১৭ শতকের জয়গড় দুর্গ, ক্রাফ্ট হাউজ, মৎস্যালয়, বাতিঘর, কাহ্নটেশ্বর মন্দির, জয়গড় বন্দর, লক্ষ্মী-কেশব মন্দির, রত্নগিরি, পাওসমন্দির, আরে-ওয়ারে টুইন বিচ।

কেনাকাটা: বিভিন্ন ধাতু ও পাথরখোদাই গণেশ মূর্তি, মন্দিরের রেপ্লিকা, শুকনো প্রসাদ, প্রার্থনা মন্ত্রের সিডি ও পুস্তিকা সব মন্দির চত্বরেই পাওয়া যায়।

 

রত্নগিরি

 

কোঙ্কণ উপকূলের ঐতিহাসিক তথা প্রাচীন বন্দরনগরী রত্নগিরি, পূর্বে সহ্যাদ্রী, পশ্চিমে অতলান্ত আরবসাগর। দুইয়ের মাঝে বিস্তীর্ণ এলাকা, অশ্বক্ষুরাকৃতি গঠনের রত্নগড় দুর্গটি নির্মিত হয় ১৬৭০-এ বাহমনি শাসনকালে। প্রবেশমূল্য নেই। দুর্গটির দু’টি ভাগ, বালেকিল্লা ও পেঠ কিল্লা। কেল্লার উপর প্রাচীন অষ্টভুজা ভগবতী মন্দির। দুর্গটি থেকে ৩৬০ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্ব পর্যন্ত প্রখর সাগর নজরে আসে। অদূরেই ১৮৬৭-তে নির্মিত নজরমিনার, স্থানীয় ভাষায় সিদ্ধাবুরুজ। রত্নগিরির সেরা জাতের ‘হাপুস’ তথা আলফানসো আমের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কোঙ্কণকে জানতে হলে, শিল্প-কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ইতিহাস-জনজীবন উপলব্ধিতে রত্নগিরি আদর্শ।

কী ভাবে যাবেন

কোঙ্কণ রেলসফরে মুম্বই থেকে রত্নগিরি, পাহাড় চেরা অগণিত সুড়ঙ্গপথে যখন ঝমঝম করে ট্রেনটি পার হয়, অদ্ভুত শিহরন লাগবে পর্যটক মনে। শতাধিক সুড়ঙ্গ এই রেলপথে।

কী দেখবেন

রত্নগিরি ভ্রমণ শুরু হোক রত্নগড় দুর্গ থেকে। দুর্গের উপর থেকে মিরকরওয়ারা সৈকত, ব্ল্যাক বিচ, হোয়াইট বিচ, ভগবতী মন্দির, সিদ্ধা বুরুজ, বন্দর দেখা যায়। মহারাষ্ট্রের জনপ্রিয় স্বরূপানন্দের সমাধি আশ্রম পাওস গ্রাম। ভাট্টে সৈকত, সারে-ওয়ারে টুইন বিচ, পতিতপাবন মন্দির, যোগেশ্বর মন্দির, তিলক স্মারক সংগ্রহশালা ও জন্মভিটে, গেটওয়ে অব রত্নগিরি তোরণ ও থিবা প্রাসাদ যেটি এখন প্রাদেশিক পুরাতত্ত্ব ও বস্তুসংগ্রহশালা। সম্পূর্ণ বর্মা স্থাপত্যে নির্মিত দ্বিতল রাজকীয় প্রাসাদ দেখার মতো। আর আছে মেরিন বায়োলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টার।

কেনাকাটা

অবশ্যই আলফানসো আমের পেটি। এ ছাড়া ‘অম্বাপোলি’ বা আমসত্ব, আমরস, কাজু, দারুচিনি, লবঙ্গ ও গোলমরিচ।

 

তারকারলি সৈকত

কোঙ্কণ উপকূলের চমৎকার প্রাকৃতিক জৌলুসে তারকারলি সৈকত। শান্তশ্রী অপাপবিদ্ধা রুপো ঝরা বালির উঠোন ও নীলাভ স্বচ্ছ জলরাশির গভীর সখ্য তারকাবালির প্রীত সৈকতে। নব্য পর্যটকরা ডাকেন ‘The Queen of beaches’। সৈকতের অদূরেই ঘন নীল কারলি নদী। সে নদীতটের দুই তীরে জমাট নারকেলবীথি ও কোঙ্কণ বসতি। অপর আকর্ষণ প্রকৃতি ও ইতিহাসের অসাধারণ যোগসাজশ শিবাজি নির্মিত বলিষ্ঠ ঋজুতায় গড়া সিন্ধুদুর্গ।

এই পথে এগিয়ে গেলেই সামনে ডাকছে তারকারলির মায়াবী সৈকত

কী ভাবে যাবেন

প্রথমে মুম্বই। সেখান থেকে কোঙ্কণকন্যা, মান্ডবী, মৎস্যগন্ধা এক্সপ্রেসে কুড়াল স্টেশন। কুড়াল থেকে অটো বা গাড়িতে তারকারলি ৩৫ কিমি। অথবা মুম্বই থেকে জাতীয় সড়ক ১৭ ধরে কসাল, সেখান থেকে ৩২ কিমি দূরে মালভান হয়ে তারকারলি দূরত্ব সর্বমোট ৫৪৬ কিমি।

থাকাখাওয়া

এমটিডিসি হলিডে রিসর্টের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোঙ্কণি কটেজ, সাবিত্রী, হিরণ্যকেশি, কারলি ও সিন্ধুকন্যা। হাউসবোট ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে এবং ১০ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া যায়। চেক ইন দুপুর ১২টা। চেক আউট বেলা ১০টা ৩০। থাকার সঙ্গে খাবার ধরা আছে। সনাতনী মালভনি খাবারের স্বাদ নিতে হবে আর ‘সোল কারি’ ও ‘কোকম’ সরবৎ।

বুকিং: maharashtratourism.gov.in

কী দেখবেন

তারকারলি সৈকত, স্থানীয় মহাপুরুষ মন্দির, বিঠ্ঠল মন্দির, কারলি নদী। ব্যাটারিচালিত ডিঙি নৌকায় একবেলার সফরে দেওবাগ, নিভাতি গোল্ডেন রক, সুনামি আইল্যান্ড, কারলি নদীর মোহনা। সাত কিমি দূরেই মালভান গঞ্জ। সেখানকার জেটিঘাট থেকে ইতিহাসখ্যাত সিন্ধুদুর্গ।

 

হরিহরেশ্বর

 

হরিহরেশ্বরের দ্বৈত সৈকতের একটির প্রস্তরাকীর্ণ সৈকতভূমে আছড়ে খানখান হচ্ছে আরবসাগরের দামাল ঢেউ। অন্যটিতে স্নিগ্ধ ঝাউবন ছাওয়া সোনালি বালুতটের সঙ্গে অসামান্য আলাপপর্ব। হরি ও হর দুই পর্বত নিয়ে হরিহরেশ্বর শান্তশ্রীমণ্ডিত গ্রামটি। সাবিত্রী নদী এখানে সাগরে মিশেছে। মরাঠা পেশোয়াদের নির্মিত জাগ্রত কালভৈরব মন্দির। সমুদ্রের ধারে পাথরে শ্রীবিষ্ণুর পদচিহ্ন। কথিত আছে এখানে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ দুই রূপে অর্থাৎ লিঙ্গ রূপে ও পর্বতরূপে স্থিত আছেন আদিমাতা যোগেশ্বরীর সঙ্গে। হরিহরেশ্বরকে তাই ‘দেবভূমি’ ও ‘শ্রীক্ষেত্র’ বলা হয়।

হরিহরেশ্বরের তোরণ

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে মুম্বই, তার পর কোঙ্কণ রেলপথে মালগাঁও। সেখান থেকে অটো, গাড়ি বা বাসে ৬৮ কিমি হরিহরেশ্বর। মুম্বই থেকে গাড়িতে ২৩০ কিমি পথ।

থাকাখাওয়া

মহারাষ্ট্র পর্যটনের হলিডে রিসর্টটির অবস্থান সাগরের কুল ঘেঁষে। চমৎকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোঙ্কণ হাউস ও সাগরমুখী কটেজগুলি। লাগোয়া পাথুরে সৈকতটিতে সমুদ্রস্নান নিষেধ। চেক ইন সকাল ১০টা ৩০। চেক আউট সকাল ৯টা।

ফোন: ০২১৪৭-২২৬০৩৬

harihareshwarmtdc@maharashtratourism.gov.in

কী দেখবেন

হরিহরেশ্বরের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দু’টিই মনোরম। সৈকতবর্তী হরিহরেশ্বর মন্দির। কালভৈরব মন্দির। সৈকতে রয়েছে নানা অত্যাধুনিক রাইডের ব্যবস্থা। গাড়ি ভাড়া করে চলে যাওয়া যায় শ্রীবর্ধন, আর্ধা চৌপাটি, দিবেগড়।

 

শ্রীবর্ধন সৈকত

শ্রীবর্ধন সাগরপাড়ের এক নিজস্ব সময় আছে। এখানকার নারকেল ও সুপারির খ্যতির জন্য সবুজে ছাওয়া প্রাচীন জনপদটি ‘শ্রীবর্ধন রোঠা’ নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিক ঐতিহ্যমণ্ডিত শহর। অতীতে ১৬টি মজবুত দুর্গজালে সুরক্ষিত ছিল পেশোয়াদের রাজ্যপাট তথা বাণিজ্যনগরী শ্রীবর্ধন। যদিও দুর্গগুলি কালের নিয়মে ভগ্নপ্রায়। বহু প্রাচীন কিছু হিন্দুমন্দির— শ্রীলক্ষ্মীনারায়ণ, সোমজাই, ভৈরবনাথ, জীবতেশ্বর, কুসুমদেবী মন্দির দেখা আর সারা দিনমান সৈকত জুড়ে এই রাইড ওয়াটার স্পোর্টস ও স্কুবা ডাইভিং-সহ বিস্তর প্রমোদ ব্যবস্থা।

সৈকতে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য রয়েছে র‌্যাফ্টিংয়ের ব্যবস্থাও

দিবেগড় সৈকত

ভ্রমণের এজমালিতে  সোনাঝরা বালুতট ও চেনা কোঙ্কণের সুরেলা সঙ্গীত। অফবিট সৈকতগুলির মধ্যে সফরনামার অপূর্ব ঠাঁই দিবেগড়। এখানকার ছোট্ট স্যাংচুয়ারিতে পরিযায়ী ও ভারতীয় সামুদ্রিক পাখিদের মৌরসীপাট্টা। পক্ষিপ্রেমীদের অনর্গল ভিড় এ তল্লাটে। মৎস্যবন্দর, উদাসী সৈকত, মন্দিররাজি নিয়ে পাঁচশো বছরের পুরনো অঞ্চল। দিবেগড় বিখ্যাত এখানকার স্বয়ম্ভু সুবর্ণগণেশ মন্দিরের জন্য। বর্তমানে অবশ্য সুবর্ণমূর্তি চুরি হয়ে যাওয়ার পর রৌপ্যনির্মিত পৃথক মূর্তি পূজিত হন।

ইতিহাসের সাক্ষ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুন্দরনারায়ণ মন্দির

অসাধারণ স্থাপত্যে সুন্দরনারায়ণ তথা রূপনারায়ণ মন্দিরে শঙ্খ-পদ্ম-গদা-চক্রধারী চতুর্ভূজ বিষ্ণুনারায়ণ মূর্তির এমনই আশ্চর্যজনক প্রযুক্তি যে দক্ষিণাবর্ত থেকে দেখলে শ্রীবিষ্ণুর ২৪ রকম অবতাররূপ বিশেষ ভাবে দেখা যায়।

শ্রীবর্ধন ও দিবেগড় যমজ সাগরশহরকে কেন্দ্র করে অসংখ্য রিসর্ট, হোমস্টে, হোটেল, রেস্তোরাঁ আছে।

 

সাগরতীর্থ

ভ্রমণের ছাড়পত্র নিয়ে কোঙ্কণের পর্যটন মানচিত্র হাতড়ালেই খোঁজ মিলবে বহু অনাগ্রাতা  অপরূপ সৈকত। তেমনই মহারাষ্ট্র্রের সাগরতীর্থ— যেখানে নাতিদীর্ঘ পাহাড়টিলা, কাজুখেত, নারকেলবীথির মিলিত ছায়ায় সাগরসৈকতে শুধু তরঙ্গভাণ্ডার গান। স্থানীয় ধীবরদের সঙ্গে গল্প জুড়ে সাগর থেকে ছেঁচে আনা রুপোলি শস্য জাল থেকে ঝুড়িতে তোলা ও সমবেত ‘কেলি’ লোকগান শোনার অনাবিল অভিজ্ঞতা। কাছেই আরাভালি-খিরোদা যমজ শহর। শতাব্দীপ্রাচীন ‘বিঠোবা মন্দির’ তথা পবিত্র শ্রীবিষ্ণুনারায়ণ মন্দির। স্বতন্ত্রতা সংগ্রামের ইতিহাস জানা। এই খিরোদা থেকেই গাঁধীজির ‘লবণ আন্দোলন’-এর শুভসূচনা হয়।

মন কাড়ে সাগরতীর্থের সৈকত

কী ভাবে যাবেন

প্রথমে মুম্বই। সেখান থেকে কোঙ্কণ রেলপথে সাওয়ান্তওয়ারির স্টেশন। এরপর অটোয় ২৮ কিমি সাগরতীর্থ সৈকত।

থাকাখাওয়া

সাগরতীর্থের ডলফিন-বে-রিসর্ট, পাওলো’স গ্রিন গার্ডেন, এমটিডিসি টেন্ট রিসর্ট প্রত্যেকেরই নিজস্ব মালিকাধীন ‘প্রাইভেট বিচ’ আছে। সেখানে রিসর্টের আবাসিক ছাড়া একেবারেই ভিড়ভাট্টা নেই। ফলত নিরিবিলি সানবাথ ও সাগরস্নান। এখানকার হেঁশেলে সনাতনী মালবনী, রন্ধনশৈলী বাঙালি রসনায় ভিন্ন স্বাদ আনবে।

কী দেখবেন

মোটরবোটে একবেলার সফরে মেচেমার, দেওবাগ, নিভাতি, ভেনগুরলা, রেডি, ভাগাতোর সৈকত। কাছে-দূরে সবুজ টিলার মতো কিছু দ্বীপও দ্রষ্টব্যের আওতায়।

 

মুরুদ-জঞ্জিরা

আরবসাগরের চেনা মেজাজের সঙ্গে ইতিহাসও জড়িয়ে আছে মুরুদ-জঞ্জিরায়। কোঙ্কণ উপকূলের মুরুদের পাথুরে সাগরবেলা ও নারকেল বাগিচার ছায়াঘেরা ধীবর গ্রামটিতে রয়েছে পবিত্র ‘কোটেশ্বরভরি’ ও ‘দত্তা’ মন্দির। অতীত স্মৃতিধন্য ১৮৮৫ সালের নবাব প্যালেসের খানদানি সাক্ষর আজ ভারত সরকার সংরক্ষণ করে রেখেছে। মুরুদের রাজাপুরী ফেরিঘাট থেকে অথৈ সাগর পাড়ি দিয়ে মাঝ সাগরস্থিত ডিম্বাকৃতি ‘জলকিল্লা’ তথা জঞ্জিরা দুর্গ। মরাঠি শব্দ ‘অজিনক্যা’ মানে ‘অজেয়’। স্থানীয়রা প্রাচীন দুর্গটিকে বলেন অজিনক্যা। মুরুদ থেকে অতলজলে অবস্থিত জঞ্জিরার অভিজাত রূপটি ক্যামেরায় টুকে রাখার মতো।

কী ভাবে যাবেন

প্রথমে মুম্বই। মুরুদ যাওয়ার কোনও রেলপথ নেই। মুম্বই থেকে ১৬৫ কিমি সড়কপথে মুরুদ। রাজাপুরী থেকে জলপথে জঞ্জিরা ৫ কিমি।

খাওয়াথাকা

বহু হোটেল রেস্তোরাঁ আছে। মহারাষ্ট্রিয়ান থালি, মালবনী থালি, পাঞ্জাবী, কন্টিনেন্টাল সবই পাওয়া যায়।

কী দেখবেন

জঞ্জিরা দুর্গের একদম নাগালে পৌঁছলেই এর প্রবেশতোরণ দেখা যায়। দূর থেকে অভিনব প্রযুক্তি ও দুর্ভেদ্য স্থাপত্য শৈলীর জন্য প্রবেশপথটি দেখা যায় না। এখানে মিষ্টিজলের তালাও, শিশমহল, দরবার মহল, কামান, তোপখানা, দরগা শরিফ, নজরমিনার, নকসাদার কাঠের দরজা দ্রষ্টব্য।

প্রতিিটি সৈকতে রয়েছে বিধিসম্মত সতর্কীকরণও

 

আলিবাগ

ঐতিহাসিক পটভূমি, অর্ধচন্দ্রাকারে বাঁক নেওয়া সৈকত, সাগরজল টপকে হাতছানি দূরত্বে কোলাবা দুর্গ, বনবীথি ছাওয়া প্রকৃতি—এ সব নিয়েই আলিবাগ। মরাঠি শব্দ ‘আলিচাবাগ’ অর্থাৎ ‘আলিসাহেবের বাগান’। অতীতে সম্ভ্রান্ত ইসর‌্যইলি জিউস আলির নিজস্ব নারকেল ও আমবাগান অধ্যুষিত এলাকার নামই লোকমুখে হয় আলিবাগ। অন্যতম আকর্ষণ অদূরেই সাগরজলের বেবাক একা পড়ে থাকা কোলাবা দুর্গ। ঐতিহাসিক দুর্গটি বিগত বহু যুদ্ধের নীরব সাক্ষী। পর্তুগিজ, ব্রিটিশ বহির্শক্তির উপর নজরদারি, জলদস্যু আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য দুর্গটি ছিল শিবাজির নৌসেনাদের শক্ত ঘাঁটি। উদয়-অস্ত জোয়ার-ভাটার খেলা এই সৈকতের এক্কেবারে নিজস্ব। ভাটার টানে সাগর উধাও তো কখনও জোয়ারের দৌরাত্ম্যে কুলে এসে উথালপাথাল করে ঢেউ। ওই ভাটার সময় দুর্গে পৌঁছে দেবে ঘোড়ায় টানা গাড়ি। সাগরপাড় ধরে হেঁটে চলে যাওয়া যায়। সূর্যাস্ত অসাধারণ এখানে। তিন দিক সাগরজলে ঘেরা, তাই মুম্বইয়ের পর্যটকরা আলিবাগকে বলেন ‘মহারাষ্ট্রের গোয়া।’

কী ভাবে যাবেন

মুম্বই পৌঁছে, সড়কপথে আলিবাগ মাত্র ১০০ কিমি গাড়িতে।

থাকাখাওয়া

অগণিত হোটেল ও রেস্তোরাঁ আছে।

কী দেখবেন

কারাগার, দত্তা মন্দির, ম্যাগনেটিক অবজার্ভেটরি, সেলিব্রিটিদের বাংলোবাড়ি ইত্যাদি। অবশ্যই কোলাবা দুর্গ— ভাটার সময় এক্কাগাড়ি ও জোয়ারে নৌকায় যাওয়া-আসা। কাছেপিঠে আরও কিছু নিরালা সৈকত ঘুরে আসা যায় গাড়িতে— আকাশি, রেওয়ান্দা, নাগাও, কিহিম, মান্ডোয়া।

ছবি: লেখক