Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

প্রবাসে স্বদেশ গড়ে স্বমহিমায় বাইলাকুপা

হাড়মাস কালি করা পরিশ্রমে ও অশেষ যত্নে গড়ে তোলা তিব্বতের বিভ্রম।

মানুষ যুদ্ধ নিয়ে বাঁচে না কখনও। এ কথা সার সত্যি। আর এঁরা তো বুদ্ধের নিজের মানুষ। বাঁচতে চাওয়া আর থিতু হতে চাওয়ার মধ্যেই প্রোথিত থাকে জীবনের বীজ। আর ষাট বছর পেরিয়ে আসার পর প্রতিটি বেঁচে থাকা শরণার্থীর জীবনই তো পৃথক পৃথক মহাকাব্য হয়ে যায়। সেই কাব্যগুলো শোনবার লোভেই এই বৃদ্ধাশ্রমে উঁকিঝুঁকি দিয়েছি। মাত্র ষাটটি বছরে এই শরণার্থীদের মাথাপিছু আয় গড়পড়তা ভারতীয়র প্রায় দ্বিগুণ। এদের প্রত্যেকটি স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের ফলাফল ঈর্ষণীয় বললে কম বলা হয়। এদের গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, শিক্ষার ব্যাপ্তি পশ্চিমী যে কোনও উন্নত অর্থনৈতিক কাঠামোর দেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। তিব্বতিরাই পৃথিবীর একমাত্র শরণার্থী যাঁরা শরণার্থী হওয়ার পর উন্নতির যে কোনও অর্থনীতিসিদ্ধ পরিসীমায় উন্নতি করেছে। কোন ম্যাজিকে?

স্বকীয়তা বা আইডেন্টিটি একটা ঠুনকো শব্দ, নেহাতই ভঙ্গুর। তাকে লালন করতে হয়, নচেৎ মহামানবের সাগরতীরে বিলীন হওয়া ঠেকানো যায় না। আইডেন্টিটি ধরে রাখার লড়াইটা শুরু এই বৃদ্ধাশ্রমটা যেখানে, ঠিক সেখানেই। কর্নাটকের বাইলাকুপায়। ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে। বাইলাকুপা মহীশূর থেকে ৮০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। স্থানীয় মানুষের সংসর্গ এড়াতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার একর জনশূন্য জমি— বা বলা ভাল জঙ্গল— নির্দিষ্ট করা হল। আর সেখানে নিয়ে আসা হল ৬৬৬ জন তিব্বতিকে। জঙ্গলের মধ্যে তাঁবু গেড়ে কোদাল-বেলচা নিয়ে শুরু হল জঙ্গল সাফ করার লড়াই। আক্ষরিক অর্থেই হাতি-বাঘ-সাপের সঙ্গে সহবাস। হোসেন মিঞার ময়নাদ্বীপ মনে পড়ে। এ এক জব্বর বাঁচার লড়াই। এর মধ্যে ‘সুইস টেকনিকাল কো-অপারেটিভ’ নামের একটা সংস্থা তিব্বতিদের একটা ট্রাক্টর উপহার দেয়। সেই ট্রাক্টর চালানোর জন্য ধরমশালায় রাস্তা তৈরির কাজে নিয়োজিত ১৯ বছরের দোরজে শেরিং-কে নিয়ে আসা হয়। আশি-ছুঁইছুঁই দোরজে শেরিং-এর এখন অবসর-জীবন। বড় দুই ছেলেমেয়ে আমেরিকায় সেটলড্, ছোট মেয়েটি পিএইচডি করে শিক্ষকতায় গেছে। বিকেলের বৌদ্ধস্তূপ নিয়মমাফিক একশো আট বার পাক খেতে খেতে দোরজে শেরিং আমাকে এই গল্পটা শোনালেন—

পাহাড়তলির ঢেউয়ে নিঝুম ভ্রম হওয়া বাড়িটা আসলে একটা বৃদ্ধাশ্রম।

১৯৫৯ সালে দোরজে শেরিং ছিলেন লাসার অদূরে সেরা মনাস্ট্রিতে এক জন শিক্ষানবিশ লামা। ওই বছর ১৮ই কিংবা ১৯শে মার্চ রাত্রে ওঁরা মেঘগর্জনের মতো একটা শব্দ শোনেন। তড়িঘড়ি মনাস্ট্রির ছাদে উঠে দেখতে পান লাসার আকাশে আগুন। এরই মধ্যে খবর আসে চিনা ট্যাঙ্ক পোতালা প্রাসাদের ওপর গোলা ছুড়ছে। সর্বনাশ আঁচ করে সমস্ত লামা ওই অন্ধকারে পালাতে শুরু করেন। গ্রামে গ্রামে ভিক্ষে করে চলতে থাকে ভারতের সীমান্তে সরে আসা। গিরিবর্ত্মের ওপর বরফ পড়া বা ঝড় শুরু হলে বাচ্চাদের মাঝখানে রেখে বড়রা চতুর্দিকে রিং তৈরি করে ঘন হয়ে বসতেন। যৌথ শরীরের উত্তাপে মূ্ত্যুকে ঠেকিয়ে রাখা আর কি। এই পালানোর প্রক্রিয়ায় দলের অর্ধেকই ঝরে পড়ে। তারপর মিসামারি শিবির, সেখান থেকে ধরমশালার কাছে রাস্তা তৈরির কাজে। নভিস সন্ন্যাসী পাকাপোক্ত দিনমজুরই হয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ক্যাম্পের এক দরদি ভারতীয় আমলাকে হাত করে দোরজে শেরিং ড্রাইভিংটা শিখে নেন। আর সেই সুবাদে বাইলাকুপায় আসেন ট্রাক্টর চালাতে। জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদভূমি ছিনিয়ে আনার কাজ শুরু হয় জোরকদমে। হাতিই হুজ্জোতি করত সবচেয়ে বেশি। দেখতে দেখতে বেশ খানিকটা অঞ্চল উদ্ধার করে অনেকগুলো টিন-দরমার ঘর তোলা হয়। ক্যাম্প-১। ঠিক যেখানে এই স্তূপগুলো এবং দোরজে শেরিং, সেখানে দাঁড়িয়ে লড়াইটা দেখে যান স্বয়ং দালাই লামা। প্রতি ছ’ মাস অন্তর ৫০০ জন করে শরণার্থী আসতে থাকেন বাইলাকুপায়। ক্রমে ১, ২, ৩, ৪ করে ২০টা ক্যাম্পের জায়গা হয়। ঠাঁই পান ১০ হাজার তিব্বতি। প্রত্যেক পরিবারকে এক একর করে জমি দেওয়া হয়। কৃষিকাজ তিব্বতিদের রক্তে নেই, তবে ঠেকায় পড়ে তাঁরা শিখতে থাকেন দ্রুত। প্রথম বছরটায় বোনা হয় ডাল, তুলো, তামাক। বেবাক ফসল নষ্ট। আবার সুইসরা এসে জমি পরীক্ষা করে যব আর বাজরার চাষ করতে বলে। ফল হয় আশাতীত। এবং ফলের গাছও লাগানো হয় সাতাত্তর হাজার। তিন বছরের মধ্যে বাইলাকুপা অতিরিক্ত ফলন বাইরে বিক্রি করে লাভের মুখ দেখে। পুননির্মাণের প্রক্রিয়া দিশা পায়।

আরও পড়ুন: আর এক তিব্বতের সন্ধানে বাইলাকুপায়

১৯৫০ সালে— বয়স যখন পনেরো— দলাই লামা তাঁর হেফাজতে থাকা সোনাদানা ৪০টা ইয়াকের পিঠে চাপিয়ে সিকিমে পাঠিয়ে দেন। কারণ চিন খবরদারি করা শুরু করব করব করছে। দশ বছর হারিয়ে থাকার পর সেই গুপ্তধন ১৯৬০ সালে গ্যাংটকের এক পরিত্যক্ত আস্তাবলে হঠাৎ ভেসে ওঠে। কড়া পাহারায় ট্রাকে করে সেই ধনরত্ন নিয়ে আসা হয় কলকাতায়। বিক্রি করে পাওয়া যায় ৯,৮৭,৫০০ ইউএস ডলার। এর জোরে দালাই লামা কিছুটা সাহসী হয়ে পুনর্নির্মাণ যজ্ঞে আর একটু ঘি ঢালেন। বাইলাকুপায় স্কুল আর হাসপাতাল তৈরি হয়। ক্যাম্পে ক্যাম্পে বসানো হয় কার্পেট আর সোয়েটার বোনার কল। উদ্যমী তিব্বতিরা ওই সোয়েটার নিয়ে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন। সম্পূ্র্ণ প্যারামবুলেটিং ট্রেড, যা তিব্বতিদের রক্তে। সেই তিব্বতি সোয়েটারের ব্যবসায়িক সাফল্য এখনও প্রবাদ হয়ে আছে। শীত পড়া মাত্র কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারে একবার টহল দিলেই এই সাফল্যের ছবিটা স্পষ্ট হবে। এখনও।

রহস্যে ঠাসা মনাস্ট্রি আর এক রাশ হাসি।

কার্পেটে বা সোয়েটারে যেমন, তেমন বিষণ্ণতার একমাত্রিক টোনেও তিব্বতিরা নিপুণ হাতে রঙিন নকশা বুনতে পারেন। তাই হাতে টাকাপয়সা আসা মাত্র খামোখা মনখারাপ না করে থেকে তাঁদের এই প্রথম ও সর্ববৃহৎ স্থায়ী আস্তানা বাইলাকুপায় তাঁরা আর একটা লাসা গড়ে তোলার চেষ্টায় মাতেন। লাসার প্রধান তিন মনাস্ট্রির নামে ক্যাম্প-৪, ক্যাম্প-৫ ও ক্যাম্প-৭-এর নাম দেওয়া হল সেরা, দ্রেপুং এবং গানতে। হাসপাতাল, সন্ন্যাসিনীদের নিজস্ব গুম্ফা, থাঙ্কা আঁকা শেখানোর স্কুল— সবই সেই তিব্বতে যা ছিল তাই। সমনামী। ঝড় উঠেছে, সিআইএ-কে জড়িয়ে প্রতিরোধের যুদ্ধের একটা খসড়া লেখা হয়েছে, রাজনীতির মেরুকরণ টালমাটাল পৃথিবীতে ক্রমাগত দিগভ্রষ্ট হয়েছে, দলাই লামা নোবেলও পেয়েছেন, স্বাধীনতার দাবিতে ১৫১ জন তিব্বতি (আজ পর্যন্ত) আগুনে আত্মাহুতি দিয়েছেন, আর তারই মধ্যে প্রবাসে স্বদেশ গড়ে পরম আশ্লেষে বেঁচেছে মানুষ। ম্যাজিকের মতোই তো। টুপির শূন্যতা থেকে বের করে আনা খরগোশটা তো রক্তমাংসেরই।

দশ বছর আগে এক প্রগাঢ় বর্ষায় কী ভাবে যেন বাইলাকুপা পৌঁছে গেছিলাম আমি। মর্মান্তিক রকম একা। সেরা-দ্রেপুং-গানতে গ্রামে তখনই শুনেছিলাম ছোট-বড় এবং নারী-পুরুষ মিলিয়ে তেরোশো লামার বাস। হাসপাতালের গেস্টহাউসে আশ্রয় নিয়ে থেকে গেছিলাম বেশ কটা দিন। সেই প্রথম পাহাড়পথে টহল দিতে দিতে বুঝতে শিখেছিলাম একা হওয়ার বোধটাও আসলে আপেক্ষিক। ক্লান্ত হলে বা সঙ্গ চাইলে রাস্তার একপাশে দাঁড়াতাম। নিমেষে কারও বাইক আমাকে তুলে নিত। সেই প্রথম বুঝি সত্যি বেঁচে থাকার এক আশ্চর্য ওম আছে, তা আসলে এক একান্নবর্তিতা জলে-স্থলে-দুর্বিপাকে। এই দশ বছর ধরে দেশের আনাচেকানাচে তিব্বতিদের শিবিরে শিবিরে চলেছে এক অলৌকিক সফর। এই দশ বছরে বাইলাকুপায় গড়ে উঠেছে অন্তত চারটে ঝকঝকে গেস্টহাউস, তিব্বতি চেহারার বাহারি রেস্তোরাঁ ছেয়ে ফেলেছে ক্যাম্প-১। কিন্তু অবিরত চেনা মুখগুলোয় একটাও কেন বাড়তি আঁচড় নেই?

আসলে মানুষের বাঁচাটা সীমান্ত-নিরপেক্ষ। মানুষ বেঁচে থাকে মমির মতো জরাহীন। মানুষ তো শুধু বাঁচতেই ভালবাসে।

ইতিহাসের উল্টোমুখে হেঁটে তিব্বতের আত্মা ঠাঁই নেয় বাইলাকুপায়।

তথ্য:

কর্নাটকের কুর্গ বেড়াতে যান অনেকেই। কফির বাগান আর অন্য নানা পাহাড়িয়া আকর্ষণ রয়েছে কুর্গ-এর প্রধান ঘাঁটি মাদিকেরি শহরটায়। সেই মাদিকেরির রাস্তায় (মহীশূর থেকে) মাদিকেরির ৪০ কিলোমিটার আগে বাইলাকুপা। বাসরাস্তা থেকে অটো ধরে চলে আসুন ক্যাম্প-১ এ শাক্য মনাস্ট্রির গেস্টহাউসে।

ফোন: ০৭৮২৯৫৮৮৭১৬। গেস্টহাউসের চত্বরেই টিলার মাথায় একটি আস্ত গুম্ফা এবং প্রায় একটি গোটা অরণ্য। দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া ৭০০ টাকা। ‘সেরা’ গ্রামে বিশাল ‘ইগা চোলিং’ গেস্টহাউসেও থাকতে পারেন। দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া এখানে ৮০০/১২০০ টাকা। ফোন: ০৯৫৩৮৩৩৩৫৮২। সেরা গ্রামে এই গেস্টহাউস তো বটেই, সমস্ত রেস্তোরাঁ, বিপণি, ঔষধালয়, এমনকী, ধোপাখানা পর্যন্ত চালান মেরুন আলখাল্লা পরা লামারা। মহীশূর থেকে ১০-১৫ মিনিট অন্তর বাইলাকুপা আসার বাস আছে। দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে দেবে।


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper