Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper

কলকাতা থেকে একটু দূরে, ইটাচুনা রাজবাড়িতে

রাজবাড়ির প্রবেশপথ

যানজট, অসহ্য গরম, ঘর্মাক্ত কলকাতা। পিচ গলা রোদ্দুর, তপ্ত, পুড়ে যাওয়া কলকাতা। এক পা এগোলেই লোকের সঙ্গে ঠোকাঠুকি, জনসমুদ্র, দমবন্ধ কলকাতা। এই বৃষ্টি, হঠাৎ বৃষ্টি, প্যাচপ্যাচে কাদা আর জল জমার কলকাতা। সত্যি, মাঝে মাঝে পাগলের মতো ভিড়, দমবন্ধ ইটকাঠ, পাথর আর কংক্রিটের শহর থেকে মন পাড়ি দেয় অন্য কোথাও। অপেক্ষা শুধু সপ্তাহশেষে যৎসামান্য তল্পিতল্পা নিয়ে কোনওক্রমে পালিয়ে যাওয়ার। তখন প্রতি দিনের ছাপোষা জীবন আর তুচ্ছতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে যদি এক ছুট্টে চলে যাওয়া যায় ইতিহাসমাখা কোনও রাজবাড়িতে? যদি যান্ত্রিক আধুনিকতাকে সটান ছুড়ে ফেলে কাটানো যায় কিছু রাজকীয় দিনরাত? তা হলে তো কথাই নেই! জনঅরণ্য থেকে খানিক দূরেই হুগলির ইটাচুনা রাজবাড়ি প্রস্তুত আভিজাত্যের চাদরে মোড়া মেদুর কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে।

ইতিহাসের গন্ধমাখা অন্দরমহল

ইটাচুনা রাজবাড়ির দিকে এগোতে এগোতে সংক্ষেপে এই রাজবাড়ির ইতিহাস জেনে নেওয়া যেতে পারে। ‘খোকা ঘুমলো পাড়া জুড়লো, বর্গী এল দেশে’— মনে পড়ে শৈশবের গন্ধমাখা ঘুমপাড়ানি ছড়া? মরাঠা থেকে দুর্দান্ত বর্গীর দল চৌথ আদায়ের জন্য তখন বার বার হানা দিচ্ছে এ রাজ্যে। সেই সময়েই বর্গী বাহিনীর কেউ কেউ প্রচুর ধনসম্পত্তি অর্জন করে স্থায়ী ভাবে বঙ্গদেশে থেকে যান। ইটাচুনা রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা কুন্দ্রারা ছিলেন তারই উদাহরণ। এই কুন্দ্রা থেকেই পরে হয় কুণ্ডু। সাফল্য নারায়ণ কুণ্ডুর বংশধররা ১৭৬৬ সালে এই রাজবাড়ি তৈরি করেন। বর্গীদের বাড়ি বলে স্থানীয়। মানুষ একে বর্গীডাঙাও বলেন।

শহরের সীমানা ছাড়িয়ে গাছগাছালি মেঠো পথ, মাইলের পর মাইল সবুজে মোড়া চাষের জমি, কলোচ্ছ্বাসরত শিশুর দল চোখ জুড়িয়ে অদ্ভূত প্রশান্তি দেয় হৃদয়কে। পথ শেষ হয় রাজবাড়ির বিশাল ফটকে। গেট ছাড়িয়ে ভিতরে পা দিলে কেমন যেন গা ছমছম করে ওঠে। লোকলস্কর পাইক বরকন্দাজ— কালের নিয়মে সেই অতীত জৌলুসের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই এখন। তাও পুরনো দেওয়ালের প্রাচীন গন্ধ, উঁচু কড়িবরগার ছাদ, আল্পনা দেওয়া বিরাট নাটমন্দির, প্রাঙ্গন জুড়ে বিরাট বিরাট বাতিস্তম্ভ, প্রকাণ্ড ঝাড়বাতি দিয়ে সাজান ইতিহাসের গন্ধমাখা সুবিশাল বৈঠকখানা মুহূর্তে অন্য এক জগতের দরজা খুলে দেয় চোখের সামনে।

নিঃঝুম অলিন্দ

এই বাড়িতে কানাকানি করে ইতিহাস। পুরনো প্রথা মেনে এই বাড়ির অন্দরমহল, বার মহলও সম্পূর্ণ আলাদা। কাছারি বাড়ি, হিসাবের ঘর, বাজার সরকারের ঘর পেরিয়ে তবে অন্দরমহলে পা। সেই যে বাবার এক আদরের মেয়ে, কৌতূহলী মায়াময় চোখে ভিতরমহলের বারান্দার একটা ছোট্ট জানালা খুলে চোখ রেখেছিল জমিদার বাবার কাছে চাকুরিপ্রার্থী পুরুষটির দিকে। প্রথম দর্শনেই প্রেম। সোনাক্ষী সিংহ আর রণবীর সিংহের ‘লুটেরা’ ছবির শুটিং এই বাড়িতেই হয়েছিল। বাড়ির মেয়েরা যাতে অন্দরের জানলা খুলে বাইরেটা দেখতে পান, অথচ তাঁদের কেউ দেখতে না পায় সেই ব্যবস্থা করা ছিল অলিন্দে ছোট ছোট জানলা করে। বাড়ির সবই সাবেক প্রথার। বড়কর্তা মেজোকর্তার সারিবদ্ধ ঘর, বিবর্ণ বহু পুরনো আসবাবপত্র, বিরাট সিন্দুক,কারুকার্যমণ্ডিত পালঙ্ক সবই। বাড়ির লম্বা নিঃঝুম অলিন্দ, জানলা দিয়ে ডিঙি মেরে দেখা বাইরের সবুজের সমারোহ, খিড়কির পুকুরে নুয়ে পড়া গাছ— সবই বড় মায়াবী, মনকেমন করা।

লম্বা বাতিস্তম্ভ ঘেরা ঠাকুরদালান

এ বাড়ির ছাদও বড় মনোরম। প্রকাণ্ড ছাদে দিনের বেলা তুমুল হাওয়া আলোড়িত করে যায়। রাতের নিবিড় অন্ধকার ঠাণ্ডা শিরশিরে স্রোত বইয়ে দেয় বুকের ভিতর দিয়ে। আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় নক্ষত্রের রাত বুঝি একেই বলে। যেন নিকষ অন্ধকারে হিরের টুকরো ছড়িয়ে রেখেছে কেউ। স্ট্রিট লাইট বিচ্ছুরিত শহুরে জীবনে এমন রাত তো আসে না! সন্ধারতির ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসে রাজবাড়ির ঠাকুরদালান থেকে। আরও রাতের দিকে এক বাঁশুরিয়া পাশের গ্রাম থেকে রোজ বাঁশি বাজাতে আসেন রাজবাড়িতে। তাঁর নিমগ্ন বাঁশির মন খারাপ করা মেঠো সুর ভেসে যায় হাওয়ায়। খেলা করে নিস্তব্ধ বাড়ির আনাচ কানাচে।

রাজবাড়ির খাওয়ার ব্যবস্থাও রাজকীয়। অথেনটিক বাঙালি রান্না বলতে যা বোঝায়, পাওয়া যায় এখানে। বনেদি জমিদার বাড়ির অন্দরসজ্জায় সজ্জিত ঝকঝকে কাঁসার থালাবাটিতে পরিবেশিত এই খাবারের স্বাদ মুখে লেগে থাকবে বহু দিন।

রাজবাড়ির ছাদ

আশপাশটা একটু ঘুরে দেখতে চাইলে যাওয়া যেতে পারে ১২ কিমি দূরের পাণ্ডুয়ায়। বিশাল এক মিনার আর তার পাশেই ইতিহাসমণ্ডিত মসজিদের ধ্বংসাবশেষ এই জায়গার আকর্ষণ। ১৩৪০ সালে ১২৫ ফুট উঁচু এই মিনারটি নির্মিত হয়। কোনও এক সময় গৌতম বুদ্ধের উত্তরপুরুষ এখানকার পাণ্ডু রাজার সঙ্গে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ খলজির এক তুমুল যুদ্ধ হয়। সুলতানের হয়ে শাহিদ শাহ সফিউদ্দিন এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাণ্ডুরাজ সপরিবার আত্মহত্যা করেন। বিজয়স্তম্ভ হিসাবে এই মিনারটি নির্মাণ করেন বিজয়ীরা। পরে পাশের ‘বাড়ি মসজিদ’-এর আজান মিনার হিসেবে ব্যবহৃত হয় এটি। আবার অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই মিনারটি পাণ্ডুরাজার বিষ্ণুমন্দিরের চূড়া। যুদ্ধের সময় মিনারটি রেখে বাকি পুরোটাই ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়। ‘বাড়ি মসজিদ’-এর এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাও দেখার মতো সুন্দর ইটের গাঁথনি, সারিবদ্ধ পিলার নিঃশব্দে সোনালী দিনের সাক্ষ্য বহন করে।

গ্রামের মধ্যের রাস্তা ধরে এগোলে ২০০ বছরেরও পুরনো মহানদ কালীবাড়ি। সরল সাধাসিধে গ্রামের মানুষগুলি সাদরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন ছায়ায় মোড়া মন্দিরটিতে। প্রশস্ত চাতাল, পাখির কলকাকলি প্রশান্তি দেয় হৃদয়কে। জনশ্রুতি, রানি রাসমণি এখানে নিয়মিত পুজো দিতে আসতেন। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের অনুপ্রেরণা নাকি এই মন্দির থেকেই পান তিনি।

বৈঠকখানার সেই প্রকাণ্ড ঝাড়বাতি 

নিবিড় সবুজ আর বিস্মৃত ঐতিহ্যের মখমলি গন্ধ বুকে ভরে এ বার ঘরে ফেরার পালা। চেনা গণ্ডির বাইরে এই হঠাৎ অচেনাটুকুর স্মৃতি হৃদয়ে অমলিন থাকবে বহুকাল।

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বসিপুর, হালুসাই হয়ে খন্যান স্টেশনের পথ ধরতে হবে। হালুসাই থেকে মিনিট দশেক যাওয়ার পরই পড়বে রাজবাড়ি। ট্রেনে আসতে চাইলে বর্ধমান মেন লাইনের যে কোনও ট্রেন অথবা হাওড়া থেকে পাণ্ডুয়া লোকালেও আসা যায়। খন্যান স্টেশনে নেমে অটো বা রিকশা ধরে মিনিট দশেকের পথ রাজবাড়ি।

কোথায় থাকবেন

ইটাচুনা রাজবাড়ি। ফোন- ৯৮৩১০৪৯৮১৬। ভাড়া-২১০০-৩০০০ টাকা। এ ছাড়াও রাজবাড়ির ঠিক পিছনে খামার বাড়ির মধ্যে রয়েছে মাটির বাড়ি। চাইলে এখানেও থাকা যায়। ভাড়া১৫০০-২৪০০ টাকা। ভাড়া পরিবর্তিত হয় পুজোর সময় থেকে শীতকাল পর্যন্ত। তাই যাওয়ার আগে ফোন করে যাওয়া বাঞ্ছনীয়।

 

ছবি:লেখক


Anandabazar Patrika Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading Newspaper