—প্রতীকী চিত্র।
চলতি এসআইআরে রাজ্য-কমিশনের নথিযুদ্ধ নজর কেড়েছে। কিন্তু এই লড়াইয়ে ফাঁকে তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির (এলডি) ক্ষেত্রে কমিশনের ১৪ দফা নথিই আইনি মান্যতা পেয়ে গেল নিঃশব্দে। ঘটনাচক্রে, আগের বিধি সকলে ধরে নিলেও, একেবারে আনকোরা এই এলডি-তত্ত্বে কোন নথি গ্রাহ্য হবে, তার কোনও সুনির্দিষ্ট লিখিত বিধি ছিল না কমিশনের তরফে। তাই রাজ্য আইনি লড়াইয়ে জড়ানোয় তাতে কার্যত কমিশনেরই ‘লাভ’ হল বলে মনে করছেন আধিকারিকদের একাংশ।
এসআইআরের মূল দু’টি পর্ব ছিল। এক, এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করা এবং তার ভিত্তিতে ২০০২ সালে এসআইআর তালিকার সঙ্গে নিজের বা নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে কোনও ভোটারের নামের মিল আছে কি না খতিয়ে দেখা। দুই, যাঁদের মিল থাকবে না (আন-ম্যাপড) একমাত্র তাঁদের ক্ষেত্রে কমিশনের প্রাথমিক ১২টি নথির মধ্যে একটি দাখিল করলেই চলত। পরে অবশ্য পরিচয়পত্র হিসাবে আধার এবং মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড গ্রহণযোগ্য হয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কারণে। এই পর্বের যাচাই চলাকালীনই এলডি-তত্ত্বের প্রবেশ ঘটে কতকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই। শুরুতে বিষয়টা ঠিক বুঝেও উঠতে পারেননি প্রশাসনিক কর্তারা। প্রশাসনের সকলে ধরে নেন, এই নতুন তত্ত্বেও আগের নথিই গ্রাহ্য করা হবে। কিন্তু তার লিখিত এবং সুস্পষ্ট বার্তা দেখা যায়নি কমিশনের তরফে। অবশ্য, তা নিয়ে প্রশাসনের তরফেও সুনির্দিষ্ট জিজ্ঞাসা থাকতে দেখা যায়নি।
অভিজ্ঞ আমলাদের অনেকেই জানাচ্ছেন, এই পরিস্থিতিটিকে কমিশনের ‘পদ্ধতিগত ফাঁক‘ হিসাবে দেখতে শুরু করে প্রশাসনের সর্বস্তরের আধিকারিকেরা। রাশ নিজেদের অনুকূলে রাখতে জেলায় জেলায় তৈরি হতে থাকে একের পর নথি। যদিও সেগুলির প্রায় সবক'টিই কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিধিবদ্ধ ১৪টি নথির তালিকাভুক্ত ছিল না। যেমন ডমিসাইল শংসাপত্র বা পারিবারিক রেজিস্টার— প্রথমটি শুধু সেনা-আধাসেনায় চাকুরিপ্রার্থীদের জন্য এবং পরেরটির জন্য সুনির্দিষ্ট আইনই নেই এ রাজ্যে। ফলে আপত্তি করে কমিশন। তখনও প্রশাসনিক স্তর থেকে এ প্রশ্ন ওঠেনি— এলডি গোত্রের জন্য কমিশনের লিখিত নথির আদেশনামা কোথায়। সুপ্রিম কোর্টে ফের মামলা হয়। সেখানে কমিশনের বিরুদ্ধে আপত্তির নানা কথা তুলতে দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকে যায় অধরা। সুপ্রিম কোর্ট এই এলডি তত্ত্ব নিয়ে কোনও আপত্তি তোলেনি। বরং তার জন্য কমিশনের বিধি এবং নথি তালিকাই যে গ্রাহ্য হবে, তা জানিয়ে দেয় শীর্ষ আদালত। বিধির বাইরে তৈরি হওয়া নথিগুলির কার্যকারিতাও শেষ হয়ে যায় সেই সঙ্গে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দায়িত্ব যাওয়ার পরে কলকাতা হাইকোর্টের কয়েকটি বৈঠকে তালিকার বাইরের নথি নিয়ে সওয়াল করেছিল রাজ্য। কিন্তু তা-ও আইনি মান্যতা পায়নি। তবু এখনও অভিযোগ উঠছে, কিছু কিছু জায়গায় নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে প্রশাসনেরই একাংশের তরফে।
প্রশ্ন হল— যে কোনও সরকারি কাজের ক্ষেত্রে লিখিত একটি আদেশনামা থাকাই যে নিয়ম বা রীতি চলে আসছে, এ ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হল কেন! কেনই বা সেটি বুঝতে পারলেন না প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্তারা। অবশ্য, কমিশন সূত্রের বক্তব্য, এসআইআরের গোটা প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে এই এলডি-তত্ত্ব। ফলে এসআইআরের মূল আদেশনামাই এ ক্ষেত্রে কার্যকর রয়েছে। বিধিও তাই অভিন্ন। ফলে আলাদা করে এলডি-র জন্য নথির আদেশনামা প্রকাশের প্রয়োজন ছিল না। তা ছাড়া এলডি-ঘটনাগুলিতে একই পিতার ছ’জনের বেশি সন্তান, পিতা-ঠাকুরদার সঙ্গে বয়সের অস্বাভাবিক ব্যবধান, এনুমারেশন ফর্মে থাকা পিতার নামের সঙ্গে ২০০২ সালের এসআইআর তালিকায় থাকা নামের অমিল ইত্যাদি ঘটনাগুলি অন্তর্ভুক্ত হয়। যা এসআইআরের স্বাভাবিক যাচাইয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এক কর্তার কথায়, “পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচটি রাজ্যে একই নীতিতে কাজ হয়েছে। সমস্যা শুধু এ রাজ্যেই। ফলে প্রশাসনিক সহযোগিতার প্রশ্নটি বরং এ ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে