উদ্যোগ: পাড়ায় পৌঁছে গিয়েছেন শিক্ষকেরা। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।
করোনা সংক্রমণ কমেনি এখনও। বন্ধ রয়েছে স্কুল। চলছে অনলাইনে পড়াশোনা। এই পরিস্থিতিতে বাগদার কনিয়াড়া যাদবচন্দ্র হাইস্কুল কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির অনলাইন ক্লাসে পড়ুয়াদের উপস্থিতির হার যৎসামান্য। অনলাইন ক্লাস করছে মাত্র ২০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী। ফের একবার স্কুলছুট বাড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন শিক্ষকেরা। গতবার যখন অনলাইন ক্লাস হয়েছিল, তখন স্কুলের ১৪ জন ছেলেমেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল। মেয়েদের কয়েকজনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ছাত্রদের অনেকে মোবাইল গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষকেরা সে সময়ে গ্রামে অভিযান চালিয়ে গেম খেলার সময়ে কয়েকজন ছাত্রকে হাতেনাতে ধরেন। তাদের বুঝিয়ে ক্লাসে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। ৩ জনকে ফেরানো গিয়েছিল।
এ বার প্রধান শিক্ষক অনুপম সর্দার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ছেলেমেয়েরা যাতে স্কুলছুট না হয়, সে জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকারা সরাসরি গ্রামে পৌঁছে যাবেন। গ্রামের মাঠে খোলা জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ছেলেমেয়েদের পড়ানো হবে। সহ শিক্ষক-শিক্ষিকারা প্রধান শিক্ষকের প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছেন। কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘পাড়ায় পড়া।’
স্কুল সূত্রে জানানো হয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে শিক্ষক-শিক্ষিকারা পৌঁছে যাচ্ছেন গ্রামে। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ২৩ জন। যাদবচন্দ্র হাইস্কুলের পড়ুয়ারা মূলত ৬টি গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামগুলি হল কড়ঙ্গ, মালিপোঁতা, দুর্গাপুর, গোবিন্দপুর, কনিয়াড়া এবং ধুলোনি। পাড়ায় পড়া কর্মসূচিতে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের ক্লাস করানো হচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৮৫০ জন।
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘‘শিক্ষক-শিক্ষিকারা এক একটি গ্রামে সপ্তাহে দু’দিন করে যাচ্ছেন। ক্লাস নিচ্ছেন।’’ তাঁর দাবি, পরবর্তী সময়ে যদি ফের স্কুল খুলে যায় এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়, তা হলেও ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের নিয়ে পাড়ায় পড়া কর্মসূচি চলবে। এখন নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের নিয়ে অনলাইন ক্লাসও চলছে স্কুলে।
শিক্ষক-শিক্ষিকারা গ্রামে গিয়ে খোলা মাঠে ছেলেমেয়েদের ডেকে আনছেন। মাঠে চট পেতে তারা বসছে। পড়ুয়ারা বাড়ি থেকে চট-মাদুর নিয়ে আসছে। মাঠে আলাদা করে শ্রেণি অনুযায়ী ছাত্রছাত্রীদের বসানো হচ্ছে। সকলের মাস্ক পরা থাকছে। দূরত্ব বিধি বজায় রেখে তারা বসছে। এক একদিন একটি বিষয় পড়ানো হচ্ছে। কোন দিন কোন বিষয় পড়ানো হবে, তার রুটিন আগে থেকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। চক-ডাস্টার, ব্ল্যাকবোর্ড থাকছে। পাশে থাকছে ফ্লেক্স। তাতে লেখা, ‘পাড়ায় পড়া।’ সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত ক্লাস চলছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, পাড়ায় পড়া কর্মসূচি শুরু হওয়ার পরে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে অনেকটাই।
দশম শ্রেণির পড়ুয়া শুভঙ্কর সর্দার এবং একাদশ শ্রেণির পড়ুয়া চন্দন পাল জানায়, অনলাইনে ক্লাস করলেও ঠিকমতো পড়া বুঝতে পারছিল না। সকলে এক সঙ্গে বসে পড়ার আনন্দ আলাদা। তাতে পড়ায় আগ্রহ ফিরেছে। অভিভাবক স্বপন দাস বলেন, ‘‘করোনা ও লকডাউনে রুজিরোজগার কমেছে। ছেলেকে স্মার্টফোন কিনে দিতে পারিনি। শিক্ষকেরা গ্রামে এসে পড়াচ্ছেন। ফলে আমাদের মতো অভিভাবকেরা স্বস্তি পাচ্ছেন।’’
প্রধান শিক্ষক অনুপম জানান, করোনা-কালে স্কুলে অনলাইন ক্লাস নেওয়া শুরু হলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। গ্রামের দিকে নেটওয়ার্ক সমস্যা আছে। অনেক গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের পক্ষে স্মার্টফোন কেনা বা নেট রিচার্জ করা সম্ভব হয়নি। করোনা পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবক কাজ হারিয়েছেন। সংসারের হাল ধরতে অনেক পড়ুয়াকে কাজে যোগ দিতে হয়েছে। ভিন্ রাজ্যেও পাড়ি দিয়েছে অনেকে। বহু নাবালিকা ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে অনেক পড়ুয়া। তা ছাড়া দীর্ঘ সময় বইখাতার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় বহু পড়ুয়া পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলেও জানা গিয়েছে। তাই এই পদক্ষেপ।