বিক্ষোভে অচলাবস্থা জারি পোলেরহাট ২ পঞ্চায়েতে। নিজস্ব চিত্র।
বাংলা আবাস যোজনা প্রকল্পে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা পেয়েছেন পোলেরহাট ২ পঞ্চায়েতের উত্তর গাজিপুরের বাসিন্দা দাউদ মোল্লা। তিনি দ্বিতীয় কিস্তির ৬০ হাজার টাকার জন্য গত কয়েকদিন ধরে পঞ্চায়েত অফিসে ঘোরাঘুরি করছেন। কিন্তু কোনও ভাবেই টাকা পাচ্ছেন না।
তাঁর মতো একই অবস্থা টোনা গ্রামের সাফিয়া বিবির। তিনিও দ্বিতীয় কিস্তির টাকা না পেয়ে ওই প্রকল্পে ঘরের কাজ করতে পারছেন না।
গত কয়েকদিন ধরে ভাঙড় ২ ব্লকের পোলেরহাট ২ পঞ্চায়েতে বিক্ষোভ-পাল্টা বিক্ষোভে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর ফলে পঞ্চায়েত অফিসে আসছেন না প্রধান, উপপ্রধান-সহ ওই পঞ্চায়েতের সরকারি কর্মচারীরা। যে কারণে সমস্যায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা নুরজাহান বিবি প্রধানের কাছে স্থায়ী বাসিন্দার শংসাপত্র নিতে গিয়ে কয়েকদিন ঘরে ঘুরছেন। আজাহার মোল্লা আধার কার্ড সংশোধনের জন্য প্রধানের শংসাপত্র পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। তাঁরা জানালেন, ওই পঞ্চায়েতে গিয়ে সাধারণ মানুষ ন্যূনতম পরিষেবা পাচ্ছেন না।
গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে পোলেরহাট ২ পঞ্চায়েতের ১৬টি আসনের মধ্যে ৮টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যায় তৃণমূল। বাকি ৮টি আসনে তৃণমূলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ভাঙড়ের জমি কমিটি সমর্থিত নির্দল প্রার্থীরা। এর মধ্যে ৩টি আসনে জয়ী হয়ে তৃণমূল। বাকি ৫টি আসনে জয়ী হযন জমি নির্দল প্রার্থীরা। ১১টি আসন পেয়েও জমি কমিটির বাধায় দীর্ঘদিন ধরে ওই পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন করতে পারেনি তৃণমূল। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পঞ্চায়েত ভোট গঠন করে তৃণমূল।
তারপর থেকেই ওই পঞ্চায়েতের প্রধান, উপপ্রধানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে সরব হয় জমি কমিটি। দিন কয়েক আগে একশো দিনের কাজ-সহ সরকারি নানা প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দলবাজি, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পঞ্চায়েত অফিসে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে জমি কমিটির বিরুদ্ধে। অভিযোগ, পঞ্চায়েতের সচিব সুশান্ত দে সরকার, উপপ্রধান হাকিমুল ইসলাম-সহ বেশ কয়েকজনকে মারধর করা হয়। উপপ্রধানের গাড়ি, পঞ্চায়েত অফিসে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে পরে নতুনহাট বাজারে জমি কমিটির নেতা মির্জা হাসানকে মারধর করার অভিযোগ ওঠে উপ-প্রধানের অনুগামীদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে জমি কমিটি আবার পাল্টা লাউহাটি-হাড়োয়া রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে অবরোধ উঠে যায়।
অন্য দিকে, পঞ্চায়েত অফিসে হামলা, সরকারি কর্মীদের মারধর, কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে সরকারি কর্মীরা কর্মবিরতি শুরু করেন। দিন কয়েক আগে ভাঙড় ২ ব্লকের ১০টি পঞ্চায়েতের সরকারি কর্মীরা নিরাপত্তার দাবি তুলে ব্লক অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান। পরে তাঁরা বিডিও, ওসিকে স্মারকলিপি জমা দেন। ওই ঘটনার পরেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে পঞ্চায়েত অফিসে পুলিশ ক্যাম্প করা হয়।
মঙ্গলবার পুলিশ ক্যাম্প পঞ্চায়েত অফিস থেকে সরানোর দাবিতে ফের বিক্ষোভ শুরু করে জমি কমিটি। যে কারণে ফের ওই পঞ্চায়েতে শুরু হয়েছে অচলাবস্থা। সরকারি কর্মীরা পঞ্চায়েত অফিসে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে এলাকার উন্নয়ন-সহ সরকারি নানা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
পঞ্চায়েত ও ব্লক প্রশাসন সূত্রের খবর, সম্প্রতি ওই পঞ্চায়েত এলাকার প্রায় ২৮০০ গরিব মানুষের জন্য বাংলা আবাস যোজনা প্রকল্পে ঘরের নামের তালিকা এসেছে। পঞ্চায়েতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার কারণে নামের তালিকা অনুযায়ী ঘরের টাকার জন্য শংসাপত্র-সহ কাগজপত্র ব্লক অফিসে জমা করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া, ১০০ দিনের কাজ, আধার কার্ড সংশোধনের জন্য শংসাপত্র রিলিফ পরিষেবা, বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা-সহ সরকারি নানা প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকার মানুষ।
পঞ্চায়েতের এগজ়িকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট আয়ুব গাজি বলেন, ‘‘সরকারি কর্মীদের নিরাপত্তা দাবি জানিয়ে আমরা প্রশাসনকে লিখিত ভাবে জানিয়েছিলাম। তারপরে পুলিশ ক্যাম্প করা সত্বেও সেখানে গিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কী ভাবে আমরা পঞ্চায়েতে গিয়ে কাজ করব? যতক্ষণ না পঞ্চায়েতে কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে, ততক্ষণ আমরা কাজে যোগ দিতে পারব না।’’ তাঁর কথায়, ‘‘যারা আক্রমন করল, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’’
এ বিষয়ে উপপ্রধান হাকিমুল বলেন, ‘‘আমরা যদি পঞ্চায়েত অফিসে যেতে না পারি তা হলে সাধারণ মানুষকে পরিষেবা কী ভাবে দেব? কিছু মানুষ পঞ্চায়েতের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। তাদের জন্যই সাধারণ মানুষ সরকারি বিভিন্ন পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এলাকার উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। যারা আমাদের মতো জনপ্রতিনিধিদের দুষ্কৃতী বলছে, তারাই দুষ্কৃতীদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’’
অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জমি কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মির্জা হাসান বলেন, ‘‘আমরা কোনও ভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত পঞ্চায়েত প্রধান, উপপ্রধানকে ঢুকতে দেব না। যখন প্রশাসনের নজরদারিতে পঞ্চায়েতের কাজকর্ম হচ্ছিল, তখন কোনও সমস্যা হয়নি। যখন থেকে প্রধান, উপপ্রধান পঞ্চায়েতে আসতে শুরু করেছেন, তখন থেকেই এক শ্রেণির সরকারি কর্মচারী ওঁদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দুর্নীতি শুরু করেছেন। এর বিরুদ্ধে আমরা সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছি।’’ প্রশাসনের নজরদারিতে পঞ্চায়েতের কাজকর্ম হোক বলে দাবি মির্জার।
এ বিষয়ে ব্লক প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘‘ওই পঞ্চায়েত নিয়ে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে।পুরো বিষয়টির উপরে নজর রাখা হচ্ছে। সেই মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা
নেওয়া হবে।’’