পর্যটনের সম্ভাবনা, তবু ভাবাচ্ছে ভাঙন

পর্যটন মানচিত্রে নামখানার নাম সে রকম ভাবে কোনও কালেই ছিল না। দক্ষিণ ২৪ পরগনার উপকূল এলাকায় দীর্ঘ দিনের দ্বীপভূমি জলা-জঙ্গলে ঢাকা থাকার পরে ব্রিটিশরাই প্রথম উদ্যোগ নেয় নামখানা-বকখালি এলাকায় কিছু করার।

Advertisement

শান্তশ্রী মজুমদার

শেষ আপডেট: ২১ জুলাই ২০১৫ ০১:০১
Share:

নিউ বকখালিতে পাড় ভাঙছে জলের তোড়ে।—নিজস্ব চিত্র।

পর্যটন মানচিত্রে নামখানার নাম সে রকম ভাবে কোনও কালেই ছিল না। দক্ষিণ ২৪ পরগনার উপকূল এলাকায় দীর্ঘ দিনের দ্বীপভূমি জলা-জঙ্গলে ঢাকা থাকার পরে ব্রিটিশরাই প্রথম উদ্যোগ নেয় নামখানা-বকখালি এলাকায় কিছু করার। সরাসরি নামখানায় পর্যটনের পরিকাঠামো গড়ে না উঠলেও ফ্রেজারগঞ্জকে ঘিরে শুরু হয় উদ্যোগ। ব্রিটিশ অফিসারদের হাওয়া বদলের জন্য ফ্রেজারগঞ্জে স্বাস্থ্যনিবাস গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেন তখনকার লেফটেন্যান্ট গভর্নর অ্যান্ড্রু ফ্রেজার। তখনও নামখানা সেই প্রকল্পে সরাসরি আসেনি। বকখালি এবং ফ্রেজারগঞ্জে যাওয়ার আগে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া পেরিয়ে যাওয়ার জন্য নিতান্তই নদীবন্দর হিসেবে ব্যবহার হতো নামখানা। কিন্তু সময় বদলেছে। বেড়েছে নামখানাকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা। মুড়িগঙ্গার চরে উকি মারছে নিউ বকখালি। কিন্তু সেই সব সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার আগেই শেষ করে দিচ্ছে ভাঙন আর দূষণ। কোনওটি নিয়েই সরকারের বিশেষ নজর নেই বলে অভিযোগ।

Advertisement

কাকদ্বীপের লট ৮ ঘাটে চরা পড়ার হার বেশি থাকায় নামখানা-চেমাগুড়ি (সাগর) ফেরি সার্ভিস নামখানা থেকে আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু প্রয়োজন, এই রুটটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে গড়ে তোলার। নামখানা-চেমাগুড়ি লঞ্চ সার্ভিসের আইএনটিটিউউসি নেতা দেবাশিস পাত্র বলেন, ‘‘এখানে ভিন রাজ্য থেকে এখন প্রতিনিয়ত মানুষ আসেন। দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে দিনে ৫ বার লঞ্চ চলে। কিন্তু ঘাটে কোনও বোর্ড নেই। পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। চেমাগুড়ি থেকে ফেরত আসা লঞ্চের কোনও সুনির্দিষ্ট ঘাটও নেই।’’ প্রশাসন, পঞ্চায়েত সমিতি বা পর্যটন দফতর থেকে কোনও তথ্য-বোর্ডের ব্যবস্থা করা নেই ঘাটে। কোথা থেকে লঞ্চ ছাড়বে, ভাড়া কত, সময়সূচি কী— এ সবই ভিন রাজ্যের পর্যটকদের জানতে হয় এর-ওর কাছ থেকে।

সুন্দরবন, ভাগবৎপুর কুমির প্রকল্প, কলস দ্বীপের জঙ্গল ছাড়াও ইন্দ্রপুরের বুড়োবুড়ির তটে যাওয়ার চল বেড়েছে। বেশিরভাগ লঞ্চই ছাড়ে নামখানা থেকে। সরকারি পরিষেবা নেই। বেসরকারি লঞ্চ ভাড়া করতে গেলে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, কোন জেটি থেকে সেগুলি ছাড়বে তারও কোনও তথ্যও সুনির্দিষ্ট ভাবে কোথাও মেলে না। নামখানায় গড়ে উঠেছে কয়েকটি আবাসিক হোটেল। হোটেল ব্যবসায়ী সমীর দাস বলেন, ‘‘পর্যটকেরা এলে আমাদেরই যোগাযোগ করে ব্যবস্থা করে দিতে হয়। নামখানায় কোনও পর্যটক এলে এই তথ্যগুলি অন্তত ঘাটে লেখা থাকলে তাঁদের সুবিধা হত।’’

Advertisement

নামখানার কাছেই বুধাখালি গ্রাম পঞ্চায়েতকে কেন্দ্র করে নিউ বকখালি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সেখানকার গ্রামবাসী, ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন— সকলেই চেষ্টা করছে। মুড়ি গঙ্গার পাড়ে প্রায় ১০০ বিঘে জমিতে বনসৃজন প্রকল্পে ঝাউ, ম্যানগ্রোভ লাগানো হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। কিছু দিন আগেই জেলা পরিষদ থেকে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনায় কাছাড়ি বাড়ি মোড় থেকে ৩ কিলোমিটার একটি পাকা রাস্তা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে বুধাখালির উপর দিয়ে।

কিন্তু ম্যানগ্রোভের জলাজঙ্গল পেরিয়ে গঙ্গার পাড়ে গিয়ে দেখা গেল অন্য চিত্র। নিউ বকখালির পাড় নিয়মিত ভেঙে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামবাসী এবং বন দফতরের লাগানো ম্যানগ্রোভ একটু একটু করে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। সাগরদ্বীপ আর নিউ বকখালির মাঝখানে নতুন দ্বীপ জেগে উঠে মুড়িগঙ্গার স্রোত নিউ বকখালির দিকের ভাঙন বাড়িয়ে দিয়েছে। গড়ে ওঠার আগেই ধ্বংসের পথে এই পর্যটনকেন্দ্রের সম্ভাবনা।

তবে সুন্দরবন উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরা দাবি করছেন, পর্যটন দফতর থেকে শীঘ্রই এলাকা পরিদর্শন করে নিউ বকখালিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। তা হলে ভাঙন রোখার কী হবে? মন্ত্রীর কথায়, ‘‘আমরা খুব আশা করে এই নতুন স্পটটি গড়ে তুলতে চাইছি। তাই জেলা পরিষদ এবং পঞ্চায়েত দফতরের সাহায্যে আমরা ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করব।’’ পর্যটনের সম্ভাবনার কথা যখন ভাবা হচ্ছে, তখন ভাবা দরকার দূষণ নিয়েও। পুরো নামখানা জুড়েই নানা রকম দূষণে জেরবার জীববৈচিত্র্য। নামখানায় মাছের কারবার, হোটেল, বাজারের ক্যারিব্যাগ, সমস্ত আবর্জনা গিয়ে মেশে হাতানিয়া দোয়ানিয়া নদীতে। এলাকায় একটি ভ্যাট রাখারও ব্যবস্থা করা হয়নি। হোটেলের প্লাস্টিকের থালা, পুরনো বাজার, ১ নম্বর কলোনির সমস্ত আবর্জনা, কালো নোংরা জল বিভিন্ন নালা দিয়ে গিয়ে পড়ছে নদীতে। নারায়ণপুর মৌজা থেকে হাতানিয়া দোয়ানিয়ার পাড় বরাবর নাদাভাঙার দিকে গেলে দেখা যাবে, কী ভাবে একটু করে ম্যানগ্রোভ নষ্ট করে নোনা জলের মাছের ভেড়ি তৈরি করা হচ্ছে। সুন্দরবনের বিখ্যাত রাঙা কাঁকড়া (ফিডলার ক্র্যাব), ডাকুর মাছের (মাড স্কিপার্স) আবাস এলাকা জুড়ে। দূষণ বাড়তে থাকলে জীববৈচিত্র্যের উপরে প্রভাবও পড়তে বাধ্য। সে দিকে সচেতন হওয়ার দরকার সব পক্ষের, মনে করেন এখানকার মানুষ। ঘিয়াবতীর বাঁধ বরাবর নারায়ণপুরেই দারিদ্রসীমার নীচে থাকা বেশ কিছু মানুষের শৌচাগার নদীই। বাঁধ বরাবর হাঁটলেই চোখে পড়বে খাটা পায়খানা। এ সবের সঙ্গেই নামখানার খেয়াঘাটে রয়েছে কাটা তেল, কেরোসিনে চলা ভুটভুটি। সব মিলিয়ে নামখানায় দূষণের চিত্রটা পরিবেশকর্মীদের চোখ কপালে তুলে দিতে পারে অনায়াসেই।

(শেষ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement