প্রথম বার ক্ষমতায় আসার পরে পিপিপি মডেলে চারটি মেডিক্যাল কলেজ খোলার কথা ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার। এখনও তার মধ্যে একটিও আলোর মুখ দেখেনি। তার ওপর দু’টি কলেজের দায়িত্বে থাকা একটি নামী শিল্পগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই প্রযুক্তিগত কারণ দেখিয়ে ওই প্রকল্প থেকে সরে এসেছে। অন্য দু’টির ক্ষেত্রেও কাজ এগিয়েছে নামমাত্র।
দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে এ ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্বাস্থ্য দফতরের অন্দরে। স্বাস্থ্যকর্তাদের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রীরই মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল পিপিপি মডেলের ওই প্রকল্প। আশা ছিল, কলেজগুলি চালু হলে রাজ্যে শিক্ষক-চিকিৎসকের ঘাটতি কিছুটা মিটবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কবে ওই কলেজগুলি চালু হবে বা আদৌ চালু হবে কি না, সে নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।
২০১১ সালের নির্বাচনী ইস্তাহারে রাজ্যে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে বাড়তি জোর দিয়েছিল তৃণমূল। দাবি করা হয়েছিল, শুধু সরকারি উদ্যোগে কলেজ খোলার পাশাপাশি পিপিপি মডেলেও মেডিক্যাল কলেজ হবে। কার্শিয়াং, ভাঙড়, কোচবিহার এবং ধুবুলিয়ায় ওই কলেজগুলি খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। প্রথম দু’টির দায়িত্ব পেয়েছিল টেকনো ইন্ডিয়া এবং পরের দু’টির ক্যামেলিয়া গোষ্ঠী। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে এ ব্যাপারে রাজ্য সরকারের সঙ্গে তাদের চুক্তিও সই হয়েছিল।
কিন্তু ক্যামেলিয়া গোষ্ঠী এই প্রকল্প থেকে সরে এসেছে। সংস্থার কর্ণধার নীলরতন দত্ত বলেন, ‘‘আমরা কিছু দিন আগেই সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা হচ্ছে। স্বাস্থ্য দফতর ওই দু’টি মেডিক্যাল কলেজের ব্যাপারে আবার নতুন করে দরপত্র ডাকবে। তা ছাড়া আমরা এখন পিপিপি মডেলের পরিবর্তে নিজেদের মেডিক্যাল কলেজ গড়তে বেশি আগ্রহী। বর্ধমানে এ ব্যাপারে কাজ শুরু হয়েছে।’’ স্বাস্থ্যকর্তারা অবশ্য বলছেন, প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। সমস্যাটা অন্যত্র। ফি বছর স্বাস্থ্য দফতরকে জমির খাজনা বাবদ টাকা দেওয়া, চিকিৎসক-অচিকিৎসক কর্মীদের বেতন, পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও ওষুধপত্র মিলিয়ে যা খরচ হবে, তাতে লাভের গুড় পিঁপড়েয় খাবে বলে বুঝতে পেরেছে অনেক শিল্পগোষ্ঠী। তার ওপরে মেডিক্যালে অভিন্ন প্রবেশিকা চালু হলে বেসরকারি কলেজগুলি ছাত্রভর্তি বাবদ মোটা টাকা আদায় করতে পারবে না। সব মিলিয়েই তারা পিপিপি মডেলে মেডিক্যাল কলেজ খোলা থেকে আগ্রহ হারাচ্ছে। স্বাস্থ্য (শিক্ষা) অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘কার্শিয়াংয়ে সামান্য কাজ এগিয়েছিল। তার পর সবই ঢিমেতালে। বাকিগুলির ক্ষেত্রে কিছুই হয়নি।’’
কার্শিয়াং ও ভাঙড়ে এখনও পর্যন্ত জমির চার দিক ঘিরে দেওয়াল তোলা ছাড়া আর কিছুই হয়নি। যদিও টেকনো ইন্ডিয়ার কর্ণধার গৌতম রায়চৌধুরীর দাবি, ‘‘এক বছরের মধ্যেই কলেজ চালু হবে। জার্মানির একটি নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা ইস্পাতের কাঠামো তৈরি করে ওই দু’টি জায়গায় বসাব। তার মাস তিনেকের মধ্যেই কলেজ তৈরি হয়ে যাবে।’’ তিনি জানান, একটি কলেজ ২০১৭ এবং অন্যটি ২০১৮-র গোড়ার দিকেই চালু হয়ে যাবে।
যেখানে অন্য গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই প্রকল্প থেকে সরে গিয়েছে, সেখানে তাঁরা আগ্রহী হচ্ছেন কী করে? গৌতমবাবুর বক্তব্য, ‘‘আমাদের অন্য নানা প্রকল্প থেকে প্রচুর উপার্জন হচ্ছে। তাই শুধু এই কলেজ দু’টিই নয়, পিপিপি মডেলে বাকি দু’টি কলেজের ক্ষেত্রে সরকার দরপত্র ডাকলে আমরা তাতে অংশগ্রহণ করব। ওই দু’টি কলেজও আমরা চালু করতে আগ্রহী।’’
রাজ্যে শিক্ষক-চিকিৎসকের অভাব মেটাতে একাধিক পদক্ষেপ করেছে রাজ্য সরকার। নতুন মেডিক্যাল কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত তারই অন্যতম। সেই সব কলেজে শিক্ষক-চিকিৎসক জোগান দিতে অবসরের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, ‘‘মেডিক্যালে অভিন্ন প্রবেশিকা চালু হলে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলি আগ্রহ হারাবে। তাই সরকারি মেডিক্যাল কলেজই এ রাজ্যে ডাক্তার তৈরির ভবিষ্যৎ।’’
পিপিপি মডেলের ওই মেডিক্যাল কলেজগুলি গড়া নিয়ে টানাপড়েন চলছিল গোড়া থেকেই। সরকারের বক্তব্য ছিল, বার বার চিঠি দিয়েও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি উত্তর দিচ্ছে না। একটা ইটও ফেলা হচ্ছে না। শিল্পগোষ্ঠীগুলির পাল্টা অভিযোগ, সরকারের দীর্ঘসূত্রতাই কাজে দেরির মূল কারণ। তার ওপরে ধুবুলিয়ায় দরপত্রে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলে পেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল একটি গোষ্ঠী। সব মিলিয়ে এই প্রকল্পে গতির অভাব ঘটেছিল গোড়া থেকেই।
এ রাজ্যে এখনও পর্যন্ত পিপিপি মডেলে একটিই মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। সেটি হল যাদবপুরের কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ। যেখানে পিপিপি মডেলে অন্য কোনও কলেজ চালুই করা যাচ্ছে না, সেখানে কেপিসি টিকে থাকছে কী ভাবে? প্রতিষ্ঠানের তরফে চিত্তরঞ্জন মাইতি বলেন, ‘‘এলাকাগত দিক থেকে খুবই সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছি। প্রত্যন্ত এলাকায় কলেজ হলে সেগুলো চালানোও সমস্যা। তা ছাড়া এক একটি কলেজ গড়তে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা খরচ হয়। যারা বিনিয়োগ করবে, তারা কীসের আশায় ওই সব এলাকায় বিনিয়োগে আগ্রহী হবে, সেটাও প্রশ্ন।’’
তা হলে কি থমকেই যেতে বসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের ওই প্রকল্প? সেটাই এখন দেখার।