ত্রয়ী: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে প্রণব মুখোপাধ্যায়, কেশরীনাথ ত্রিপাঠী এবং সুরঞ্জন দাস। রবিবার। ছবি: শশাঙ্ক মণ্ডল
‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাবো’ নয়। যদি কাজ না-পারি, তা হলে চলেই যাবো। বারবার কেন এমন কথা বলতে হচ্ছে উপাচার্যের মতো উচ্চ পদের কোনও অধিকারীকে?
২০১৬ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১তম সমাবর্তনে উপাচার্য সুরঞ্জন দাস জানিয়েছিলেন, কাজ করতে না-পারলে তিনি সরে দাঁড়াবেন। রবিবার, ৬২তম সমাবর্তনে একই কথা বললেন তিনি। শিক্ষা শিবিরের প্রশ্ন, এই বক্তব্যের পিছনে কি বিশেষ কোনও কারণ রয়েছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বলেই এটা বলতে হচ্ছে উপাচার্যকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকে বলছেন, সেখানকার পড়ুয়া এবং শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার মনোভাব রয়েছে। যে-কোনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনই কার্যত উপাচার্য ঘেরাওয়ের রূপ নেয়। বছর কয়েক আগে ‘হোক কলরব’ এবং উপাচার্যের পদ থেকে অভিজিৎ চক্রবর্তীকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা প্রবলতর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অংশ। তাই উপাচার্য। বারবার জানান দিচ্ছেন, অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে আক্রমণ করা হলে যে-কোনও মুহূর্তে তিনি পদ ছেড়ে দিতে পারেন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী ভাবমূর্তির কথা উল্লেখ করেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও। এ দিন সমাবর্তনে তাঁকে ডিলিট দেওয়া হয়। সেখানে তিনি জানান, এই বিশ্ববিদ্যালয় বহু বার বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। তার ফলে বেশ কিছু রাজনৈতিক অসুবিধারও সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় যেন সেই ঐতিহ্য বজায় রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সাফল্যের মূলে আছে এই ঐতিহ্য, মন্তব্য করেন তিনি।
উপাচার্যও বলেন, ‘‘আমার পড়ুয়ারা পড়াশোনা করে, সামাজিক কাজ করে এবং সমালোচনা বা প্রতিবাদও করতে পারে। আমি এদের জন্য গর্ব বোধ করি।’’ কিন্তু এই প্রতিবাদ কখনও যাতে অগণতান্ত্রিক না-হয়, উপাচার্য সেই বিষয়ে সতর্ক করে দিতেই পদ ছাড়ার মতো উক্তি করেছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অংশের ধারণা। কোনও দিক থেকে কোনও রকমের চাপ এলেই যে তিনি সরে যেতে পারেন, সেই ইঙ্গিত দিয়ে রাখছেন সুরঞ্জনবাবু।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে উপাচার্য বলেন, ‘‘আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবিদাওয়া জানানো যেতেই পারে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যাতে কারও স্বাধীনতা হরণ করা না-হয়, সেটাও দেখা উচিত।’’ তিনি ঘেরাওয়ের বিরুদ্ধেই বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে মনে করছে শিক্ষা মহল। পরে উপাচার্য বলেন, ‘‘ও-কথা বলে এটাই বোঝাতে চাই যে, আমি আমার সবটা দিয়ে কাজ করি। কিন্তু পদের প্রতি আমার কোনও মোহ নেই। কাজ করতে না-পারলে আমি নিজেই ছেড়ে দেবো।’’
চাকরির সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুরঞ্জনবাবু। তিনি জানান, সম্প্রতি একটি রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, গোটা দেশের নিরিখে টেকনিক্যাল স্নাতকদের মাত্র ২৫ শতাংশ এবং সাধারণ স্নাতকদের ১০-১৫ শতাংশ তৎক্ষণাৎ চাকরি পান। এটা খুবই আশঙ্কাজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। সেই জন্য শিল্প ও শিক্ষার মেলবন্ধনের পাশাপাশি বেশ কিছু নতুন ‘স্কিম’ আনা উচিত। তবে তিনি এটাও জানান, উচ্চশিক্ষার আসল উদ্দেশ্য ভাল নাগরিক তৈরি করা। সেটা যেন ব্যাহত না-হয়।
এর পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সঙ্কটের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ আনেন সুরঞ্জনবাবু। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য মোটা টাকা বরাদ্দ করা হলেও রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালগুলি কম টাকা পায়। তবে আর্থিক সঙ্কট দূর করতে রাজ্য সরকার যথেষ্ট সহযোগিতা করছে বলে মন্তব্য করেন উপাচার্য।