NeVA

মোদীর আবেদনেও সাড়া দেননি দিদি! পালাবদল হতেই কেন্দ্রের সঙ্গে মউ সই স্পিকারের, রাজ‍্য বিধানসভা জুড়ল কেন্দ্রীয় মঞ্চে

বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এবং আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়ালের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু কেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করেছেন।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ ১৫:২১
Share:

কিরেন রিজিজু এবং রথীন্দ্র বসু। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে। ছবি: ফেসবুক।

বিধানসভার কার্যপ্রণালীতে স্বেচ্ছাচারের অভিযোগ প্রায় জলভাত হয়ে উঠেছিল পশ্চিমবঙ্গে। খোদ স্পিকারের বিরুদ্ধে বার বার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠত। বিরোধী দলের আনা প্রস্তাব গ্রহণই না-করা, বিরোধী দলনেতাকে বার বার অধিবেশন থেকে সাসপেন্ড করা, বিরোধী দলের কোনও বক্তব‍্য মুখ্যমন্ত্রীর জন‍্য অস্বস্তিকর হলেই তাকে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ— গত ১৫ বছরে এই ছবিই পরিচিত হয়ে উঠেছিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায়। কিন্তু সে জমানাকে ইতিহাসে পাঠিয়ে বিধানসভার যাবতীয় কাজকর্মে স্বচ্ছতা সুনিশ্চিতকরণের পদক্ষেপ করা হল। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে মউ (সমঝোতাপত্র) স্বাক্ষর করে ‘জাতীয় ই-বিধান অ‍্যাপ্লিকেশন’ (নেভা) ব‍্যবস্থায় শামিল হল পশ্চিমবঙ্গ। এত দিন কেন এই ডিজিটাল মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ ছিল না, তার সদুত্তর প্রাক্তন শাসক দলের কাছে নেই।

Advertisement

বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এবং আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়ালের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু কেন্দ্রের সঙ্গে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভার্চুয়াল মাধ্যমে সে বৈঠকে যোগ দেন। শুক্রবার সকাল থেকেই ‘নেভা’ পোর্টালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার জন‍্য পৃথক ট‍্যাব দৃশ‍্যমান। তাতে ক্লিক করলে অবশ‍্য বিধানসভার কাজকর্ম সম্পর্কে বেশি তথ‍্য এখনই পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সবে এই বন্দোবস্তে শামিল হল। এ বার থেকে স্পিকার, মন্ত্রী এবং বিধায়কেরা নিজেদের যাবতীয় পরিষদীয় কাজ এই ‘নেভা’ অ‍্যাপের মাধ‍্যমেই করবেন। ফলে ‘নেভা’ পোর্টালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার কাজকর্ম সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ‍্য নথিভুক্ত হতে থাকবে।

দেশের ৩৩তম আইনসভা হিসাবে ‘নেভা’ মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ শামিল হল বলে স্পিকার রথীন্দ্র সমাজমাধ‍্যম পোস্টে লিখেছেন। এর আগে লোকসভা, রাজ্যসভা তো বটেই অন‍্যান‍্য রাজ‍্যের বিধানসভা, বিধান পরিষদও ‘নেভা’য় শামিল হয়ে গিয়েছিল। সে তালিকায় কংগ্রেস শাসিত বা বিরোধী জোট ইন্ডিয়া অন‍্য কোনও দল শাসিত রাজ্যগুলিও ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ছিল না। একটি মাত্র পোর্টাল বা অ‍্যাপ খুলে দেখলেই দেশের যে কোনও নাগরিক দেশের যে কোনও আইনসভার কাজকর্ম সম্পর্কে যাবতীয় তথ‍্য পেয়ে যাবেন, এমন একটি ব‍্যবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তথা স্পিকার বিমান বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় ‘শাসিত’ বিধানসভা শামিল হয়নি। অথচ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সব আইনসভাকে এই ব‍্যবস্থাপনার অংশ হতে অনুরোধ করেছিলেন।

Advertisement

বছর পাঁচেক আগেই প্রধানমন্ত্রী সে অনুরোধ রেখেছিলেন। ২০২১ সালের শেষ দিকে হিমাচল প্রদেশের সিমলায় আয়োজিত হয়েছিল সর্বভারতীয় অধ‍্যক্ষ সম্মেলন (অল ইন্ডিয়া প্রিসাইডিং অফিসারস’ কনফারেন্স)। মোদী সে সম্মেলন ভার্চুয়াল মাধ্যমে উদ্বোধন করেন। দেশের সংসদ হোক বা রাজ‍্যের আইনসভা, কাজকর্মের স্বচ্ছতা সুনিশ্চিত করতে এবং জনসাধারণের সামনে সে আইনসভার কাজকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ‍্য পাওয়ার সুযোগ রাখতে এই ব‍্যবস্থা তৈরি হয়েছে বলে তিনি ব‍্যাখ‍্যা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ‘নেভা’ অ‍্যাপের মাধ‍্যমে সাংসদ বা বিধায়করা নোটিস জমা দেওয়া, প্রশ্ন জমা দেওয়া, প্রস্তাব আনা-সহ বিভিন্ন কাজ ডিজিটাল মাধ্যমেই করতে পারেন। তাই এই ব‍্যবস্থা চালু হলে আইনসভাগুলিতে কাগজের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যাবে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন। এই পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে সব আইনসভাকে যুক্ত হতে বলেছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বা বিধানসভা প্রধানমন্ত্রীর সে আহ্বানে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। রাজ‍্যে পালাবদলের পরে এক মাস কাটতে না কাটতেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সে উদ্যোগের অংশ হল।

‘নেভা’ অ‍্যাপের মাধ‍্যমে সাধারণ নাগরিকও আইনসভার কাজকর্মে নজর রাখতে পারবেন। শুধু তাই নয়, নিজেদের পরামর্শ বা মতামতও নথিভুক্ত করতে পারবেন। বিধানসভার অধিবেশনের লাইভ সম্প্রচারও অ‍্যাপের মাধ্যমেই দেখা যাবে। এই বন্দোবস্তের ফলে বিধানসভা বা যে কোনও আইনসভার কার্যপ্রণালী নির্দিষ্ট বিধি তথা ‘রুলবুক’ অনুযায়ী চালাতে সব পক্ষই বাধ্য হবেন বলে অনেকে মনে করছেন।

এমন একটি মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ এত দিন শামিল হয়নি কেন? পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রাক্তন স্পিকার তথা তৃণমূল বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘আমি কোনও মন্তব্য করতে চাই না। শুধু এটুকু বলব, আমরা কেন্দ্রের সঙ্গে সহযোগিতার মানসিকতা নিয়েই কাজ করেছি। দেশের সংসদীয় ব‍্যবস্থার কাঠামোর মধ্যে থেকেই যা করার করেছি।’’ তা হলে ‘নেভা’য় এত দিন রাজ‍্য বিধানসভা ছিল না কেন? তৎকালীন রাজ‍্য সরকার কি এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, এই ব‍্যবস্থায় শামিল হওয়া যাবে না? বিমান বলছেন, ‘‘না, এ রকম কোনও সিদ্ধান্ত আমরা নিইনি।’’ কিন্তু প্রাক্তন স্পিকার যা-ই বলুন, বাস্তব হল, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা এত বছর ধরে নিজেকে এই ‘স্বচ্ছতা সুনিশ্চিতকরণ’ ব‍্যবস্থার বাইরে রেখেছিল।

বর্তমান স্পিকার রথীন্দ্র কেন্দ্রের সঙ্গে এই সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করতে পেরে খুশি। তবে তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনও রাজনৈতিক আক্রমণে যেতে চাননি। রথীন্দ্র বলেছেন, ‘‘গোটা দেশ যে ব‍্যবস্থায় শামিল হয়ে গিয়েছিল, যে কোনও কারণেই হোক, এত দিন আমরা সে ব‍্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। কিন্তু এখন আর বিচ্ছিন্ন নই। এটাই সবচেয়ে বড় সুখবর।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement