— প্রতীকী চিত্র।
সংসার আর রাজ্য চালানোর মধ্যে খুব একটা ফারাক নেই— বলছিলেন রাজ্যের এক শীর্ষ আমলা। মজা করেই জুড়েছিলেন, “সকালে বাবা দেখে নেন, তাঁর পার্সে কত টাকা রয়েছে। আর অফিসে এসেই সিস্টেমে ঢুকে আমি দেখে নিই, আজকে তহবিলে কত টাকা পড়ে রয়েছে।”
কথাটা ঠিক। টানাটানির সংসারে দিন শুরু আগে মানি-ব্যাগের ওজনটা বুঝে নেওয়া জরুরি।
অর্থ-কর্তাদের একাংশ টানাচ্ছেন, এক দিকে কেন্দ্রীয় একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দ বন্ধ, যার ভার চেপেছে রাজ্যের উপরে। অন্য দিকে, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ৯৫টি সামাজিক প্রকল্পের চাপ। ফলে গত প্রায় ১৪ বছরে রাজস্ব ৫.৩৩ গুণ বাড়লেও, যত্র আয়ের সংসারে রয়ে গিয়েছে তত্র ব্যয়ও।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত, দীর্ঘ না স্বল্প মেয়াদের? বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পথটি কঠিন, কিন্তু ফল হয় ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী। তাতে অর্থনীতির চাকা ঘোরে, বাড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও। ব্যবসা এবং বিকল্প আয় বৃদ্ধিরও সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু দ্রুত ফলের আশায় অনেক সময়ে রাজনৈতিক দিক থেকে স্বল্পমেয়াদে খয়রাতির পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যার সঙ্গে জুড়ে থাকে ভোট-রাজনীতির স্বার্থ। এর ফলে ভান্ডারে টানাটানি পড়া ও ঋণ-সুদের বোঝা বৃদ্ধিও অস্বাভাবিক নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাই দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে এই দুই বিষয়ের মধ্যেভারসাম্যই জরুরি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন ধারের বোঝা ছিল প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা। এখন তা প্রায় ৭.৭১ লক্ষ কোটি টাকা। বাড়ছে রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণও। অনেকের মতে, ২০১১ সালে পালাবদলের পরেও যদি শিল্প আনার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ করত সরকার, তা হলে এই অর্থেরই অনেক গুণ ফিরে আসত স্থায়ী সম্পদ হয়ে। সে ক্ষেত্রে ধার বাড়লেও তা মোকাবিলার মতো রাজকোষ শক্তিশালী হত। কর্মসংস্থান নিয়েও পরিস্থিতি উন্নত হত।
কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বর্তমান সরকার এমন কিছু পদক্ষেপ করেছে, যার ফলে শিল্পের গতি কিয়দংশে রুদ্ধ হয়েছে বলেই দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। যেমন, একে তো শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট কোনও নীতি তৈরি হয়নি সরকারের। তার উপরে গত মার্চের মাঝামাঝি শিল্পে সব ধরনের উৎসাহ ছাড় (ইনসেন্টিভ) দেওয়ার চালু সুবিধা আচমকাই প্রত্যাহার করে রাজ্য। রাজ্য জানায়, এই নীতিতে অতীতের কিছু বকেয়া থাকলে, তা-ও শিল্পমহলের দাবির আওতায় আসবে না। উল্টে, ‘বৃহত্তর জনস্বার্থে’ কল্যাণ তথা অনুদান-সামাজিক প্রকল্পগুলির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সেগুলিকে আরও জোরদার করাই উদ্দেশ্য, জানিয়ে দেয় রাজ্য।
বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আর্থিক সুবিধা (উৎসাহ ছাড়), ভর্তুকি, সুদ-কর-ডিউটিতে ছাড়-সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চালু রীতি আচমকা প্রত্যাহার নিয়ে তৈরি হয়েছিল জল্পনা। তা আরও ইন্ধন দেয় গত এপ্রিলে পর্যটনেও (তাকেও শিল্পের মর্যাদা দিয়েছিল রাজ্য) ‘ইনসেন্টিভ’ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তে। সব মিলিয়ে, বিভিন্ন শিল্প-সহ পরিষেবা (হোটেল, রেস্তরাঁ ইত্যাদি) ক্ষেত্রের উপর বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ, শিল্প-উৎসাহ খাতে বছরে রাজ্যের খরচ হত ৪০০-৮০০ কোটি টাকা। ওই খাতে বকেয়ার পরিমাণ কমবেশি ১০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলেও মনে করেন আধিকারিকদের একাংশ।
যদিও নবান্নের অন্দরের বক্তব্য, “শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের উপযুক্ত অনুঘটক হিসাবে এই নীতি কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি বলেই তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। তাই এই খাতের বিপুল অর্থ কল্যাণ (অনুদান) প্রকল্প-সহ অন্যান্য সামাজিক-পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বরাদ্দ হলে, অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব আসবে।” অবশ্য পর্যটনে একটা ইতিবাচক বৃদ্ধির ইঙ্গিত পেয়েছে এ রাজ্য। পর্যটক আগমনে দেশে দ্বিতীয় পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু শিল্পে উৎসাহ নীতি প্রত্যাহার হওয়ার পরে হোটেল-রেস্তরাঁয় বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান কতটা বাড়বে, তা নিয়ে প্রশ্নথেকেই গিয়েছে।
সরকারের এই অবস্থানকে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হিসাবেই দেখতে চাইছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি বা পরোক্ষ কর্মসংস্থান, নানা ধরনের আয়ের সুযোগ, শিল্প-পরিকাঠামোকে কেন্দ্র করে হওয়া নগরায়নের ফলে জমি-বাড়ির দামবৃদ্ধি, বাজার-দোকান-বিনোদন ইত্যাদির মাধ্যমে যে ভাবে অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়ন হয়, মানুষের হাতে টাকা আসে, তা স্বল্পমেয়াদে হওয়া কঠিন।
প্রশ্ন থেকে যায়, বিপুল সংখ্যক উপভোক্তা তৈরি এবং নানাবিধ সরকারি প্রকল্পের উপর তাঁদের নির্ভরশীল হয়ে পড়া কি ভবিষ্যতের পক্ষে শুভ! না কি এমন পরিবেশ কাঙ্ক্ষিত?
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি এখন এই দ্বন্দ্বেই আটকে রয়েছে। রাজ্যের কর্মসংস্থানের সুযোগও এই চক্রেই ঘুরছে। আপাতত তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনও পরিকল্পনার ছাপ অন্তত প্রশাসনিক স্তরে সে ভাবে দেখা যাচ্ছেনা, বলছেন বিশেষজ্ঞরাই।
(শেষ)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে