শব্দ হাতড়ে ডাক্তারেরা বধূর বাড়ি খুঁজলেন

একটা শব্দ। ‘আক্কা’। তেলুগু সেই শব্দই খুঁজে দিল ১৫ বছর ধরে নিখোঁজ, আংশিক স্মৃতিভ্রষ্ট এক মহিলার ঠিকানা। তাঁকে ফিরিয়ে নিতে সুদূর তেলঙ্গানা থেকে এ রাজ্যে আসছেন প্রিয়জনেরা। সৌজন্যে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজের কিছু ডাক্তারের নাছোড় চেষ্টা।

Advertisement

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬ ০৪:৩২
Share:

বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় লক্ষ্যাম্মা। ছবি: অভিজিৎ সিংহ।

একটা শব্দ। ‘আক্কা’।

Advertisement

তেলুগু সেই শব্দই খুঁজে দিল ১৫ বছর ধরে নিখোঁজ, আংশিক স্মৃতিভ্রষ্ট এক মহিলার ঠিকানা। তাঁকে ফিরিয়ে নিতে সুদূর তেলঙ্গানা থেকে এ রাজ্যে আসছেন প্রিয়জনেরা। সৌজন্যে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজের কিছু ডাক্তারের নাছোড় চেষ্টা।

গত ১৩ অগস্ট বাঁকুড়া শহরে এক দুর্ঘটনায় জখম বছর সাতচল্লিশের ওই মহিলাকে বাঁকুড়া মেডিক্যালে ভর্তি করায় পুলিশ। হাসপাতালে তাঁকে দেখছিলেন চিকিৎসক পূর্বা চক্রবর্তী। পূর্বাদেবীর অভিজ্ঞতা, ‘‘কোনও কারণে মহিলার আংশিক স্মৃতিভ্রংশ (পার্শিয়াল অ্যামনেশিয়া) হয়েছিল। ভর্তি হওয়ার পরে বেশ কিছু দিন উনি কথাও বলেননি কারও সঙ্গে।’’

Advertisement

তার পরের তিন মাস হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন মহিলার পরিচয় ছিল ‘তিন নম্বর বেডের পেশেন্ট’। হাসপাতাল সূত্রের খবর, ক্ষত সেরে গেলেও তিনি নিজের পরিচয় জানাতে পারছিলেন না। বিড়বিড় করতেন। কিন্তু তা কোন ভাষায়, বোঝা যায়নি। তবে হাল ছাড়েননি পূর্বাদেবী এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপার সব্যসাচী ঘোষ। বাংলা-ইংরেজি-হিন্দিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাঁরা ওই মহিলার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁদের কথায়, ‘‘একটা সময় মনে হতো, দেওয়ালের সঙ্গে কথা বলছি। তবু চেষ্টা করতে ছাড়িনি।’’

সবুরে মেওয়া ফলে। সপ্তাহ দু’য়েক আগে তেমনই এক কথা বলার চেষ্টা চালানোর পর্বের মধ্যেই হঠাৎ ওই মহিলা বলে ওঠেন— ‘‘আক্কা’’। দক্ষিণ ভারতীয় এক বান্ধবীর সূত্রে পূর্বাদেবী জানতেন, তেলুগুতে ‘আক্কা’ শব্দের অর্থ ‘দিদি’। হাসপাতালেরই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ শ্রীনিবাসের আদি বাড়ি কর্নাটকে। তিনি অল্প-বিস্তর তেলুগু জানেন। এ বার তিনি মাঠে নামেন। একটা-দু’টো শব্দ বলতে বলতে গোটা বাক্য। স্মৃতি কিছুটা ফিরতে ‘তিন নম্বর বেডের পেশেন্ট’ জানান, তিনি ‘লক্ষ্যাম্মা’ (লক্ষ্মী আম্মা)। বাড়ি পালামুরায়। ‘গুগল সার্চ’ করে পূর্বাদেবী জানতে পারেন, এক সময়ে অন্ধ্রপ্রদেশের পালামুরা এখন তেলঙ্গানার মহবুবনগর জেলা। সেখানকার কাটাকাদিরা গ্রামেই বাড়ি ‘লক্ষ্যাম্মা’র।

ডাক্তারেরা এ বার যোগাযোগ করেন, মহবুবনগরের পুলিশ সুপারের সঙ্গে। একপ্রস্ত ফাইল ঘেঁটে পুলিশ জানায়, ১৫ বছর আগে বাপের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন ‘লক্ষ্যাম্মা’। বহু খুঁজেও তাঁর সন্ধান মেলেনি। পুলিশ জোগাড় করে আত্মীয়দের ফোন নম্বর। ফোনের অন্য প্রান্তে পরিচিত গলা শুনে কথার বাঁধ ভাঙে ‘লক্ষ্যাম্মা’র। চোখের জলেরও।

কাটাকাদিরা পঞ্চায়েতের প্রধান নরসিংহ রেড্ডি বলেন, ‘‘লক্ষ্যামার স্বামী ও দুই ছেলে রয়েছে। ওঁরা বাঁকুড়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। রবিবার (কাল) পৌঁছে যাবেন।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘হারানো কাউকে এ ভাবেও ফেরত পাওয়া যায়, জানতাম না! ধন্যবাদ, ওই ডাক্তারদের।’’ বাঁকুড়া মেডিক্যালের সুপার পঞ্চানন কুণ্ডুও মানছেন, ‘‘মহিলাকে বাড়ি ফেরাতে ওই ডাক্তারেরা যা করেছেন, তাতে সহকর্মী হিসেবে আমি গর্বিত।’’

‘তিন নম্বর বেডের পেশেন্ট’কে ‘লক্ষ্যাম্মা’য় বদলানোর হাসি পূর্বাদেবী, সব্যসাচীবাবু, শ্রীনিবাসদের মুখে। বলেছেন, ‘‘চাইব, বাড়ি ফিরেও যেন ভাল থাকেন আক্কা।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement