ছাত্রদের বিক্ষোভে আটকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা ও অন্য শিক্ষকেরা। ছবি: উদিত সিংহ।
বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না রাজ কলেজের।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ ওঠা, তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে অন্য শিক্ষিকাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে না হতেই তাঁকে আটকে রেখে বিক্ষোভ, ঘেরাও রাজ কলেজে। টিএমসিপি-র সমর্থকদের সামাল দিতে আসরে নামতে হল পুলিশ ও সংগঠনের নেত্রীকেও।
ভর্তি প্রক্রিয়া চলাকালীন কলেজে বহিরাগতদের ‘দাপাদাপি’ বন্ধ করার জন্য পুলিশ মোতায়েন করেছিলেন সদ্য দায়িত্বে আসা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা। কিন্তু কলেজে পুলিশ কেন, সেই রাগে শিক্ষকদের আটকে সোমবার দুপুর থেকে বিক্ষোভ শুরু করে দেন রাজ কলেজের টিএমসিপি সমর্থকেরা। শেষে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা নিরুপমা গোস্বামী টিএমসিপি-র রাজ্য সভানেত্রী জয়া দত্তকে ফোন করে বিষয়টি জানান। উপরতলা থেকে কড়া নির্দেশ আসতেই কলেজ ছাড়েন বিক্ষোভকারীরা।
নিরুপমাদেবী বলেন, ‘‘পড়ুয়াদের স্বার্থে কোনও অনৈতিক দাবির কাছে মাথা নত করব না। কলেজে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনব।” কড়া বার্তা দেন টিএমসিপি-র রাজ্য সভানেত্রী জয়াদেবীও। তিনি বলেন, ‘‘সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা না করে এ ধরনের হঠকারী আন্দোলন যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে সংগঠন কড়া ব্যবস্থা নেবে। শিক্ষক নিগ্রহ করে রাজনীতি, ঘেরাও একেবারেই চলবে না।’’
এ বছর কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ছাত্র সংসদকে দূরে থাকার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী। গোলমাল এড়াতে অনালাইনেই চলছে ভর্তি প্রক্রিয়া। তারপরেও নানা কারণে কলেজে সংসদের ‘দাপাদাপি’ চলছেই। উপরমহলের বারবার নির্দেশ সত্বেও শিক্ষকদের ঘেরাও করার ঐতিহ্য পিছু ছাড়ছে না এ রাজ্যে।
কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন বেলা দু’টো থেকে ঘেরাও শুরু করে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ছেলেমেয়েরা। তাঁদের দাবি ছিল, ভর্তির সময়ে কলেজ চত্বরে পুলিশ স্থায়ী ভাবে রাখা যাবে না। জানা যায়, এ বারে গোলমাল এড়াতে কলেজ কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই পুলিশকে নির্দেশ দেয় যে ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও সহকারী সাধারণ সম্পাদক ছাড়া অন্য কোনও পদাধিকারী যোগ দিতে পারবেন না। তা ছাড়াও ছাত্র সংসদের সদস্যদেরও পরিচয়পত্র ছাড়া কলেজে ঢোকার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করা হয়। এই সব ‘নির্দেশ’ নিয়ে সংসদের একাংশ ছাত্র যে বেশ অখুশি তা বোঝা যায় ছাত্র সংসদের নেতাদের কথাতেই। ছাত্র সংসদের নেতা বিশ্বজিৎ সিংহ, শেখ বাপ্পারা বলেন, “তারকেশ্বরবাবুর আমলে তো কলেজের ভিতর পুলিশ ঢুকতে দেখিনি! আমরা কলেজের ছাত্র প্রতিনিধি। আমাদের পরিচয়পত্র দেখাতে হবে পুলিশকে! এটা আমরা অনিয়ম মনে করি। ভর্তি প্রক্রিয়া ও পরীক্ষাতেও গোলমাল হচ্ছে।”
এই দাবির সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের আগে কলেজের এক শিক্ষিক প্রশ্নপত্র খুলেছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। কলেজ সূত্রে জানা যায়, এ দিন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের পাস কোর্সের ভূগোল পরীক্ষা ছিল। ছাত্র সংসদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্যাকেট থেকে প্রশ্নপত্র বের করতে দেখা গিয়েছে এক শিক্ষককে। এই অভিযোগে ছাত্র সংসদের কয়েকজন প্রতিনিধি ওই শিক্ষককে হেনস্থাও করেন। রাতে ওই শিক্ষক বর্ধমান থানায় অভিযোগও দায়ের করেছেন। ওই শিক্ষকের দাবি, “পুরনো প্রশ্নপত্র বাছাই করার সময় পরিকল্পনা করে আমার সামনে এক হাজার টাকার নোট ধরে মোবাইলে ছবি তোলা হচ্ছিল। তৎক্ষনাৎ বর্ধমান থানায় ফোন করে অভিযোগ জানানো হয়।” প্রশ্ন উঠছে, পরীক্ষা কেন্দ্রের কাছে ছাত্র প্রতিনিধিরা কী করছিলেন? কেনই বা তারা সেখানে গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছিল? জবাব মেলেনি ছাত্র সংসদের কাছ থেকে।
পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষাকে ঘিরেও বিক্ষোভ শুরু করেন সংসদের ছেলেমেয়েরা। অভিযোগ, প্রায় পাঁচ ঘন্টা ধরে ঘেরাও চলার পরে কয়েকজন শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে তাঁদের আবার অন্য ঘরে আটকে রাখে ছাত্র সংসদের কয়েকজন সদস্য। পুলিশও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এরপরেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভাপতি জয়া দত্তকে ফোন করে ঘটনাটা খুলে বলেন নিরুপমাদেবী। তারপরেই রাজ্য থেকে জেলায় ঘেরাও তুলে নেওয়ার নির্দেশ যেতেই একে একে ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা কলেজ ছাড়েন। রাত ন’টা নাগাদ পুলিশের উপস্থিতিতে কলেজ ছাড়েন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা ও অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের বেশ কিছু শিক্ষকের দাবি, ছাত্র সংসদের পড়ুয়াদের কথাতেই বোঝা যাচ্ছে ‘অনৈতিক’ দাবি নিয়ে ঘেরাও করার জন্য মদত কে বা কারা দিচ্ছেন। যদিও ছাত্র সংসদের তরফে কেই কিছু বলতে চাননি।