ব্যবসায় লক্ষ্মীলাভের স্বপ্ন দেখছে শহর

জাতীয় সড়কের ফাঁসে থমকে থাকার বাইরেও রয়েছে একটা অন্য পানাগড়। যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি মেখে রয়েছে সেনাছাউনি। রয়েছে সম্প্রীতির উত্‌সব, দানবাবার মেলা। আর রয়েছে গাড়ির যন্ত্রাংশের অন্যতম বড় বাজার, যেখানে নিত্যদিন হাজারো মানুষের আসা-যাওয়া। পানাগড়বাসীদের নানা যন্ত্রণার পাশাপাশি গর্বের একটা বড় জায়গা এই গাড়ি-বাজার।

Advertisement

সুব্রত সীট

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০১:২৪
Share:

খুপরি ঘরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে গাড়ির যন্ত্রাংশ কেনাবেচা। ছবি: বিশ্বনাথ মশান।

জাতীয় সড়কের ফাঁসে থমকে থাকার বাইরেও রয়েছে একটা অন্য পানাগড়। যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি মেখে রয়েছে সেনাছাউনি। রয়েছে সম্প্রীতির উত্‌সব, দানবাবার মেলা। আর রয়েছে গাড়ির যন্ত্রাংশের অন্যতম বড় বাজার, যেখানে নিত্যদিন হাজারো মানুষের আসা-যাওয়া।

Advertisement

পানাগড়বাসীদের নানা যন্ত্রণার পাশাপাশি গর্বের একটা বড় জায়গা এই গাড়ি-বাজার। একসময় পানাগড় সেনা ছাউনির পরিত্যক্ত গাড়ি নিলামে কিনে তার যন্ত্রাংশ ব্যবহারের উপযোগী করে বিক্রি করা হতো এই বাজারে। পরের দিকে অবশ্য শুধু সেনা ছাউনি নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিত্যক্ত ও পুরনো গাড়ি কিনে এনে তা কাজে লাগানো হয়। ভিন রাজ্য থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসায়ীরা এসেও যন্ত্রপাতি কিনে নিয়ে যান।

জাতীয় সড়ক থেকে সামান্য ভিতরে ঢুকতেই বাজার শুরু। শয়ে শয়ে দোকান, যার উপর ভরসা করে সংসার চলে প্রায় হাজার দশেক লোকের। এখানেই তিন দশক ধরে কাজ করছেন উত্তরপ্রদেশের সুলতানপুর থেকে আসা বিদ্যাপ্রসাদ সিংহ। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে বি-টেক পড়ছে। আর এক মেয়ে চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সিতে ভর্তি হয়েছে। স্মিত হেসে বৃদ্ধ বলেন, “এখন আমি পানাগড়ের স্থায়ী বাসিন্দা। নিজেই দোকান খুলেছি। দিল্লি, চেন্নাই থেকে পরিত্যক্ত গাড়ি কিনে নিয়ে আসি।” তাঁদের সংগঠন ‘পানাগড় ডিসপোজাল কাওয়ারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর সম্পাদক রামপ্রসাদ যাদবের দুই ছেলে এমবিএ পড়েছে। তিনিও বলেন, “উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ থেকে এসে কলকাতায় ফেরি করতাম। পরে এখানে কাজ শুরু করি। অনেক পরে দোকানের মালিক হই। আমাদের এ কাজের জন্য সারা দেশের গাড়ি বাজারে নাম রয়েছে পানাগড়ের।” তবে এত কিছুর মধ্যেও বঞ্চনার কষ্ট রয়েছে। ব্যববসায়ীদের আক্ষেপ, বিশাল বাজারের পরিকাঠামো উন্নয়নে পঞ্চায়েতের কোনও নজর নেই। তাঁদের কথায়, “রাস্তা ও নিকাশির হাল বেহাল। এত বড় বাজারের দিকে কারও কোনও নজরই নেই।”

Advertisement

এ তল্লাটের আর এক নজরকাড়া জায়গা সেনাবাহিনীর ছাউনি। এখানকার ভেহিক্যাল ডিপো এবং অ্যামুনিশন ডিপো দেশের মধ্যে সবথেকে বড়। রয়েছে বায়ুসেনার ছাউনিও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিদের বেকায়দায় ফেলতে পানাগড়ে বায়ুসেনা ছাউনি গড়ে তুলেছিল আমেরিকার সেনাবহিনী। সম্প্রতি উত্তর-পূর্বে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর চিনের সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে ইস্টার্ন কম্যান্ডের সবথেকে বড় সেনা ছাউনি পানাগড়ের গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে। সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গিয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধে পারদর্শী বিশেষ বিভাগ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই বিভাগের সদর দফতর গড়ে ওঠার কথা পানাগড়েই। অরুণাচল প্রদেশ- সহ দেশের উত্তর- পূর্বের রাজ্যগুলিতে কাজ করবে এই বাহিনী। দ্রুত তাঁদের এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য পানাগড়ে সুপার হারকিউলিস এয়ারক্রাফট মোতায়েন করা হবে। তাছাড়া মাঝ আকাশে যুদ্ধবিমানে জ্বালানি তেল ভরার বিশেষ বিমানও থাকবে পানাগড়ে। এখন সে সবের জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে যুদ্ধকালীন তত্‌পরতায়। ইতিমধ্যেই চালু হয়ে গিয়েছে সেনাবাহিনীর গবেষণা কেন্দ্র, ‘ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’। সেনাবাহিনীর এমন তত্‌পরতায় খুশি পানাগড়বাসী।

পানাগড়ের আর এক আকর্ষণ দানবাবার মেলা। ছ’দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দুর জমিতে এক মুসলমান ফকিরের মাজার ঘিরে বসছে এই মেলা। প্রবীণেরা জানিয়েছেন, বহু বছর আগে সৈয়দ শাহ পাহাড়ি নামে এক ফকির আস্তানা গেড়েছিলেন পানাগড়ে। ধনী ভক্তদের কাছ থেকে দক্ষিণা নিয়ে তা দুঃস্থদের বিলিয়ে দিতেন তিনি। সেই থেকেই দানবাবা নামে খ্যাতি ছড়ায় তাঁর। হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে বহু ভক্ত রয়েছে তাঁর এখনও। ১৯২০ সালে ওই ফকিরের মৃত্যুর পরে স্থানীয় জমিদার তথা পানাগড়ের বাসিন্দা দেবেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তিন বিঘা জমি দান করেন। সেই জমিতে গড়ে ওঠে দানবাবার মাজার। সারা বছর ধরেই ভক্তরা আসেন মাজার দর্শন করতে। মেলার সূচনা হয় ১৯৬০ সাল নাগাদ। প্রতি বছর বাংলা সনের ২৫ ফাল্গুন থেকে সপ্তাহখানেকের মেলা শুরু হয়। সন্ধ্যার দিকে মেলা জমে। জেলা ছাড়িয়ে ভিন জেলা থেকেও ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসেন দানবাবার মাজারে প্রার্থনা করতে। ফিরে যান পরের বছর ফের আসার মনোবাঞ্ছা জানিয়ে। মেলার আগত দর্শনার্থীরা দানবাবার মাজারে যা দান করেন মেলার শেষদিনে তা তুলে দেওয়া হয় দুঃস্থদের হাতে।

তবে পানাগড়বাসীর সবচেয়ে বড় আশা মাস ছয়েক আগে শুরু হওয়া বাইপাস নির্মাণের কাজ। জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ (এনএইচএআই) সূত্রে জানা গিয়েছে, ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ জেলার বারোয়াড্ডা থেকে বর্ধমান জেলার পানাগড় পর্যন্ত ১১৪ কিলোমিটার রাস্তা ৬ লেন করার কাজ চলছে। এর মধ্যেই পড়ছে প্রায় ৮ কিমি দীর্ঘ পানাগড় বাইপাস। বিরুডিহা থেকে ওই বাইপাস জাতীয় সড়ক থেকে বেরিয়ে গিয়ে কাঁকসা, সোঁয়াই, ধরলা, পন্ডালি পেরিয়ে ফের মিশবে পুরনো রাস্তায়। তাতে যানজট অনেকটাই কমবে বলে আশা পানাগড়বাসীর। এনআইচএআইয়ের এক আধিকারিক জানান, দুর্গাপুজোর আগে একদিক খুলে বাইপাস চালু করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাইপাস চালু হয়ে গেলে পানাগড় অনেকটাই জমজমাট হয়ে যাবে বলে বাসিন্দাদের আশা। আশায় রয়েছেন পানাগড় বাজারের ব্যবসায়ীরাও। কারণ, পানাগড়-মোরগ্রাম রাজ্য সড়কের সব গাড়ি আগের মতোই পানাগড় বাজারের ভিতর দিয়ে পুরনো জাতীয় সড়ক ধরে চলাচল করবে। ফলে একদিকে যেমন যানজটের সমস্যা মিটবে তেমনই ব্যবসায় লক্ষ্মীলাভের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement