Kolkata Book Fair

সাহিত্য জগতে ‘অস্পৃশ্যতা’র বিরুদ্ধে বার্তা, বইমেলায় ‘সম্পূর্ণ ভারতীয়ত্বের ছাপ’ চেয়ে বার্তা শমীকের, সভায় ত্রিদিব-সুধাংশু

রাজ্য বিজেপি সভাপতির কথায়, ‘‘বাংলার বইমেলা নিঃসন্দেহে সারা ভারতের মানুষের কাছে একটা নির্দিষ্ট আবেগ নিয়ে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে এই বইমেলা সংগঠন করতে গিয়ে কিছু ক্ষোভ মানুষের মধ্যে, প্রকাশকদের মধ্যে থাকে।’’

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ ২২:২৯
Share:

প্রয়াত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহের ৯০তম জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে সোমবার কলকাতার মহাজাতি সদনে স্মরণ অনুষ্ঠানে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। — নিজস্ব চিত্র।

কলকাতা বইমেলার নিয়ন্ত্রণ এ বার কাদের হাতে, তা নিয়ে গুঞ্জন বাড়ছিল। রাজ্যের নতুন শাসক দল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বইমেলার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবে কি না, তা নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে আলোচনা ক্রমশ বাড়ছিল। সোমবার সে বিষয়ে দলের অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। প্রকাশক, লেখকদের নিয়ে তৈরি নতুন সংগঠন ‘বঙ্গীয় গ্রন্থশিল্প পরিষদ’ (বিজিপি)-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে শাসক দলের রাজ্য সভাপতি বললেন, ‘‘আগামী বইমেলায় আমরা মানুষের সামনে নতুন ভাবে কিছু উপস্থাপিত করতে চাই।’’ কলকাতা বইমেলা যে সংগঠনের উদ্যোগে এত দিন আয়োজিত হত, সেই ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’-কে সরিয়ে দেওয়া হবে, এমন কোনও মন্তব্য শমীক করেননি। তবে গিল্ডের একাধিপত্যের দিন যে ফুরোতে চলেছে, শমীকের কথায় তার ইঙ্গিত মিলেছে।

Advertisement

প্রয়াত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহের ৯০তম জন্মবার্ষিকীকে সামনে রেখে সোমবার কলকাতার মহাজাতি সদনে একটি স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। আয়োজক ছিল প্রকাশক-লেখকদের নতুন সংগঠন বিজিপি। প্রধান বক্তা ছিলেন শমীক। বক্তা হিসাবে ছিলেন আরএসএসের পূর্ব ভারত ক্ষেত্রের সহ-প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসুও। স্বল্পকালীন প্রস্তুতিতে আয়োজিত হলেও সোমবার বিকেলে এই কর্মসূচি ঘিরে মহাজাতি সদনে প্রকাশক, লেখক, সাহিত্যানুরাগীদের জমায়েত ছিল উল্লেখযোগ্য। অনেককেই চমকে দিয়ে গিল্ডের দুই শীর্ষ পদাধিকারী সুধাংশুশেখর দে এবং ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় সেই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন। ত্রিদিব-সুধাংশুদের হাত থেকে কলকাতার প্রকাশন ব্যবসার রাশ এবং বইমেলার নিয়ন্ত্রণ যে সংগঠন নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে পারে বলে গুঞ্জন উঠেছিল, ত্রিদিবরা নিজেই সেই সংগঠনের সভায় হাজির হয়ে যাবেন, এমনটা অনেকে আশা করেননি। তবে গিল্ড কর্তাদের সাক্ষী রেখেই শমীক বুঝিয়ে দেন যে, বইমেলার আয়োজন এবং উপস্থাপনা এখন থেকে আর আগেকার মতো হবে না। বিজেপি বা বিজেপি-ঘনিষ্ঠ কোনও সংগঠন বইমেলার সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবে, এমন সম্ভাবনা নেই বলে শমীক বুঝিয়ে দেন। কিন্তু গিল্ডকে ‘মিলেমিশে আয়োজন’ করতে হবে বলে শমীক বার্তা দিয়েছেন।

রাজ্য বিজেপি সভাপতির কথায়, ‘‘বাংলার বইমেলা নিঃসন্দেহে সারা ভারতের মানুষের কাছে একটা নির্দিষ্ট আবেগ নিয়ে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে এই বইমেলা সংগঠন করতে গিয়ে কিছু ক্ষোভ মানুষের মধ্যে, প্রকাশকদের মধ্যে থাকে। জায়গা না-পাওয়ার জন্য কিছু মানুষ প্রতিবাদ করেন, সমালোচনা করেন।’’ এই ধরনের ক্ষোভকে তিনি খুব বড় বিষয় হিসাবে যে দেখছেন না, তা বোঝাতে শমীক বলেন, ‘‘যে কোনও কাজ সংগঠিত ভাবে করতে গেলেই সেখানে কোনও সমস্যা থাকবে, বিচ্যুতি থাকবে। সম্পূর্ণ বিচ্যুতি মুক্ত ভাবে কোনও কিছুর সংগঠন সম্ভব নয়। এটা কাঙ্ক্ষিত নয়, কিন্তু এটা হয়ে থাকে।’’ কিন্তু গিল্ড-এর একাধিপত্য যে থাকবে না, সে কথাও শমীক বুঝিয়ে দিয়েছেন সোমবার। বলেছেন, ‘‘আমরা এখানে বইমেলা বা প্রকাশকদের উপরে কোনও কিছু চাপিয়ে দিতে আজকের সভায় আসিনি। আমরা চাই, বইমেলাই হোক বা প্রকাশকই হোন, সবাই মিলেমিশে আমরা নতুন ভাবে কিছু মানুষের সামনে উপস্থাপিত করব।’’ রাজ্য বিজেপি সভাপতির কথায়, ‘‘সাহিত্য জগতে দীর্ঘ দিন একটা অস্পৃশ্যতা কাজ করেছে। মত প্রকাশের অধিকার তো সকলের আছে। আমরা চাই, আগামী দিনে যে বইমেলাটা হবে, সে বইমেলায় যেন সম্পূর্ণ একটা ভারতীয়ত্বের ছাপ থাকে।’’

Advertisement

বাম জমানায় বা তৃণমূল আমলে বইমেলা যে ভাবে চলত, তাতে সব রকমের মতামতের জন্য স্থান ছিল না বলে একাধিক বার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন শমীক। এখন বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে সেই একই ‘অস্পৃশ্যতা’ বহাল থাক, তা তিনি চান না বলে শমীক জানান। তাঁর কথায়, ‘‘রাজনৈতিক ভাবে সম্পূর্ণ একাধিপত‍্য প্রতিষ্ঠা করার জায়গা বইমেলা নয়।’’

বিজিপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারও শমীকের সুরেই কথা বলেছেন। বইমেলার নিয়ন্ত্রণ যে তাঁদের সংগঠন হাতে নিতে চায়, তেমন মন্তব্য দেবজিতের মুখ থেকেও শোনা যায়নি। কিন্তু এ বারের বইমেলার আয়োজন যে তাঁদের ‘মনের মতো’ই হতে হবে, সে কথা দেবজিৎ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘মুক্ত জায়গা ছাড়া লেখা, নাটক হয় না। তার শুরু আমরা দেখতে চাই।’’ সংগঠনের আর এক শীর্ষ পদাধিকারী তথা রাজ্য বিজেপির সমাজমাধ্যম বিভাগের প্রধান সপ্তর্ষি চৌধুরী অবশ্য স্পষ্ট মন্তব্য এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। শমীকের ভাষণে যে সব ইঙ্গিত মিলেছে, সে বিষয়ে সপ্তর্ষি বলেন, ‘‘বিজেপির রাজ্য সভাপতি যা বলে গিয়েছেন, তা স্পষ্ট ভাবেই বলে গিয়েছেন। তা নিয়ে আমার মন্তব্য করার কিছু নেই।’’ কিন্তু বিজেপির রাজ্য সভাপতির মন্তব্যেই বইমেলার আয়োজন ও উপস্থাপনায় ‘নতুন কিছু’ করার বার্তা রয়েছে। তার অর্থ কী? লেখক-প্রকাশকদের নতুন সংগঠন বিজিপি কি তা হলে এ বার বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব নেবে? সপ্তর্ষি সে সম্ভাবনা নস্যাৎ করেননি। আবার তেমন ভাবনার কথা স্বীকারও করেননি। বলেছেন, ‘‘সময় বলবে।’’

গিল্ডের তরফ থেকে সুধাংশশেখরও সোমবার বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, বইমেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে বিজিপি-কে সঙ্গে নিতে তাঁদের আপত্তি নেই। শমীকের ভাষণ শেষ হওয়ার পরে মহাজাতি সদন থেকে বেরিয়ে সুধাংশু বলেন, ‘‘গিল্ডই তো এতদিন বইমেলা করেছে। আমরা অন্যদেরও সঙ্গে নিয়েছি। একটা সময়ে ন’টি সংগঠন ছিল বইমেলার সঙ্গে। এখন আরও চারটি যুক্ত হল। এ বার মোট ১৩ টি সংগঠন যুক্ত থাকবে।’’ সুধাংশুর কথায়, ‘‘নতুন কেউ যুক্ত হতে চাইলে অসুবিধা নেই। আমরা চাই আরও ভাল ভাবে বইমেলা হোক। নতুন কেউ সঙ্গে এলে যদি আরও ভাল ভাবে হয়, আমাদের কোনও আপত্তি নেই।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement