গুজরাতের সুরতে বাঙালি-জনসংযোগ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের। ছবি: সংগৃহীত।
কেউ পেয়েছেন ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ তকমা। কারও নাম ‘কর্মসূত্রে প্রবাসী’। আসলে উভয়েই জীবিকার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্যান্য রাজ্যে। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে বাঙালি সমাজের এই শ্রেণিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চাইছে বিজেপি। প্রবাসী বা পরিযায়ীদের সিংহভাগকে ভোটের সময়ে পশ্চিমবঙ্গে ফেরানো গেলেই হিসাব বদলে যাবে বলে বিজেপির অভিমত। সেই কাজেই একের পর এক রাজ্যে ছুট শুরু করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির নেতারা। ভিন্রাজ্যবাসী বাঙালিদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে তাঁদের ভোট-সফর নিশ্চিত করার চেষ্টা শুরু করেছেন তাঁরা।
অর্থাৎ, বিহারে আরজেডি বা পঞ্জাবে আম আদমি পার্টির (আপ) দেখানো পথেই হাঁটছে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। কলকাতা এবং শহরতলিতে বসবাসকারী বিহারিদের অনেকে এখনও বিহারের ভোটার। প্রত্যেক ভোটের আগে লালুপ্রসাদের আরজেডি গ্রামের মুখিয়াদের মাধ্যমে এই প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। প্রয়োজনে যাতায়াতের খরচ জুগিয়ে তাঁদের বিহারের ভোটে ফেরাত। পঞ্জাবে আপ এই কৌশলে আরও এককাঠি উপরে। ২০১৭-র বিধানসভা নির্বাচনে কানাডায় বসবাসকারী বিরাট পঞ্জাবি জনসংখ্যাকে দেশে তথা স্বরাজ্যে ফিরিয়েছিলেন অরবিন্দ কেজরীওয়াল, ভগবন্ত মানেরা। তাঁদের সকলে পঞ্জাবের ভোটার ছিলেন না। কিন্তু যাঁরা ভোটার নন, যাঁরা কানাডার নাগরিক হয়ে গিয়েছেন, তাঁরাও দলে দলে পঞ্জাবে ফিরে নিজেদের আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যে আপের হয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। অনেকে বিপুল খরচও করেছিলেন। সে বছর পঞ্জাবে অবশ্য আপ জিততে পারেনি। কিন্তু একই ধারা বহাল রেখে ২০২২ সালে আপ পঞ্জাবে সরকার গড়ে ফেলে।
অন্যান্য রাজ্যের বিভিন্ন শহরে গিয়ে স্থানীয় বাঙালি সমাজের সঙ্গে বৈঠক করছেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সাংসদ ও নেতারা। ওই সব শহরে বসবাসকারী পরিযায়ী বা প্রবাসী বাঙালিরা যাতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে ভোটে অংশ নেন, মূলত সেই আর্জিই জানানো হচ্ছে। যাঁদের পক্ষে যাতায়াতের খরচ বহন করা কঠিন, তাঁদের জন্য সেই খরচও বিজেপি বহন করবে বলে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। এমনকি, গুজরাত, কর্নাটক, কেরল বা তামিলনাড়ুর মতো দূরবর্তী রাজ্যগুলি থেকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে ভোট দিয়ে ফের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার জন্য যে ক’দিন ছুটি দরকার হবে, সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কথা বলে সেই ক’দিনের সবেতন ছুটির বন্দোবস্ত করতেও বিজেপি সক্রিয় হচ্ছে।
গুজরাতের সুরতে প্রবাসী বাঙালিদের উদ্যোগে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে তৈরি কালীবাড়িতে স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে শমীক ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া বিজেপি নেতারা একাই সব করে ফেলছেন, এমন নয়। তাঁরা দুর্গাপুজোর সময়ে ‘প্রবাসী বাঙালি মিলন’ ধাঁচের কর্মসূচিগুলি যে সব সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে করেছিলেন, সেই সব সংগঠনের মাধ্যমেই আবার প্রবাসী বাঙালিদের বৈঠকে ডাকছেন। ‘পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা’ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। বাকি দায়িত্ব নিচ্ছে স্থানীয় বিজেপি। সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা শহরগুলিতে বসবাসকারী বাঙালিদের ঘরে ঘরে পৌঁছোনো, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির বার্তা তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজনে তাঁদের কর্মস্থলের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ছুটির বন্দোবস্ত করা— সব দায়িত্ব বর্তাচ্ছে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির বিজেপি নেতৃত্বের উপরে।
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য মঙ্গলবার দু’দিনের সফরে পৌঁছেছেন নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য গুজরাতে। সে রাজ্যের সুরতে আড়াই লক্ষ বাঙালির বাস বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। সুরতে কর্মরত বাঙালিদের অধিকাংশই হিরে, সোনা এবং জরির কাজ করেন। ভোটের সময়ে তাঁরা যাতে পশ্চিমবঙ্গে নিজের নিজের গ্রামে বা শহরে ফেরেন, বিজেপির তরফে সেই আর্জি জানানো হচ্ছে। বুধবার সুরতে দিনভর বৈঠক সেরে শমীক বললেন, ‘‘এখানে ১৫টা দুর্গাপুজো কমিটি রয়েছে। প্রত্যেকটি কমিটির প্রতিনিধি আমার বৈঠকে ছিলেন। এ ছাড়া বাঙালিদের অন্যান্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনও এসেছিল। সব মিলিয়ে ২৫টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা ছিলেন।’’ শমীক বিশেষ ভাবে উল্লেখ করলেন, ‘‘সুরতে এসে হিন্দু-মুসলিম সকলের সঙ্গে বৈঠক করলাম। সকলে একবাক্যে বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা লজ্জায় রয়েছেন এবং বদল চাইছেন।’’
রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের আবার বক্তব্য, ‘‘আমরা শুধু পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে যাচ্ছি না। আমরা অন্যান্য রাজ্যে বসবাসকারী বৃহত্তর বাঙালি সমাজের কাছে যাচ্ছি। বৃহত্তর পরিভাষায় প্রবাসী বলতে পারেন।’’ সুকান্ত বলছেন, ‘‘যাঁদের সঙ্গে আমরা দেখা করছি, তাঁদের অধিকাংশের ভোটই হয়তো পশ্চিমবঙ্গে। তবে যাঁরা এখন আর পশ্চিমবঙ্গের ভোটার নন, তাঁদেরও আমরা সক্রিয় হতে বলছি।’’
যাঁরা পশ্চিমবঙ্গের ভোটার নন, তাঁরা কী ভাবে পশ্চিমবঙ্গের ভোটে সক্রিয় হবেন? রাজ্য বিজেপির দুই সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতো বলছেন, ‘‘প্রবাসীদের আত্মীয় বা পরিচিতেরা পশ্চিমবঙ্গে রয়েছেন। তাঁদের কাছে এঁরা আবেদন জানাবেন। অন্যান্য রাজ্য কতটা উন্নয়ন দেখছে আর পশ্চিমবঙ্গ কোথায় পড়ে রয়েছে, সে ছবি তাঁরা নিজেদের পরিচিত বৃত্তকে বুঝিয়ে বলবেন।’’
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তরফে এ বার লকেট যাচ্ছেন উত্তরাখন্ডের দেহরাদূন এবং হরিদ্বার। পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় যাচ্ছেন নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র লাগোয়া ঝাড়খন্ডের বোকারোয়। উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউ এবং গোয়ায় ইতিমধ্যেই বাঙালি-জনসংযোগ সেরে এসেছেন রানাঘাটের সাংসদ জগন্নাথ সরকার। রায়গঞ্জের সাংসদ কার্তিক পাল ঘুরে এসেছেন বিহারের রাজধানী পটনা। রথীন্দ্রনাথ বসু ঘুরে এসেছেন মহারাষ্ট্রের পুণে থেকে। আরও অনেকে আগামী কয়েক সপ্তাহে ভিন্রাজ্যে গিয়ে বাঙালি জনসংযোগ সারবেন।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তৈরি ‘পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড’-এর প্রধান তথা তৃণমূল সাংসদ সামিরুল ইসলাম জানাচ্ছেন, অন্যান্য রাজ্যে কর্মরত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা এই মুহূর্তে ৩০ লক্ষের বেশি। কিন্তু সুকান্তের দাবি, ‘‘কর্মসূত্রে ভিন্রাজ্যে যাওয়া বাঙালির সংখ্যা অন্তত ৭০ লক্ষ। কারণ, রাজ্য সরকারের বোর্ড শুধু গায়েগতরে খাটা শ্রমিকদের হিসাব দিচ্ছে। তাঁদের বাইরেও আরও অনেকে ভিন্রাজ্যে থাকছেন, যাঁরা অপেক্ষাকৃত উচ্চ উপার্জনের বৌদ্ধিক পেশায় রয়েছেন।’’ রাজ্য সরকারের দেওয়া হিসাবের চেয়ে সংখ্যাটা অনেক বেশি বলে শমীকেরও দাবি। তাঁর কথায়, ‘‘শুধু বেঙ্গালুরুতেই ১৫ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে কাজ করছেন। সুরতে আড়াই লক্ষ। সকলকে পরিবর্তনে শামিল করব।’’