BJP

বাংলা মডেল কি সংসদেও

রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর এক মাসের মধ্যেই আড়াআড়ি বিভাজন ঘটে গিয়েছে তৃণমূল শিবিরে। বিরোধী দলনেতা হয়েছেন তৃণমূলের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দিন কয়েক আগেই যাঁকে বহিষ্কার করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ সেই ঋতব্রতকে তৃণমূলের আশি জন বিধায়কের মধ্যে অন্তত ষাট জন বিরোধী দলনেতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ০৮:৩০
Share:

— প্রতীকী চিত্র।

বিজেপির গুজরাত মডেলের সাক্ষী থেকেছে দেশ। সরকার গড়তে বিজেপির মহারাষ্ট্র মডেলও দেখেছেন দেশবাসী। এ বার সামনে এল বিজেপির ‘বেঙ্গল মডেল’। যে মডেলের সারসত্য হল, ‘সরকার আমার, বিরোধীরাও আমার’। অন্তত এই মর্মেই বিষয়টিকে কটাক্ষ করছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। আজ তৃণমূলের বিধায়ক দলে ভাঙনের পরে সংসদীয় দল ভাঙতে অপারেশনের দ্বিতীয় পর্ব কবে থেকে শুরু হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা তৈরি হয়েছে বঙ্গ রাজনীতিতে।

রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর এক মাসের মধ্যেই আড়াআড়ি বিভাজন ঘটে গিয়েছে তৃণমূল শিবিরে। বিরোধী দলনেতা হয়েছেন তৃণমূলের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দিন কয়েক আগেই যাঁকে বহিষ্কার করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ সেই ঋতব্রতকে তৃণমূলের আশি জন বিধায়কের মধ্যে অন্তত ষাট জন বিরোধী দলনেতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন। ঋতব্রত আজ মমতাকে দলের পরামর্শদাতা হওয়ার জন্য আবেদন জানালেও, একটি বিষয় স্পষ্ট— তৃণমূলের পরিষদীয় দলের রাশ আর মমতার হাতে নেই। তা চলে গিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে।

আজ বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত ‘দায়িত্বশীল, সদর্থক বিরোধীর ভূমিকা পালন করে চলব’ বলে দাবি করলেও, বিজেপি-বিরোধী শিবিরের বক্তব্য— তৃণমূলের এই ভাঙনে বিজেপির সরাসরি ভূমিকা না থাকলেও পিছনে অবশ্যই প্রচ্ছন্ন ভাবে বিজেপির ইন্ধন রয়েছে। রাজনীতিকদের মতে, গোটাটাই শাসক দলের মদতে হলেও কেউ যাতে আঙুল তুলতে না পারেন, সে জন্য বিষয়টির সঙ্গে আগাগোড়া দূরত্ব বজায় রেখেছেন বিজেপি নেতৃত্ব। গোড়ায় ‘ভাল তৃণমূলের’ হয়ে সওয়াল করলেও গত কালই রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দিল্লিতে জানান, ‘‘তৃণমূলের নেতা-নেত্রীদের দলে নেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই।’’ বিদ্রোহী বিধায়কদের দলে নেওয়া বা সমর্থন নেওয়ার প্রশ্নে তিনি জানান, ‘‘রাজ্যে বিজেপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।’’ বার্তা স্পষ্ট, বিজেপি বোঝাতে চেয়েছে, তৃণমূলে যে ভাঙন ধরেছে, তা তাদের দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এর সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই। যদিও কংগ্রেস নেতৃত্বের মতে, পিছনে সমর্থন না থাকলে ঋতব্রতের পক্ষে এই ‘বিদ্রোহ’ করা সম্ভব হত না বা তিনি পাশে ষাট জন বিধায়কও পেতেন না। না। তাঁকে কারা যে পিছন থেকে অক্সিজেন জোগান দিচ্ছেন, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট বলেই কংগ্রেসের মত।

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে প্রথম দিল্লি সফরে বঙ্গভবনে ঋতব্রতের সঙ্গে দেখা হয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। অনেকের মতে, তৃণমূলের ভাঙনের সূত্রপাত হয় সেখান থেকেই।

রাজনীতিকদের মতে, ঋতব্রতদের বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া থেকে স্পষ্ট, আগামী দিনে রাজ্যে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে লোকদেখানো বিরোধিতা হলেও মূলত শাসক শিবিরের অঙ্গুলিহেলনেই চলবেন বিরোধীরা। যাকে বিজেপির ‘বেঙ্গল মডেল’ বলে কটাক্ষ করছেন ‘ইন্ডিয়া’ নেতৃত্ব। তাঁদের কথায়, ‘‘মহারাষ্ট্রে সরকার গড়ার সমর্থন জোগাড় করতে গিয়ে এনসিপি ও শিবসেনায় ভাঙন ধরিয়েছিল বিজেপি। এ ক্ষেত্রে সরকার গড়তে সমর্থনের প্রয়োজন নেই। তাই বিরোধীদের একেবারে পাশে টেনে নেওয়া হয়েছে। এই মডেলের বিশেষত্ব হল, সরকার-বিরোধী উভয়েই আমার।’’

অতীতে অসমে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, বিরোধীদের মধ্যেও তাঁর লোক রয়েছে। কিন্তু গোটা বিরোধী পক্ষই শাসক শিবিরের পাশে রয়েছে, তা জাতীয় রাজনীতিতে সম্ভবত এই প্রথম। একই সঙ্গে এই ভাঙন ধরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গোষ্ঠীকেও রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল করে দিতে সক্ষম হল বিজেপি। আগামী দিনে যাতে তিনি বিরোধী নেত্রী হিসেবে সরকারের অস্বস্তির কারণ না হয়ে উঠতে পারেন, তার জন্যই এই কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে।

এ দিকে, অপারেশন বিধানসভার পরে দ্বিতীয় পর্ব, অর্থাৎ অপারেশন লোকসভা কবে থেকে চালু হবে তা নিয়ে আজ থেকেই জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তৃণমূলের লোকসভা সাংসদদের একটি অংশ ইতিমধ্যেই পা বাড়িয়ে রেখেছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের স্পষ্ট বার্তা হল, ২৭ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ অর্থাৎ ১৮ জন একসঙ্গে দলত্যাগ করলেই তবেই তাঁদের নেওয়ার কথা ভাবা হবে। মূলত দলত্যাগ-বিরোধী আইন এড়াতেই ওই সিদ্ধান্ত। এক দেশ এক ভোট, মহিলা সংরক্ষণের নামে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে বিজেপির ৩৬২ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন। এনডিএ-র কাছে তার থেকে ৭০ জন সাংসদ কম রয়েছে। এই আবহে ডিএমকে-র ২২ জন এব‌ং তৃণমূলের অন্তত ১৮ জন যদি শাসক শিবিরের সমর্থনে এগিয়ে আসেন, ওই ব্যবধান অনেকটাই কমে আসবে।

বিজেপির দিকে পা বাড়ালেও, তৃণমূলের বিদ্রোহী ওই সাংসদেরা অবশ্য মেপে পা ফেলার পক্ষপাতী, যাতে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের ফাঁদে সাংসদ পদ খোয়াতে না হয়। ওই সাংসদেরা ইতিমধ্যেই বিজেপিকে বার্তা দিয়েছেন যে, দল বদল না করলেও, প্রয়োজনে তৃণমূলে থেকেই দলের সমালোচনা করবেন তাঁরা। দলনেতা অভিষেক তো বটেই, মমতারও নির্দেশ মানবেন না তাঁরা। বিধানসভায় তৃণমূলকে ভাঙার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন ঋতব্রত। এ ক্ষেত্রে ভোটের পর থেকেই তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরব রয়েছেন তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। লোকসভায় দলভাঙাতে আস্তিনের তাস হিসেবে কাকলিকে ব্যবহার করা হয় কি না, তা-ই এখন দেখার।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন