মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
জাতীয় ভোটার দিবসে আরও এক বার নির্বাচন কমিশনকে একহাত নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বললেন, এই দিন উদযাপনের অধিকার নেই কমিশনের। বিষয়টিকে ‘প্রহসন’ মনে হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অঙ্গুলিহেলনেই তারা চলছে বলেও জানিয়েছেন মমতা। অন্য দিকে, রবিবার এই জাতীয় ভোটার দিবস পালনের কর্মসূচিতেই রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল-সহ বিজেপি বিরোধী অন্য দলগুলির একের পর এক প্রশ্নের মুখে পড়ল নির্বাচন কমিশন। বুথ স্তরের আধিকারিক (বিএলও)-দের মৃত্যু নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ল তারা। এই কর্মসূচিতে বিএলওদের মৃত্যুর প্রসঙ্গ কেন উঠল না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)র দফতর জানিয়েছে, এই বিষয়ে তাদের কাছে রিপোর্ট আসেনি। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে কিছু বলতে চাননি রাজ্যের সিইও মনোজ আগরওয়াল।
রবিবার জাতীয় ভোটার দিবস। এই দিনে নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কমিশনের প্রতিষ্ঠা দিবসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট দিয়ে লেখেন, ‘ভারতের নির্বাচন কমিশন আজ জাতীয় ভোটার দিবস পালন করছে এবং সেটিকে একটি করুণ প্রহসনের মতো দেখাচ্ছে।’ এর পরেই মমতা কটাক্ষ করে জানান, কেন্দ্রীয় সরকারের কথাতেই চলছে কমিশন। তিনি লেখেন, ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস হিসাবে কমিশন এই মুহূর্তে মানুষের ভোটাধিকার লুণ্ঠন করতে ব্যস্ত। তাদের ঔদ্ধত্য হচ্ছে জাতীয় ভোটার দিবস পালন করার— আমি এতে স্তম্ভিত, বিস্মিত, বিচলিত।’
জাতীয় ভোটার দিবস কর্মসূচি পালনের সময় এসআইআর নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে কমিশনও। ভোটার দিবস পালনের বক্তৃতায় এসআইআরে বিএলওদের ভূমিকার প্রশংসা করেন অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দিব্যেন্দু দাস। তাঁর কথায়, এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন বিএলওরা। তাঁরাই আসল ‘হিরো’।
ওই আধিকারিকের বক্তৃতার মাঝে সিপিএমের প্রতিনিধি বলেন, ‘‘সংবাদমাধ্যমে ১২৬ জন বিএলওর মৃত্যুর খবর আমরা দেখেছি। তাঁদের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করে নীরবতা পালন করা গেল না? তাঁকে সমর্থন জানান তৃণমূল এবং কংগ্রেসের প্রতিনিধিরাও।’’ এই অবস্থায় পরিস্থিতি সামলাতে হাতে মাইক তুলে নেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজকুমার আগরওয়াল। তিনি বলেন, ‘‘বিএলওদের মৃত্যু নিয়ে আমরা রিপোর্ট চেয়েছিলাম। কোনও রিপোর্ট আসেনি। এমনকি, ময়নাতদন্তের রিপোর্টও পাঠানো হয়নি। সরকারি ভাবে জেলাশাসক এবং পুলিশের এই রিপোর্ট দেওয়ার কাজ। এই বিষয়ে কমিশনকেও বলা রয়েছে। আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। এটা তো আমরা করতে পারি না। আমাদের কোনও ফান্ড নেই।’’
তৃণমূল এবং কংগ্রেসের প্রতিনিধি পাল্টা বলেন, ‘‘ক্ষতিপূরণের কথা বাদ দিন। কাজ করতে গিয়ে তাঁরা মারা গিয়েছেন। তাঁদের জন্য কি একফোটা চোখের জল ফেলা যেত না? রিপোর্ট আসেনি বলে কি মৃত্যুকে অস্বীকার করা যায়?’’ উত্তরে সিইও বলেন, ‘‘ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নয়, আমাদের রেকর্ডেও রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যজুড়ে ৯২ হাজার বিএলও রয়েছেন। তাঁদের কিছু হলে আমাদের জানা দরকার। কিন্তু কেউ না জানালে জানব কী করে?’’ এর পরেই তিনি বিএলওদের মৃত্যুর তথ্য দিতে বলেন। তাঁর কথায়, ‘‘শুধু এসআইআর নয়, নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বিএলওরা। আপনারা আমাদের যোদ্ধা। কোনও বিএলওর মৃত্যু হলে এখান থেকে তাঁদের পরিবারকে বলছি, মৃত্যুর তথ্য ডিইওর কাছে জানান। ডিইও আমাদের সেই তালিকা পাঠাবেন।’’ এই নিয়ে বিজেপি নেতা তাপস রায় জানান, জেলাশাসক যদি বিএলওর মৃত্যু নিয়ে রিপোর্ট না দেন, তা হলে এই ধরনের প্রশ্ন তুলে লাভ নেই।
কমিশনের কর্মসূচিতে তৃণমূল প্রশ্ন তোলে, আর কত নাম বাদ দেবে কমিশন। খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৫৮ লক্ষের বেশি নাম বাদ গিয়েছে। তাঁর মধ্যে বেশির ভাগ মৃত ভোটার। তখনই তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি জানান, দেড় কোটি নাম বাদ যাবে বলা হচ্ছে। আর কোনও ভোটারের নাম বাদ যাবে না তো?
সিইও জানান, বাইরে এসব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। কমিশন কোথাও জানায়নি দু’কোটি নাম বাদ যাবে। ৫৮ লক্ষ নাম কমিশন সব রাজনৈতিক দলের থেকে নিশ্চিত করেই বাদ দিয়েছে। প্রতিটি বুথে নাম বাদ দেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলের বুথ লেভেল এজেন্টদের সঙ্গে মিটিং করেছেন বিএলও-রা। এমন উদ্যোগ প্রথম বার নেওয়া হয়েছে। সেখানে সবাই একমত হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৫৮ লক্ষের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০-১২টি অভিযোগ জমা হয়েছে। তা ছাড়া এটি খসড়া তালিকা, চূড়ান্ত নয়। তাই এখানে কোনও ভুল থাকলে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। সিনিয়র আধিকারিক দিয়ে সেগুলি যাচাই করা হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি নিয়ে মানুষকে শুনানিতে ডেকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। অতিরিক্ত সিইও দিব্যেন্দু দাস বলেন, ‘‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি আমরা তথ্য পরীক্ষা করছি। দু’টি তথ্যের কথা বলব। এক নামের ব্যক্তিকে ৩৫০ জনের বেশি ভোটার নিজের বাবা হিসাবে দেখিয়েছেন। আমরা এটাকে অবাস্তব বলছি না। আমরা শুধু পরীক্ষা করে দেখে নিচ্ছি।’’ তার পরেই সিইও জানান, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে নির্বাচন ঘোষণা হবে। উৎসবের মেজাজে ভোট হবে। সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ ভোট হবে।
এই এসআইআরের তথ্যগত অসঙ্গতি (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) নিয়ে নিজের পোস্টে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রীও। সেই নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথাও স্মরণ করিয়েছেন তিনি। মমতা লেখেন, ‘মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পালন করার পরিবর্তে এবং বিধি-নিয়ম অনুসারে মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশন এখন লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির নামে নতুন নতুন অজুহাত তৈরি করে চলেছে। মানুষকে অত্যাচার করা হচ্ছে, তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে! তাদের প্রভু বিজেপি-র হয়ে তারা বিরোধীদের ধ্বংস করতে চায় এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে আঘাত করতে চায়।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও লেখেন, ‘এদেরই আবার সাহস হচ্ছে ভোটার দিবস উদযাপন করার!’
বিএলও মৃত্যুর প্রসঙ্গ নিয়েও মমতা আঙুল তুলেছেন কমিশনের দিকে। তিনি লেখেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে বলি, আপনারা মানুষকে অভূতপূর্ব অত্যাচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন, আপনাদের অত্যাচারের ফলেই এখনও পর্যন্ত ১৩০ জনের বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। আপনারা যে ভাবে ৮৫, ৯০, ৯৫ বছরের মানুষকে ডেকে পাঠাচ্ছেন এবং শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী মানুষকেও আপনাদের সামনে হাজির হতে বাধ্য করছেন, তা করার অধিকার কি আপনাদের রয়েছে? এই বেআইনি চাপ ও নিগ্রহের ফলেই আত্মহত্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।’’ তিনি এ-ও জানান, কমিশন এটা করছে তাদের ‘রাজনৈতিক প্রভুর নির্দেশে ও স্বার্থে’।
এসআইআরকে কমিশন জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) করে তুলেছেন বলেও লিখেছেন মমতা। তিনি লেখেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষের জন্য এটা বিশেষ পীড়ার কারণ হয়েছে।’ কমিশনে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে অভিযোগ তুলেছেন মমতা। তিনি লেখেন, ‘আপনাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং একতরফা বেআইনি কান্ডকারখানা, মাইক্রো অবজারভারদের দলে দলে পাঠিয়ে সেই নিগ্রহ বৃদ্ধি এবং মানুষকে দলে দলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া পরিণতিতে আমাদের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। ভোটার দিবস পালনের কোনও অধিকার আপনাদের আজ নেই।’
এই প্রসঙ্গে সিইও মনোজ বলেন, ‘‘মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কোনও মন্তব্য নিয়ে কিছু বলব না। উনি নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেছেন।’’ কুমারগঞ্জের ঘটনায় জেলাশাসকের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে কমিশন। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জ বিডিও অফিসে চলছিল এসআইআর শুনানির কাজ। সেখানে মাইক্রো অবজার্ভারকে এক ভোটার কষিয়ে থাপ্পড় মারেন বলে অভিযোগ। সেই নিয়েই রিপোর্ট চেয়েছে কমিশন।