WB Assembly Elections 2026

দারিদ্রের চা-বাগানে পাচারের মহোৎসব

দারিদ্রে অভ্যাস করে নেওয়া পরিবারগুলো আবার নতুন করে ভাবা শুরু করে! তারই মধ্যে মোবাইলে চলে আসে ‘অফার লেটার’।

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩১
Share:

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ফোন আসত মেয়েদের মোবাইলে। এক ‘জয়শ্রী ম্যাম’-এর ফোন। ভিন্‌ রাজ্যে কাজের সুযোগ। ভাল মাইনে। ঝাঁ চকচকে থাকার জায়গা। ‘‘জীবনটাই বদলে যাবে তোমাদের। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারবে।’’ শুরু হয় স্বপ্ন দেখা।

এর একটা পূর্ব অধ্যায়ও আছে। যেখানে এলাকারই একজন বাড়িতে আনে এক মহিলা ও এক পুরুষকে। বেছে বেছে সবচেয়ে গরিব পরিবার এবং যে সব পরিবারে অল্প বয়সি মেয়েরা আছে, সেখানেই তাদের আনাগোনা। ‘‘অন্য রাজ্যের বড় একটি সংস্থা প্রচুর নিয়োগ করছে। চাইলে মেয়েদের পাঠাতে পারেন।’’

দারিদ্রে অভ্যাস করে নেওয়া পরিবারগুলো আবার নতুন করে ভাবা শুরু করে! তারই মধ্যে মোবাইলে চলে আসে ‘অফার লেটার’। মেয়েরা কিছু ভেবে ওঠার আগেই ফের ফোন করেন জয়শ্রী ম্যাম। চলে কথোপকথন। ম্যাম বলেন, আদালতে গিয়ে এফিডেভিট-এর ব্যবস্থা করতে হবে বাড়ির লোককে। তাতে লেখা থাকবে, তাঁরা স্বেচ্ছায় মেয়েকে পাঠাচ্ছেন। এটাই ‘কোম্পানির নিয়ম’। সেই এফিডেভিটের ‘অরিজিনাল কপি’ পাঠালেই কোম্পানি ট্রেনের টিকিট কাটবে। এসি কামরা। মেয়েরা যাতে আরাম করে যেতে পারে! ‘‘কোম্পানি মেয়েদের সব দিকে খেয়াল রাখে।’’ ঠিক জায়গায় পৌঁছলে শুরু হবে ‘ট্রেনিং’।

মেয়েরা রাজি হয়। এক জন-দু’জন নয়, এক সঙ্গে ৩৪ জন। নির্দিষ্ট দিনে রওনাও হয় তারা। কিন্তু যাওয়ার পথে এত বার থমকানো কেন? প্রথমে ট্রেন, তার পর বাস। তার পর আবার অপেক্ষা। আরও একদল মেয়ে নাকি আসবে ওই একই কাজের জন্য। তা হলে কি কাজটা ছল? কোনও বিপদ ঘটতে চলেছে কি? একজন ফোন করে চাইল্ডলাইনে। সেই সূত্র ধরেই পুলিশ উদ্ধার করে এই মেয়েদের। গ্রেফতার হয় ম্যাম, স্যর-সহ আরও কয়েক জন। মাত্র মাস কয়েক আগের কথা।ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নামী ওয়েব সিরিজকেও হার মানিয়ে দেবে এই সত্যি জীবনের আখ্যান। জলপাইগুড়ির মালবাজারের একটি ঘরে বসে ওই মেয়েদের মধ্যেই কয়েক জন শোনাচ্ছিল তাদের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতেও কোনও ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। কিন্তু সেই গল্পের ক্লাইম্যাক্স শোনা তখনও বাকি। ওই মেয়েদেরই একজন তার মোবাইল থেকে পাঠায় ‘ম্যাম’-এর ভয়েস ক্লিপ। জামিনে ছাড়া পেয়েই ম্যাম আবার যোগাযোগ করেছে। বলেছে, তারা যেন ভুল না করে। ‘‘কাজের সুযোগ কিন্তু এখনও আছে।’’

প্রশ্ন করি, পুলিশকে জানিয়েছিলে? সে হাসে। ‘‘সবটা জানে পুলিশ।’’

ঘরে ঘরে তীব্র অভাব। আর সেই সুযোগেই সেখানকার শিশু, কিশোর-কিশোরীদের পাচার করে দেওয়া হয় ভিন্ রাজ্যে। কখনও কার্যত ক্রীতদাস হিসেবে ভিন্ রাজ্যে কোনও বাড়িতে কাজের জন্য বিক্রি করে দেওয়া হয়। আবার কখনও তারা চালান হয় যৌনপল্লিতে। কখনও খবর পেয়ে তাদের উদ্ধার করে আনা হয়। কখনও তারা হারিয়ে যায় বরাবরের জন্য।

উত্তরবঙ্গের চা বাগান অঞ্চলে এ হল ‘ওপেন সিক্রেট’। প্রশাসন সব বোঝে। পুলিশ সব জানে। কিন্তু তার পর? খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই থানা পাচারের কোনও কেস দেয় না। মিসিং ডায়েরি নেওয়া হয়। কিংবা বড়জোর শিশুদের ক্ষেত্রে অপহরণের মামলা করা হয়। কারণ, পাচারের মামলা হলে পুলিশের উপর চাপ বাড়বে। তাই সেটা উহ্য থাকাই ভাল।

ইদানীং বহু ক্ষেত্রেই পাচারকে ‘মাইগ্রেশন’ বলে চালানো হয়। ভিন্ রাজ্যে কাজে গিয়েছে! কী কাজ, কারা নিয়ে গেছে, কাজের পর সেই মেয়েটি বা ছেলেটি আদৌ ফিরল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর অধরাই থেকে যায় বরাবরের জন্য।

বিস্তীর্ণ চা বাগান পেরিয়ে গাড়ি এগোয়। বাগানে কাজ করছেন মহিলারা। থমকাতে হয় বার বার। কথোপকথন সামান্য এগোতেই সামনে আসে দারিদ্রের কথা, সংসারের হাল ফেরাতে মেয়েদের বাইরে কাজে পাঠানোর কথা।কাঁঠালগুড়ি চা বাগানের কাছে মুন্সী লাইনে যে মহিলার ঘরে গেলাম, তিনি গত ১৩ বছর মেয়েকে দেখেননি। ভাল স্কুলে পড়ানোর নাম করে যারা মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিল, তারা ফোন ধরে না। তাদের ঠিকানাও নেই তাঁর কাছে। ‘‘আমাদের দিন বদলাবে, সে আশা অনেক দিন মরে গিয়েছে’’—কান্নায় গলা বুজে আসে তাঁর। বলেন, ‘‘অনেক দিন পর কেউ এসে এ সব জানতে চাইল। মেয়েটা যে ছিল, সেটাই কখনও কখনও ভুলে যাই।’’

পথের সঙ্গী, স্থানীয় বাসিন্দা মাংরা মুন্ডা বলেন, ‘‘বহু ক্ষেত্রে এমন হয় যে, নিয়ে যাওয়ার পরে যত দিন পর্যন্ত টাকাপয়সা ঠিকঠাক পাওয়া যায়, বাড়ির লোকেরা কিছু বলে না। টাকা আসা বন্ধ হলে বলতে থাকে। তখন হাজার খোঁজ করলেও আর খোঁজ মেলে না মেয়ের।’’

পাচারের ঘটনা আটকাতে একাধিক সংস্থা কাজ করে উত্তরবঙ্গে। তেমনই এক সংস্থা ‘জবালা’র কর্মীরা জানালেন, প্রতিবেশী, এমনকি আত্মীয়রাও বহু ক্ষেত্রে এ সঙ্গে জড়িত থাকে। নন্দাকে (নাম পরিবর্তিত) যেমন পাচার করে দিয়েছিল সৎ দিদি। ২২ দিন একটি বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল তাকে। দিল্লি পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার আগেই নন্দা পালায়। টানা ২২ দিন ধর্ষণ করা হয়েছিল তাকে।

এলাকার সমাজকর্মীরা বলছিলেন, এত মেয়ে যে মাঝেমধ্যেই নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের উদ্ধারের পর তারা যৌনপল্লির অভিজ্ঞতার কথা বলে। বলতে ভয় পায় তারা। জানে, বললে সমাজে মূল স্রোতে হয়তো ফেরা যাবে না। ডুয়ার্সের চা বাগান থেকে পুণে, আগরা-সহ বিভিন্ন এলাকার যৌনপল্লিতে পাচার হওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটে।

চা বাগান থেকে প্রচুর শিশু পাচার হয় সিকিমেও। তাদের মূলত বিভিন্ন বাড়িতে কাজের জন্য নিয়োগ করে দালালরা। কিন্তু নিয়ে যাওয়ার সময় বলে, তাদের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছে। বলা হয়, চেন্নাইয়ে কাজ আছে। কিন্তু সেখানে তো কিছুটা ইংরাজি বলতেই হবে।তাই তারা ভাল স্কুলে পড়ার ব্যবস্থা করবে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। ওখানে পড়ানোর পরে ভাল কাজের ব্যবস্থা করা হবে। দিন ফিরবে, ভরপেট খাওয়া জুটবে। এই আশায় বাবা-মা রাজি হয়ে যান।

ডুয়ার্স জাগরণ-এর ভিক্টর বসু বলছিলেন, ‘‘চা বাগান বন্ধ, অনাহারে মৃত্যু। কাজ থাকলেও ২৫০ টাকা মজুরিতে সংসার না চলা, এমন অনেক পর্ব পেরিয়ে বিভিন্ন পরিবার থেকে বাইরে পাঠানো হয় কাজের জন্য। যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটা রাখা হয় না। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি লাগাতার। কিন্তু সমস্যার উৎস না বদলালে এই সমস্যা কখনও নির্মূল হবে না। সেটা প্রশাসনকেভাবতে হবে।’’

ডুয়ার্সেরই এক চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের মেয়ে সানিয়া (নাম পরিবর্তিত) থাকে ওয়াসাবাড়িতে। বয়স এখন ১৭। ঘরে নিত্য অভাব। খাওয়া জুটত না। রাগারাগি করে বেরিয়ে গিয়েছিল। এক ‘ম্যাম’ তাকেও ভাল কাজ, ভাল জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দিল্লিতে। সেখানে টানা চার মাস ধর্ষণ করা হয় তাকে। তার পর কোনও ভাবে পালায় সে। পরের দু’মাস এ-দিক ও-দিক ঘুরতে ঘুরতে, অত্যাচার সহ্য করতে করতে, কোনও মতে ফিরতে পেরেছে। বাড়িতে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা অভাব। তবে এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহায়তায় আবার পড়াশোনা শুরু হয়েছে তার। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মী বলেন, ‘‘লেখাপড়ায় খুব ভাল। কিন্তু বড্ড রাগ ওর। সেটাই কমানো যাচ্ছে না।’’

প্রশ্ন করি, কেন এত রেগে যাও সানিয়া? রাগ করে বাড়ি ছেড়েই তো বিপদে পড়েছিলে!

উত্তর দিতে সময় নেয় না কিশোরী। বলে, ‘‘না দিদি, আমি এই রাগটা বাঁচিয়ে রাখতে চাই। পুলিশ আমাকে বাঁচায়নি। কিন্তু পুলিশ হতে চাই। এনকাউন্টার করে শেষ করব সব ক’টাকে।’’ এনকাউন্টার শব্দটা কোথায় শিখলে? ‘‘দিল্লিতে।’’ হাঁফাতে থাকে সে। ওই কর্মী তার পিঠে হাত রাখেন। এগিয়ে দেন জলের গ্লাস। ঘর জোড়া স্তব্ধতা।

নির্যাতিত এক কিশোরীর মন থেকে এই প্রতিহিংসা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র কবে বুঝবে? ভোটের বাজারে এই মেয়েদের মুখ, মাথা হেঁট করাতে পারবে রাজনৈতিক নেতাদের?

(শেষ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন