যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। — ফাইল চিত্র।
রাজ্যের শাসক দলের বিধায়ক এক চিত্রপরিচালকের সাম্প্রতিক ছবিতে উঠে এসেছে কোনও এক যদুপুরের আখ্যান। যেখানে হস্টেলে র্যাগিংয়ে নবাগত ছাত্রের মৃত্যু ঘটে, তার পরে ছাত্রেরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটা আস্ত থানা জ্বালিয়ে দেয়। ছবিটি দেখতে গিয়ে তাজ্জব যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এক অধ্যাপক দম্পতি: ‘‘একটি নিন্দনীয় ঘটনার গায়ে রং চড়িয়ে সিনেমাটা যাদবপুরের ভাবমূর্তি ধ্বস্ত করছে, ভাবার কারণ রয়েছে। যাদবপুরের শিক্ষাঙ্গনে পড়াশোনার উৎকর্ষের দিকটি অপপ্রচারে সচেতন ভাবে ঢেকে ফেলা হচ্ছে।’’
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে রাজ্যের বচ্ছরকার বাজেট বক্তৃতার ‘সাফল্যগাথা’য় উল্লেখ ছিল না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের। যাদবপুর এনআইআরএফ-এ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে ‘ভারত সেরা’ হলেও না। দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রথম ১০টির তালিকায় যাদবপুর ধারাবাহিক ভাবে ঠাঁই পেলেও না। অথচ পরিসংখ্যানের মোড়কে পছন্দসই সত্যকে মেলে ধরতে বাজেট-পর্বে চেষ্টার কমতি রাখে না রাজ্য সরকার। যদিও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা থেকে শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যানের দাবিতে সাধারণত প্রকৃত বাস্তবতা উঠে আসে না। যাদবপুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই ক্ষোভ, তারা রাজনীতিগত ভাবে কেন্দ্রের গেরুয়া-শিবির কিংবা রাজ্যের শাসক দলের বশংবদ না-হওয়ায় কেন্দ্র বা রাজ্য দুইই যাদবপুরের উৎকর্ষ চর্চাকে স্বীকৃতি দিতে বা সাহায্যের হাত বাড়াতে পিছপা।
সাম্প্রতিক অতীতে কেন্দ্রের রুসা প্রকল্পের ১০০ কোটি টাকার অনেকটা বা ‘ইনস্টিটিউট অব এমিনেন্স’ মর্যাদার থেকে যাদবপুরের বঞ্চনাও অনেকেই বৈষম্যমূলক বলে মনে করেন। কিন্তু রাজ্য সরকারের নিস্পৃহ অসহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রোজকার খরচ সামলানোও কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ। শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের মাইনে, পেনশন দিতে দেরি তো আছেই! রক্ষণাবেক্ষণের সব খরচ সামলাতে যাদবপুর ৫০ কোটি চাইলে টেনেটুনে অর্ধেক দিচ্ছে রাজ্য সরকার। যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন তথা কনস্ট্রাকশনের অধ্যাপক পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের কথায়, “গবেষণায় ফেলোশিপ, ডিজিটাল লাইব্রেরির মাধ্যমে সাম্প্রতিক জার্নালের সরবরাহ বা আধুনিক সফটওয়্যারের জোগানে পুঁজি কমছে। সরকারি অনুদানের এই ছাঁচ চললে যাদবপুর নিরুপায় হয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে।”
এনআইআরএফ-এ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তালিকায় গত বছর ১২ থেকে ১৮য় নেমেছে যাদবপুর। গবেষণাতেও ১৯ থেকে পিছিয়ে তারা ২৩। কিন্তু যারা এগিয়ে তারা প্রত্যেকেই সাধারণত আইআইটি, এনআইটির মতো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান বা বিপুল পুঁজির সর্বভারতীয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাদের সঙ্গে যাদবপুরের যুদ্ধটা ক্রমশ অসম হয়ে উঠছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা তথা জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা নিয়ে ধারাবাহিক অব্যবস্থা যাদবপুর কর্তৃপক্ষকে আরও বেশি আতঙ্কে রেখেছে। গত বছর ওবিসি-জটে জয়েন্টের ফল বেরোয় আড়াই-তিন মাস বাদে। ফলে যাদবপুরের সিমেস্টার শুরু হতে অনেকটা দেরি হয়। একই সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা পরীক্ষায় দেরির জন্য ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রম ছেড়ে দ্বিতীয় বর্ষে (তৃতীয় সিমেস্টার) যাদবপুরে ভর্তির জিলেট (জয়েন্ট এন্ট্রাস এগজ়ামিনেশন ফর ল্যাটারাল এন্ট্রি) পরীক্ষাতেও বছর, বছর দেরি হচ্ছে। এর ফলে মুশকিলে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। এ বছরও অভূতপূর্ব দেরি, জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার ঘোষণার নামগন্ধ এখনও শোনা যায়নি। কিন্তু কেন্দ্রীয় জয়েন্টের পরীক্ষা পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। অনেকে মনে করেন, এত দেরির জন্যও মেধাবী ছাত্রেরা যৎসামান্য খরচে পড়ার সুযোগ থাকলেও যাদবপুরে না-ঢুকে আইআইটি এমনকি এনআইটিতে যাচ্ছেন।
যাদবপুরে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও রাজ্য জয়েন্টের র্যাঙ্ক ইদানীং বছর-বছর পিছোচ্ছে। আগে ২৫০ র্যাঙ্কধারী কেউ ইলেকট্রিক্যালে ঢুকলে এখন তা ৪০০-র নীচে নামছে। যাদবপুরের সহ-উপাচার্য অমিতাভ দত্ত মনে করেন, “ভর্তিতে দেরি ছাড়াও ইদানীং ছাত্র-অভিভাবকদের একটা শ্রেণি উন্নততর পরিকাঠামো খোঁজেন। যাদবপুরের সস্তার হস্টেল থেকে অনেক কিছুই তাঁদের মনঃপুত নয়।” সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক প্রীতম আইচের মতে, “ইদানীং এ রাজ্যে চাকরির হাঁড়ির হালও যাদবপুর থেকে মুখ ফেরানোর কারণ।” চাকরির বাজারে যাদবপুরের ভাবমূর্তি যথেষ্টই ভাল। কিন্তু শোনা যায় নবীন ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই ভাবেন, চাকরি যখন পুণে, বেঙ্গালুরুতে করতে হবে, যাদবপুরের বদলে ভিন্ শহরের কোনও অনামা এনআইটিতে পড়লেও চাকরি পেতে সুবিধা হবে।
একদা এশিয়সেরা মর্যাদার বাহক যাদবপুরের ইংরেজি বিভাগের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম দিকের শিক্ষার্থীরাও ইদানীং অনেকে যাদবপুরে আসছেন না। বিদেশে বা নিদেনপক্ষে অশোক কি শিব নাদরের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁরা যাচ্ছেন। খরচা বেশি হলে স্কলারশিপের চেষ্টা করছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেজো, সেজো কলেজগুলিও দেখছে, শিক্ষার্থীরা নিত্যনতুন ইন্টার্নশিপ করতে বা দক্ষতা বৃদ্ধির ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি পাঠে বেশি আগ্রহী। তাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়বে বলে আশা।
লরেটো হাউস স্বশাসন পেয়েছে। স্কটিশচার্চ কলেজ স্বশাসন পেতে উৎসুক। লেডি ব্রেবোর্নের মতো সরকারি কলেজও স্নাতকোত্তরে নিজেদের পাঠ্যক্রমে শিক্ষা চালাতে উৎসাহী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ ঘোষও নতুন যুগের চাহিদা বোঝার দায়েরকথা বলছেন।
তাঁর মতে, “যা বাস্তব পরিস্থিতি আগের মতো অনুদান রাজ্য বা কেন্দ্রীয় স্তরে পাওয়াটা মুশকিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে স্বাবলম্বী হওয়ার রাস্তা খুঁজতে হবে। নইলে মধ্যবিত্তরাও সরকারি স্কুলের মতো সরকারি বা সরকার পোষিত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে মুখ ফেরাবে।’’ গত চার বছরে এনআইআরএফ-এর বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় ৮ থেকে ৩৯-এ নেমেছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সার্বিক উৎকর্ষ, গবেষণা— সব কিছুতেই ৪৭, ৪৮ নম্বরে নেমে অভাবনীয় পশ্চাদপসরণেরতারা শরিক।
নাক, এনআইআরএফ-এর মাপকাঠি ইদানীং শিক্ষার্থীরা পাঠ্যক্রম শেষ করে কে কোথায় চাকরি পেলেন বা কোন পেশায় ঢুকলেন, না উচ্চতর শিক্ষায় গেলেন, তারও খতিয়ান নেয়। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আপাতত শিক্ষকের অভাবে নাকাল। সব মিলিয়ে শিক্ষক সংখ্যা বরাদ্দ পদের অর্ধেকেরও কম। তাই আপাতত সিমেস্টার পিছু পঠনপাঠনের নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডারের শৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের তোড়জোড়ই উপাচার্যের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিনি বলছিলেন, “অতীতে কয়েক বার বিজ্ঞপ্তি বেরোলেও নিয়োগ হয়নি। পুরো বিষয়টি সুষ্ঠু ভাবে করতে আইনি পরামর্শ নিয়ে আমরা এগনোরচেষ্টা করছি।”
কলকাতা, যাদবপুরের গরিমা অটুট রাখার লড়াইয়ের সঙ্গে রাজ্যে উচ্চ শিক্ষার ভবিষ্যৎ অনেকটাই জড়িয়ে যে!
(চলবে)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে