(বাঁ দিকে) ফিরহাদ হাকিম, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
তারাতলার ভেঙে পড়া গুদামের নকশায় চূড়ান্ত ছাড় দেওয়ার অভিযোগে বিদ্ধ প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তাঁর গ্রেফতারির দাবিতে সুর চড়াচ্ছেন মমতা-পন্থী তৃণমূল নেতারা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বাম ও কংগ্রেস। এমনকি, বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরাও।
ওই নির্মীয়মাণ গোডাউনের ছাদ ভেঙে পড়ার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। গুদামের নকশা ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিলেন তদানীন্তন মেয়র ফিরহাদ— এই তথ্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভার ভিতরেই জানিয়েছেন।
তার পর থেকে নানা সূত্রে ফিরহাদের নাম এসেছে।
সরকারি নথি বলছে, গত বছর ২০ নভেম্বর মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটির বৈঠকে গুদামের নকশাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। মিটিং নোটে মন্তব্য করা হয়, নকশায় বিল্ডিং রুল ‘সেই অর্থে’ ভাঙা হয়নি, কিন্তু বিল্ডিং বিভাগের মেয়র পারিষদ অথবা মেয়রের অনুমতি ছাড়া যে এই ছাড়পত্র কার্যকর হবে না, সে কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মিটিং নোটে সই করে অনুমতি দিয়েছিলেন ফিরহাদ হাকিম, যিনি ছিলেন একাধারে মেয়র এবং বিল্ডিং বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত।
তা ছাড়া, যে গোডাউন ভেঙে পড়েছে, সেটি তৈরির দায়িত্বে ছিলেন আসগর হোসেন, যিনি নাকি সংশ্লিষ্ট ৮০ নম্বর ওয়ার্ডের সদ্য প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর আনোয়ার খানের ঘনিষ্ঠ। দু’জনের সঙ্গেই ফিরহাদের ছবি পাওয়া গিয়েছে। ঘনিষ্ঠতার আরও প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
ফিরহাদ অবশ্য দায় এড়িয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি যত দূর জেনেছি, গোডাউনটা বেআইনি নয়। নজরদারির অভাব ছিল। মেয়র বা কমিশনার গিয়ে তো আর নজরদারি করতে পারেন না।” তাঁর যুক্তি, তিনি বিশেষজ্ঞ নন, মিটিং নোটে তাঁর সই একটি ফর্মালিটি মাত্র।
কিন্তু ফিরহাদকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করার দাবি জানিয়েছেন মমতা শিবিরের বিধায়ক কুণাল ঘোষ। সাংসদ মহুয়া মৈত্রের প্রশ্ন, প্রাক্তন মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস যদি ‘অকারণে’ দু’সপ্তাহের ওপর জেলে থাকেন, তবে ফিরহাদ মুক্ত কী ভাবে? সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সরকার-অনুগত বিরোধী দলের’ অংশ হওয়ার কারণেই কি শহরে একের পর এক নির্মাণ দুর্ঘটনার পরেও প্রাক্তন মেয়র তথা পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রীর গায়ে আঁচ লাগছে না?
বিজেপির নেতারা পাল্টা বলছেন, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বিধানসভায় ফিরহাদের নাম তুলে নথিতে তাঁর সই দেখিয়েছেন, সেখানে তাঁর সরকার ফিরহাদকে বাঁচাবে, এই প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?
কালীঘাট-তৃণমূলের নেতারা আবার মনে করাচ্ছেন যে, ফিরহাদের নাম করার পরই এর মূল চক্রী হিসেবে ফিরহাদের তৎকালীন ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম নেন শুভেন্দু। তার পরেই বলেন কালীচরণ ‘ক্যামাক স্ট্রিটে’র, অর্থাৎ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয়ের নিয়োগ। অনেকে এটাকে ‘তির ক্যামাক স্ট্রিটের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া’ হিসেবেই দেখছেন।
কিন্তু ফিরহাদকে ‘বাঁচানোর’ এত বড় ঝুঁকি কেন নেবে বিজেপি সরকার? কালীঘাট শিবিরের দাবি, দু’টি কারণে। প্রথম, ‘নিরাপত্তার’ আশায় তৃণমূলের নেতারা একের পর এক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরে যোগ দিচ্ছেন। ফিরহাদ ‘নিরাপত্তা’ না-পেলে এই ধারায় একটা ধাক্কা আসতে পারে। দ্বিতীয়, ফিরহাদের মেয়ে প্রিয়দর্শিনী হাকিম ছিলেন ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মমতার কাউন্টিং এজেন্ট। গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই মামলা করেছেন মমতা। আদালত সেটি গ্রহণও করেছে। সেই নির্বাচনী মামলায় এক জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হবেন প্রিয়দর্শিনী।
তবে শেষ পর্যন্ত ফিরহাদ গ্রেফতার না-হলে বাম, কংগ্রেস ও কালীঘাট তৃণমূলের ভাসিয়ে দেওয়া ‘সেটিং’ তত্ত্ব যে জনমানসে প্রাধান্য পাবে, এই আশঙ্কা অনেক বিজেপি নেতারই রয়েছে। বর্তমান পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও শুক্রবার বলেন, “কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি শেষ কথা ছিল। তাঁকে যদি গ্রেফতার করা হয়, তা হলে যিনি মন্ত্রী ছিলেন, যাঁর স্বাক্ষর ছিল তাঁকে কেন ধরা হবে না?” অগ্নিমিত্রার অবশ্য দাবি, যাঁরা যাঁরা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের কাউকে ছাড়া হবে না।
আপাতত ঘরে-বাইরে চাপের মুখে ফিরহাদের ভবিষ্যৎ। শুধু ফিরহাদ নয়, আরও অনেকের।