শেষযাত্রা। রবিবার দত্তপুকুরে নির্মাল্য প্রামাণিকের তোলা ছবি। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।
সারা দিনটা কেটেছে রাগে, ক্ষোভে, যন্ত্রণায়। রাত পৌনে ৮টা নাগাদ যখন বাড়ির ছেলের দেহ ফিরল বাড়িতে, তখন সারা দিনের সেই ঝাঁঝ নিমেষে চোখের জলে ধুয়ে মুছে একসা।
ঠিক দু’বছর আগে এমনই এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিল গাইঘাটার সুটিয়া। যে দিন এলাকার প্রিয় যুবকটির দেহ ময়না-তদন্তের পরে ফিরেছিল গ্রামে। দেহ ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। গলার স্বর তুলে বলেছিলেন, “বরুণ, তোমার আদর্শকে আমরা বাঁচিয়ে রাখব। এলাকার অসামাজিক কাজকর্মের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে নিয়ে যাব।” রবিবার দত্তপুকুরের কুলবেড়িয়ায় সৌরভের দেহ পৌঁছনোর পরে সেই একই দৃশ্যের যেন পুনরাভিনয় হল।
সকাল থেকেই কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় করেছিলেন এলাকার প্রতিবাদী যুবকটির বাড়িতে। শুক্রবার রাতে যাকে বাড়ির সামনে থেকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল দুষ্কৃতীরা। শনিবার ভোরবেলা তাঁরই ছিন্নভিন্ন দেহ উদ্ধার হয় দত্তপুকুর ও বামনগাছি স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকায় রেললাইন উপরে ও আশপাশ থেকে।
এই ভিড়টাই দিনভর ঘিরে থাকল প্রতিবাদী যুবকের বাড়ির আশপাশ। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।
এ দিন এলাকার বেশির ভাগ বাড়িতে রান্না হয়নি। রান্নাবান্না করবে কে? আর খাবেই বা কে? সব বাড়ির সব পুরুষ মহিলাই তো প্রায় নেমে এসেছেন রাস্তায়। দোকানপাট সমস্তই বন্ধ ছিল এলাকায়। দেহ আসার পরে বামনগাছি মোড় থেকে রাস্তার দু’পাশে মানববন্ধন করে দাঁড়িয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। তারই মাঝখান দিয়ে ঢোকে শববাহী গাড়ি। দু’পাশে সব বয়সের মানুষ দাঁড়িয়ে। অঝোরে কাঁদছেন অনেকেই। কেউ কেউ বুক চাপড়াচ্ছেন। পরিচিত অনেককে বলতে শোনা গেল, “মুখটাও শেষবারের মতো দেখতে পেলাম না।” শবের বিচ্ছিন্ন অংশ পুরোপুরি সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছিল। দেহের কোনও অংশই দেখা যাচ্ছিল না।
শববাহী গাড়ি বাড়ির সামনে দাঁড়ালে বাবা-মাকে নিয়ে আসা হয় বাইরে। মা মিতাদেবী সকাল থেকেই বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। একই অবস্থা বাবা সরোজের। শববাহী গাড়ির কাচে মাথা ঠুকছিলেন দু’জনেই। শেষযাত্রায় যাওয়ার আগে সন্তানের মুখ একবার দেখতে চেয়ে পাগলের মতো অবস্থা তাঁদের। কিন্তু কে কাকে সামলাবে? আশপাশের সকলেই তো ভাসছেন চোখের জলে।
এ দিনই তৈরি হয়েছে ‘বামনগাছি প্রতিবাদী মঞ্চ।’ মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছিল, “সৌরভের স্বপ্ন ছিল, এলাকা দুষ্কৃতীমুক্ত করা। দেহ ছুঁয়ে সকলে শপথ নিন, ওর সেই স্বপ্নকে আমরা সার্থক করব।” তিন মিনিট নীরবতা পালনের সময়ে শববাহী গাড়ি ছুঁইয়েই সেই শপথ নিলেন অগুনতি মানুষ। পেশাদার সাংবাদিকেরাও কাজ থামিয়ে নীরবতা পালন করেছেন।
একটু দূরেই মহিলাদের আলোচনা থেকে ভেসে আসছিল আশঙ্কার কথা। বলাবলি হচ্ছিল, দেহ চলে যাবে। সংবাদমাধ্যম চলে যাবে। পুলিশ চলে যাবে। সকলের নজর আবার ঘুরে যাবে অন্য কোনও খবরের দিকে। তখন কি ফের দাপিয়ে বেড়াবে দুষ্কৃতীরা? তারই মধ্যে দাঁতে দাঁত চেপে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলতে শোনা গেল অনেককে।
সাড়ে ৮টার পরে শেষ বার বাড়ি থেকে বেরোল সৌরভ। পিছনে রেখে গেল বহু উদ্বেগ, আতঙ্ক। তবু সব কিছু ছাপিয়ে প্রাণবন্ত যুবকটির মৃত্যু যেন এক রাশ সাহস জুগিয়ে গেল বহু মানুষকে।