পাঁচ বছর ধরে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা পাচ্ছেন না মৌমিতা ঘোষ। ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার।
শুধু মধ্য হাওড়ার কবিতা মণ্ডল নন। এ বার আরও এক মহিলার লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা অন্যের অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার অভিযোগ সামনে এল। তাঁর ক্ষেত্রেও গত পাঁচ বছর ধরে ওই প্রকল্পের টাকা জমা পড়ছে অন্যের অ্যাকাউন্টে। অভিযোগ, জেলা সমাজকল্যাণ দফতরে সে কথা জানানো সত্ত্বেও সাহায্য তো মেলেইনি, উল্টে জুটেছে ঘাড়ধাক্কা! ফলে এর পিছনে কোনও জালিয়াতি-চক্র কাজ করছে কিনা, উঠছে সেই প্রশ্ন।
হাওড়ার বাকসাড়ার বাসিন্দা মৌমিতা ঘোষের অভিযোগ, গত পাঁচ বছর ধরে তাঁর সঙ্গে এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটে চলেছে। তাঁর লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা জমা পড়ছে অন্য কোনও অ্যাকাউন্টে। সেই অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার পরেও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন জেলা সমাজকল্যাণ দফতরের আধিকারিকেরা। পাশাপাশি, যাঁর অ্যাকাউন্টে ওই টাকা এত বছর ধরে জমা পড়েছে, তিনিও প্রশাসন বা পুলিশকে সে কথা জানাননি।
মৌমিতার অভিযোগ, সম্প্রতি জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পেরে তিনি হাওড়া জেলা সমাজকল্যাণ দফতরে অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু অভিযোগ, এর পরেও কোনও কাজ হয়নি। এমনকি, বার বার ওই দফতরে গেলে কবিতার মতো মৌমিতাকেও কার্যত ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের ধারণা, লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা লোপাটের পিছনে কোনও জালিয়াতি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। সম্প্রতি এই চক্রের বিষয়টি সামনে আসে মধ্য হাওড়ার কবিতা মণ্ডলের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরে। কবিতার অভিযোগ, রাজ্য সরকারের এই বিশেষ প্রকল্পে আবেদন করার পরে মোবাইলে আসা মেসেজ থেকে তিনি জানতে পেরেছিলেন, তাঁর আবেদন গৃহীত হয়েছে এবং তিনি এ বার থেকে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা প্রতি মাসে পাবেন। কিন্তু তার পরেও অ্যাকাউন্টে টাকা না আসায় কবিতা আধার কার্ড লিঙ্ক থেকে জানতে পারেন, তাঁর টাকা নিয়মিত ভাবে অন্য এক জনের অ্যাকাউন্টে ঢুকছে। এর পরে গত পাঁচ বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও সেই টাকা তিনি পাননি।
কবিতার মতো এই ঘটনা ঘটেছে মৌমিতার সঙ্গেও। তিনি জানান, লক্ষ্মীর ভান্ডারের জন্য তিনি প্রথম আবেদন করেন ২০২১ সালে। কিন্তু অধিকাংশ আবেদনকারীর মতো লক্ষ্মীর ভান্ডারের আবেদনপত্র মঞ্জুর হওয়ার মেসেজ তাঁর নিজস্ব মোবাইল নম্বরে আসেনি। ফলে প্রতি বার ‘দুয়ারে সরকার’ শিবির হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে আবেদন করার জন্য তিনি লাইন দেন। অথচ, তাঁর সেই টাকা আজও জোটেনি।
মৌমিতা জানান, তাঁর পরিবারে স্বামী ও দুই সন্তান ছাড়াও রয়েছেন শ্বশুরমশাই। তাঁর স্বামীর ছোটখাটো লোহার ব্যবসা আছে। সেটিই সংসারের আয়ের একমাত্র উৎস। অর্থসঙ্কটে থাকা পরিবারটি তাই গত পাঁচ বছরে লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে পাওনা ৪০ হাজার টাকা না পাওয়ায় অনেকটাই বিপাকে পড়েছে। মৌমিতা বলেন, ‘‘আমি প্রথমে আমার ব্যাঙ্কে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। তাঁরাই আমাকে জানান, এই ধরনের একাধিক অভিযোগ আসছে। আমি যেন সমাজকল্যাণ দফতরে যাই। সেই মতো আমি হাওড়া আদালত চত্বরে থাকা জেলা সমাজকল্যাণ দফতরের আধিকারিকদের কাছে লিখিত অভিযোগ জানাই।’’
তাঁর আরও অভিযোগ, প্রথমে ওই দফতরের তরফে তাঁর অভিযোগের কোনও গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। এমনকি, এ কথাও বলা হয়েছিল যে, ওই টাকা অন্য কারও অ্যাকাউন্টে যদি চলে গিয়ে থাকে, তা হলে তাঁদের কিছু করার নেই। কেন সমাজকল্যাণ দফতরের তরফে তাঁদের সাহায্য করা হচ্ছে না, এবং জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে ওই দফতরেরই কোনও যোগসূত্র আছে কিনা— সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘‘একটার পর একটা এই ধরনের অভিযোগ যখন আসছে, তখন মনে হচ্ছে, কোনও জালিয়াত চক্র
এর পিছনে থাকতে পারে। আমরা প্রথমে প্রকৃত আবেদনকারী ছাড়া যে ক’টি অ্যাকাউন্টে এই টাকা ঢুকছে, তা বন্ধ করে দেব। এর পরে ওই
মহিলারা যাতে প্রাপ্য ভাতা পান, তার ব্যবস্থা করব। কিন্তু গত পাঁচ বছরের প্রাপ্য টাকা কী ভাবে তাঁরা পাবেন, তা জানি না।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে