—প্রতীকী চিত্র।
বাম আমল থেকেই রাজনৈতিক গুরুত্বের নিরিখে ‘কুলীন’ বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খড়দহ। এক দিকে বিটি রোড, অন্য দিকে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে লাগোয়া প্রাচীন এই জনপদের আলোর নেপথ্যে গভীর অন্ধকারের ‘চক্রব্যূহ’। যেখানে এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন জমি ভরাট করা, শিল্পাঞ্চল, পানশালা থেকে মাসোহারা তোলা অথবা সাট্টা-জুয়ার রমরমা কারবার— সবই চলে শাসকদলের বাহুবলীদের অঙ্গুলিহেলনে। রাজনীতির লড়াইয়ের মতো অন্ধকারের এই সাম্রাজ্যেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকট। আধিপত্য কায়েমের লড়াই চলে আসে প্রকাশ্যে। এই অভিযোগ শুধু বিরোধীদের নয়, এলাকায় কান পাতলেই শোনা যায়, অনৈতিক কাজকর্মের রমরমার কথা।
সূত্রের খবর, খড়দহ ব্লকের বন্দিপুর, পাতুলিয়া এবং বিলকান্দা-১ পঞ্চায়েতের কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের ধারে বিস্তীর্ণ জমিতে বহু নির্মাণ হচ্ছে। সেখানে খাস জমি যেমন আছে, তেমনই রয়েছে শিল্পাঞ্চল ও জলা জমিও। জমির চরিত্র বদল, ভরাট ছাড়াও নির্মাণের পরিকাঠামো তৈরির কাজ কার দখলে থাকবে, তা নিয়েই চলে বাহুবলীদের ঠান্ডা লড়াই। সেখানে রাজনৈতিক পদাধিকারীরা সরাসরি থাকেন না। বদলে জমির মালিককে বলে দেওয়া হয়, কোন ঠিকাদারকে পুরো কাজের বরাত দিতে হবে। এর পরে বিঘা-প্রতি অন্তত পাঁচ-ছ’লক্ষ টাকা ওই ঠিকাদারের থেকে পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট ‘দাদাদের’ কাছে।
আবার, বিলকান্দা-১-সহ অন্যান্য এলাকার ভিতরের জমির পরিমাণ যা-ই হোক, ক্রেতাকে দু’-তিন লক্ষ আর বিক্রেতাকে অন্তত এক লক্ষ টাকা দিতে হয়। শহরেও প্রোমোটিং-পিছু দু’লক্ষ টাকা স্থানীয় নেতাদের দিতে হয় বলে অভিযোগ। এই জমি নিয়েই শাসকদলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ এখন প্রকাশ্যে। সম্প্রতি পাতুলিয়ার রহড়া শিল্পতালুকে নির্মীয়মাণ কারখানার কাজ নিয়ে ঝামেলা বাধে পঞ্চায়েত-প্রধানের ছেলের গোষ্ঠীর সঙ্গে উপপ্রধানের। থানার সামনেই উপপ্রধানের পক্ষ নেওয়া ব্লক সভাপতি প্রসেনজিৎ সাহার লোকজনের সঙ্গে অপর পক্ষের মারামারি বাধে। বিভিন্ন পঞ্চায়েতের নেতা বা তাঁদের আত্মীয়দের বিরুদ্ধেও জলা জমি ভরাটের অভিযোগ নতুন নয়। পুলিশেও কিছু অভিযোগ করা হয়েছে। প্রসেনজিৎ বলেন, ‘‘সভাপতি হওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশকে জানিয়েছি, ব্লকে যেন জলা ভরাট বরদাস্ত করা না হয়। পাতুলিয়ায় শিল্পাঞ্চলের একটি বোজানো জলা জমি ফের খুঁড়িয়েছি। বাধা দিই বলেই আক্রোশে অনেকে মিথ্যা রটাচ্ছে।’’ খড়দহ ব্লকে হাজারখানেক কারখানা রয়েছে। অভিযোগ, ছোট কারখানা হলে ৫০০, মাঝারি ও বড় কারখানার ক্ষেত্রে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা মাসোহারা দিতে হয় স্থানীয় ‘দাদাদের’।
বিজেপি নেতা জয় সাহা বলেন, ‘‘জমি, কারখানার সঙ্গে রমরমিয়ে চলছে সাট্টা-জুয়ার ঠেক, পানশালা। ওই সমস্ত কারবারের বখরা নিয়েই পাড়ায় পাড়ায় তৃণমূলের অসংখ্য গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। সবেরই নেপথ্যে রাজ্য স্তরের দুই নেতার হাত।’’ জয়ের দাবি, মাসকয়েক আগে একটি জমি নিয়ে জটিলতা কাটানোর মধ্যস্থতায় টাকার বান্ডিলের সামনে ব্লকের যুব সভাপতি তথা বিলকান্দা-১-এর উপপ্রধান প্রবীর দাসের বসে থাকার ছবি (আনন্দবাজার সত্যতা যাচাই করেনি) ভাইরাল হয়। প্রবীরের দাবি, ‘‘জমির বিষয়ে থাকি না। ভুয়ো ছবি দিয়ে বিরোধীরা রাজনৈতিক ফয়দা তোলার চেষ্টা করলেও লাভ হবে না।’’ প্রসেনজিৎ ও প্রবীরের আবার দাবি, আইন মেনে কেউ জমির চরিত্র বদল করলে কিছু বলার নেই।
অতীতে চোলাইয়ের রমরমা ছিল বিলকান্দা-২ পঞ্চায়েতে। এখন তা বন্ধ হলেও ওই এলাকা-সহ খড়দহ জুড়ে সাট্টা-জুয়া, গাঁজার কারবারের অভিযোগ করছেন শাসকদলেরই একাংশ। পুলিশি ধরপাকড়ে সাময়িক বন্ধ থাকলেও আবার স্থানীয় ‘দাদাদের’ আশ্বাসে তা চালু হয়। ফোন করলেই সাইকেলে বাড়িতে হাজির হয় সাট্টার কারবারিরা। অনলাইনে চলে লেনদেন। সাট্টা-জুয়ার ঠেক থেকে দৈনিক যে টাকা ওঠে, তার ৬ শতাংশ পান ‘পেনসিলার’। বাকিটা এলাকাভিত্তিক দাদাদের কমিশন। আবার, কোথাকার গাঁজা কত ভাল, তা নির্দিষ্ট করা থাকে প্যাকেটে ফোটোকপি করা লোগো ভরে। বিলকান্দা-১ ও ২ পঞ্চায়েতের কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে লাগোয়া প্রায় ১২টি পানশালার প্রতিটি থেকে মাসে এক থেকে দু’লক্ষ টাকাও ওঠে। অভিযোগ, এই সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ এক শীর্ষ নেতার আত্মীয়ের কব্জায়।
পালাবদলের সময় থেকে ২০২০ পর্যন্ত খড়দহ মূলত শাসকদলের পাঁচ-ছ’জন নেতার নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরে সেই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন প্রয়াত পুরপ্রধান কাজল সিংহ। তাঁর বাহুবলী ছিলেন প্রসেনজিৎ। ২০২১-এর ভোটে কাজল জিতলেও ফল ঘোষণার আগেই করোনায় মারা যান। তাই উপনির্বাচন হয়। এর পরে খড়দহের নিয়ন্ত্রণ শাখা-প্রশাখায় ভাগ হয়েছে। খড়দহ শহরে সেই গোষ্ঠীর সংখ্যা তিন হলেও ব্লকে, অর্থাৎ বন্দিপুর, পাতুলিয়া, বিলকান্দা-১ ও ২— এই চারটি পঞ্চায়েত মিলিয়ে প্রায় ১৫ জন মাথা রয়েছেন। প্রত্যেকেই নিজের ছোট ছোট দল গড়েছেন। পঞ্চায়েত স্তরের মাথাদের অঞ্চল ভাগ করে দিয়েছেন শীর্ষ নেতারাই। ওই ১৫ জনের একটি অংশ প্রসেনজিতের ঘনিষ্ঠ। বাকিরা কেউ প্রাক্তন ব্লক সভাপতি সুকুর আলি, কেউ প্রবীরের ঘনিষ্ঠ। গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ‘অম্লমধুর’ সম্পর্কও সর্বজনবিদিত।
বিরোধীদের দাবি, ‘‘খড়দহে শাসকদলের স্থায়ী অভিভাবক না থাকায় লুটের রাজনীতি চলছে। বখরা নিয়ে পুলিশের সামনেও প্রায়ই মারামারি হয়।’’ যদিও প্রসেনজিৎ ও প্রবীরের দাবি, ‘‘দলে বিবাদ বা আলাদা গোষ্ঠী নেই।’’ জমি, কারখানা, জুয়া, পানশালা থেকে টাকা তোলার অভিযোগও মিথ্যা বলেই নেতাদের দাবি। দীর্ঘ দিন ব্লক সভাপতি থাকা সুকুর আলি অবশ্য বলেন, ‘‘সর্বত্রই আমরা ক্ষমতায়। তাই কোনও অন্যায় হলে তার দায় দলের সকলকেই নিতে হবে। সমাজমাধ্যমে এত কিছু লেখালিখির পরেও কেউ সংযত না হলে তা দুর্ভাগ্যের।’’ খড়দহের বিধায়ক তথা মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘জলা-জমি ভরাটের বিরুদ্ধে সরব হয়েছি। কখনও কোনও অসামাজিক কাজ সমর্থন করিনি। পরেও কখনও করব না।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে