বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। ছবি: সংগৃহীত।
পশ্চিমবঙ্গ সফরের দ্বিতীয় দিনে শাসকদলের উদ্দেশে ‘জেল-বার্তা’ দিয়ে গেলেন বিজেপির নতুন সভাপতি নিতিন নবীন। নিয়োগ দুর্নীতিতে যাঁদের নাম জড়িয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের স্থান জেলেই হবে বলে মন্তব্য করলেন নিতিন। বুধবার দুর্গাপুরে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে ওই মন্তব্য করার সময়ে কারও নাম নিতিন করেননি। কিন্তু বিজেপি সভাপতি হিসাবে প্রথম বার পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসেই যে মন্তব্য তিনি করেছেন, কেউ কেউ তাতে ‘বিশেষ তাৎপর্য’ খুঁজে পাচ্ছেন।
বর্ধমান-দুর্গাপুর, কাটোয়া, বোলপুর এবং বীরভূম— এই চারটি সাংগঠনিক জেলার কর্মীদের নিয়ে বুধবার দুর্গাপুরে কর্মিসভা করেন নিতিন। নিয়োগ দুর্নীতি প্রসঙ্গে তৃণমূল তথা রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করে বিজেপি সভাপতি সেখানে বলেন, ‘‘ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কী ভাবে তৈরি হবে, মেডিক্যাল কলেজ কী ভাবে তৈরি হবে, তা নিয়ে এখানে আর কথা হয় না। এখানে এখন শিক্ষাকে বরবাদ করে দেওয়া নিয়ে কথা হয়।’’ এর পরেই জেল-ভাষ্য শোনা যায় নিতিনের মুখে। তিনি বলেন, ‘‘চাকরি দেওয়ার নামে যাঁরা দুর্নীতি করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ জেলে আছেন, কেউ কেউ বেলে (জামিনে) আছেন। চিন্তা করবেন না। যাঁরা বেলে আছেন, তাঁরাও জেলে যাবেন। কারণ, যাঁরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ঘাম ঝরানো উপার্জন নিয়ে দুর্নীতি করেছেন, এখানকার যুবসমাজকে চাকরি দেওয়ার নামে দুর্নীতি করেছেন, আমরা তাঁদের ছাড়ব না। তাঁদের জায়গা জেলেই হবে। তিনি যে ব্যক্তিই হোন না কেন।’’
ভোটমুখী রাজ্যে এসে বিজেপি সভাপতির মুখে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারি ‘বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে অনেকের মত। এর আগে দিল্লি, তেলঙ্গানা, ঝাড়খন্ড, ছত্তীসগঢ়-সহ একাধিক রাজ্যে ভোটের মরসুমে বিজেপির প্রতিপক্ষ শিবিরের ‘ওজনদার’ নেতানেত্রীদের গ্রেফতার হতে দেখা গিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির হাতে। বুধবার নিতিনের মন্তব্যে সেই ইঙ্গিতই ছিল না কি, তা নিয়ে নানা মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজ্য বিজেপির কোর কমিটিকে নিয়ে বৈঠক করে নিতিন যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, বুধবারের কর্মসূচিতে দলের কর্মীদের উদ্দেশেও নিতিন সেই বুথ মজবুত করার বার্তাই দিয়েছেন। নিতিনের আগে ভাষণ দেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁদের ভাষণেও বার বার করে আগামী এক মাসে বুথ স্তরে শক্তি বৃদ্ধি এবং সমন্বয় বৃদ্ধির বার্তা শোনা গিয়েছিল। সব শেষে বলতে উঠে নিতিনও বলেন, ‘‘বুথ মজবুত হওয়া দরকার। যদি বুথ মজবুত হয়ে যায়, শক্তিকেন্দ্র মজবুত হয়ে যায়, তা হলে পশ্চিমবঙ্গে কেউ পদ্ম ফোটা রুখতে পারবে না।’’
অনুপ্রবেশ প্রশ্নে তৃণমূলের বিরুদ্ধে আক্রমণের সুর আরও চড়ানো এবং পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মহিমাণ্ডণ যে বিজেপির প্রচারকৌশলের অঙ্গ হতে চলেছে, সে কথাও মঙ্গলবারের বৈঠকেই দলের রাজ্য নেতৃত্বকে নিতিন বলেছিলেন বলে বিজেপি সূত্রের খবর। বুধবারের প্রকাশ্য ভাষণে তিনি নিজেই সেই সুর বেঁধে দিয়ে গিয়েছেন। দুর্গাপুজোর যে অসামান্য রূপ গোটা ভারতের প্রিয় হয়ে উঠেছে, তা ভারতকে পশ্চিমবঙ্গই দিয়েছে বলে বিজেপি সভাপতি মন্তব্য করেছেন। সেই দুর্গাপুজোর আয়োজনেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার নানা ভাবে বাধার সৃষ্টি করে বলে তিনি দাবি করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের কারণেই পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব সংস্কৃতি তথা পরম্পরা আক্রান্ত হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। নিতিনের কথায়, ‘‘আমরা বাংলার নিরাপত্তার পাশাপাশি গোটা ভারতের নিরাপত্তার জন্যও লড়ছি। বাংলায় এমন দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে যাতে ভারতের সংস্কৃতি, ভারতের সনাতন পরম্পরা আক্রান্ত হচ্ছে।’’ বিজেপির সভাপতি বলেন, ‘‘এখানকার জনবিন্যাসকে এক দিকে বলানোর চেষ্টা হচ্ছে। তার সঙ্গে সনাতন পরম্পরাকেও বদলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।’’