পার্ক স্ট্রিট উড়ালপুল। বৃহস্পতিবার। — দেশকল্যাণ চৌধুরী
‘দ্য সিটি অব জয়’ নাম ছিল আগেই। এ বার মুকুটে ‘সিটি অব লাইট’-এর পালকও জুড়ে নিতে চায় কলকাতা।
সন্ধ্যা হতেই উত্তরে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, এপিসি রোড, রবীন্দ্র সরণি থেকে দক্ষিণে পার্ক স্ট্রিট, হাজরা, কালীঘাট, বালিগঞ্জ— নজর কাড়ছে আলো-ঝিলমিল নগরী। রাস্তায় সোডিয়াম ভেপার, মেটাল হ্যালাইডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাইমাস্ট, ত্রিফলা, এলইডি বাতি। সব সময়েই যেন উৎসবের মেজাজ। তিনশো বছর পেরোনো শহরটার এমন ঝলমলে চেহারাটাই বজায় রাখতে চান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নির্দেশেই ‘ডায়িং সিটি’র অপপ্রচার মুছে নতুন রূপ পাচ্ছে কলকাতা।
কলকাতা পুর-এলাকার মতোই রঙিন আলোয় মায়াবী হয়েছে বিমানবন্দর থেকে শহরে ঢোকার পথ। সেজেছে সল্টলেক, রাজারহাট থেকে বারাসত, মধ্যমগ্রাম এবং হাওড়াও। ধীরে ধীরে সেজে উঠছে লাগোয়া শহরতলির সবটুকুই। রাজারহাটে রংবাহারি আলোয় মোড়া ইকো পার্ক তো এখন শহরের দৈনন্দিন পর্যটনের মুখ। স্ট্র্যান্ড রোড লাগোয়া গঙ্গার ধার ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতা এখন যেন টেমসের তীরের মতোই।
বছর কয়েক আগেও যাঁরা এই শহর দেখেছেন, বড় রাস্তার উপরে জমা আবর্জনার স্তূপ, অল্প বৃষ্টিতেই বানভাসি অবস্থা ইত্যাদির নিত্য অস্বস্তি যাঁদের ভুগিয়েছে, এখন শহরের পাল্টে যাওয়া চেহারাটা তাঁদের নজর এড়াচ্ছে না। পর্যটন-পেশাদার অনিল পঞ্জাবি বলেই ফেললেন, ‘‘মনে হচ্ছে কোনও মায়াবী জগতে এসেছি। এমন তো সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্ককে দেখেছি।’’ ভোল বদলে যাওয়া কলকাতাকে দেখে চমকিত ক্যালিফোর্নিয়া প্রবাসী সপ্তপর্ণী মুখোপাধ্যায়ও। গাড়িতে ‘মা’ সেতু ধরে যেতে যেতে তাঁর উচ্ছাস— ‘‘মনে হচ্ছে যেন দিওয়ালি।’’ আলোয় মোড়া শহরে ফিরে লন্ডন প্রবাসী অঞ্জন চক্রবর্তীর সার্টিফিকেট, ‘‘বিদেশি শহরের মতো সাবালক হচ্ছে আমাদের কলকাতাও।’’
কলকাতার এই আলোক-নগরী হয়ে ওঠাকে স্বাগত জানাচ্ছেন বিপণন বিশেষজ্ঞ রাম রায়ও। বলছেন, ‘‘চোখের দেখায় এটা সত্যিই ভাল ধারণা তৈরি করে। বিশেষত যাঁরা প্রথম দেখছেন, তাঁদের কাছে তো আরও নজরকাড়া।’’
পুরসভার আলো দফতরের এক অফিসার জানান, শহরে এখন ২৫০ এবং ৪০০ ওয়াটের প্রায় দেড় লক্ষ মেটাল হ্যালাইড, ১ লক্ষ ২৫ হাজার সোডিয়াম ভেপার, ২০ হাজারের মতো ত্রিফলা, ৯ হাজার পোস্টে এলইডি বাতি এবং শ’খানেক হাইমাস্ট (উচ্চ বাতিস্তম্ভে ৮টি বাতি) বসেছে। মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘কলকাতাকে সুন্দর করে তোলাই মূল লক্ষ্য।’’
২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে বড়দিন-নতুন বছরের উ়দ্যাপনে পার্ক স্ট্রিটে আলোর উৎসব চালু করেন মুখ্যমন্ত্রী। এখন বছরভর ওই রাস্তায় আলোকসজ্জা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সেই কাজে পুরোদমে নেমেছে পুরসভা। কলকাতাকে ‘লন্ডন’ করার প্রয়াস থেকে পিছোতে রাজি নন মমতা। বিরোধীরা যতই ‘টিপ্পনি’ কাটুন, মুখ্যমন্ত্রী যে তাঁর লক্ষ্যে অবিচল, শহর সাজানোর এই পরিকল্পনাই তার জানান দিচ্ছে।