—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
প্রথমে অনলাইন গেমের আড়ালে হাজির হচ্ছে অপরাধী। তার পরে গেমের নেশা ধরিয়ে চলেছে ‘ব্ল্যাকমেল’। কখনও কাউকে ফুঁসলিয়ে তৈরি করানো হচ্ছে যেমন খুশি ভিডিয়ো, কেউ আবার অজানতেই শিশু পর্নোগ্রাফির শিকার হচ্ছে। শিশু, কিশোর-কিশোরীদের ভয় পাওয়ার দৃশ্যও এখন ‘অনলাইন কন্টেন্ট’! অপরিণত মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবসায় এর পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে চরম পথ বেছে নিচ্ছে শিশু বা কিশোর মন। পরিস্থিতি বুঝে আইনের দ্বারস্থ হওয়ার পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিভাবকেরা আক্রান্তেরই দোষ দেখছেন, বকাঝকা করছেন।
গত এক বছরে এমন বকুনির ফল হয়েছে চরম। আক্রান্তকে সুরাহা দেওয়া দূর, অপরাধের হদিসই পায়নি পুলিশ। পুলিশের কাছে মামলা আসতে আসতে দেরিও হয়ে যায়। গত এক বছরের অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ের পর্যালোচনায় এমনই তথ্য উঠে আসছে লালবাজারের পুলিশ কর্তাদের সামনে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অপরিণত মস্তিষ্কের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা করে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন পুলিশের বড় কর্তারা। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ইন্টারনেট সুরক্ষা দিবস উপলক্ষে একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা সেরে এ ব্যাপারে রিপোর্ট তৈরি করতে চাইছে পুলিশ। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করা হবে বলে কর্তাদের দাবি।
তবে শিশু, কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন অপরাধের মুখোমুখি হওয়ার ধারা নতুন নয়। কোভিড পরবর্তী সময় থেকেই স্কুল-কলেজে অনলাইনে পড়াশোনায় জোর দেওয়া হয়েছিল। তখন থেকেই বাড়তে থাকে এই অপরাধ প্রবণতা। তবে গত এক বছরে, অর্থাৎ ২০২৫ সালএই সংক্রান্ত অপরাধের অতীতের সমস্ত হিসাব ছাপিয়ে গিয়েছে বলে পুলিশের দাবি।
চিন্তা বাড়িয়েছে সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরো’ বা এনসিআরবি (২০২৩) রিপোর্ট। দেখা যাচ্ছে, ওই বছর অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের শিকার হওয়ার মামলা রুজু হয়েছিল ১ লক্ষ ৭৭ হাজার ৩৩৫টি। ২০২২ সালের থেকে যা ৯ শতাংশ বেশি! এই মামলার ৪৯ শতাংশই জানাচ্ছে,অনলাইনে শিশু, কিশোর-কিশোরীর অপরাধের শিকার হওয়ার কথা। এনসিআরবি রিপোর্ট অনুযায়ী, শিশুদের অনলাইন অপরাধের শিকার হওয়ার ঘটনাও ২০২২ সালের তুলনায় বাড়ছে। ওই রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারতের ৮৫ শতাংশ বালক-বালিকাই ‘সাইবার বুলিংয়ের’ শিকার। অনলাইনে সক্রিয় বালক-বালিকার ৪২ শতাংশই ওই মাধ্যমে যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছে।২৮ শতাংশ ব্যক্তিগত ক্ষতির হুমকি পেয়েছে।
২০২৪ সালের একাধিক শিশু, কিশোর-কিশোরীর আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনায় কলকাতা পুলিশ দেখেছে, তারা কোনও না কোনও ভাবে সাইবার অপরাধের নিশানায় ছিল। অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের যে অভিযোগ পুলিশে এসেছে, তার মধ্যে ৮-১৫ বছর বয়সিদের প্রায় ৬৫ শতাংশই অনলাইন অপরাধের শিকার। এর মধ্যে কেউ হুমকির মুখোমুখি হয়েছে, কেউ সাইবার বুলিংয়ের শিকারহয়েছে। সাইবার অপরাধের শিকারদের মধ্যে ১৩ শতাংশ শিশু, কিশোর-কিশোরী আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, সন্তান এমন কিছু ভুল পথের সম্মুখীন হয়েছে জেনেও অভিভাবকেরা পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার চেষ্টা করেননি।
লালবাজারের এক কর্তার দাবি, ‘‘এমন বেশির ভাগ ঘটনায় অভিভাবকেরা পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার বিরুদ্ধে। অথচ সন্তান কিসের মুখোমুখি হচ্ছে, তা জানতে তাঁদের পক্ষেও সর্বক্ষণ অনলাইনে নজরদারি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার সমস্যায় পড়লে বড়দেরবলে লাভ হবে না, এমনটা ভাবছে ছোটরা। এর ফল হচ্ছে মারাত্মক। কখনও শিশুটি নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছে।’’
এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অভিযোগ পেলে কোন কোন ধারায় কড়া পদক্ষেপ করা যায়, সে ব্যাপারে ভাবনা চলছে পুলিশের। লালবাজারের এক শীর্ষ কর্তার মন্তব্য, ‘‘২০২৫সালের এই সংক্রান্ত অপরাধের রেখচিত্রকে সামনে রেখে ২০২৬ সালের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের অনলাইন নিরাপত্তা এখন অন্যতম লক্ষ্য।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে