ধ্বংসস্তূপে চলছে উদ্ধারকাজ। — নিজস্ব চিত্র।
চোখের সামনে এতগুলো মানুষের উপরে হুড়মুড় করে সব ভেঙে পড়ল। কিছু ক্ষণ স্থির হয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারছিলাম না। মাথা ঘুরছিল। পরে যখন হুঁশ হল দেখলাম, কয়েকটা ছেলে আমাকে ধাক্কা দিচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে, আমি বেঁচে গেলাম কী করে? আমিও তো কয়েক মিনিট আগে ওখানেই কাজ করছিলাম!
যা দেখেছি, নিজেকে বিশ্বাস করানো কঠিন। মনে হচ্ছিল, ঠিক দেখছি তো! আমরা যারা একসঙ্গে কাজ করছিলাম, তাদের অনেকেরই তো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। কাউকে দেখলাম, লোহার পিলারের মধ্যে আটকে গিয়েছে। কারও ভাঙা পা ঝুলছে। কারও মাথা দেখলাম থেঁতলে গিয়েছে। কারও আবার শরীরের বুক থেকে নীচের অংশ বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তার মধ্যেই শুনলাম পরিচিতদের চিৎকার। সকলেই পরিত্রাণ চাইছেন। ভেঙে পড়া চাঙড়ের তলায় ছুটে বেড়ালাম বহু ক্ষণ। কেউ বলছেন, টেনে বার করার কথা। কেউ চাঙড় সরানোর চেষ্টা করতে বলছেন। কাউকে কাউকে আবার বলতে শুনলাম, ‘‘আমার হাত-পা বাদ যায় যাক, অন্তত প্রাণটা বাঁচুক। টেনে বার করার চেষ্টা করো।’’
অনেক ক্ষণ ছোটাছুটির পরে পাড়ার কিছু ছেলে এল। কয়েক জন পুলিশকর্মীও পৌঁছলেন। এর পরে সকলে মিলে উদ্ধার করার জন্য হাত লাগালাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কত জনকে বাঁচানো গেল ঠিক জানি না। রাত পর্যন্ত খবর শুনেছি, মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যেই সুন্দরবনে আমার বাড়িতেও খবর পৌঁছেছিল। সেখানে আমার দুই ছেলে, স্ত্রী, বয়স্ক বাবা-মা রয়েছেন। ছেলেদের মধ্যে একজনের বয়স সাত বছর, আর একজনের এগারো। আমার বাবা আনসার মণ্ডল শ্রমিকের কাজ করতেন। এখন আর কাজে যেতে পারেন না। আমার স্ত্রী মুর্শিদা মণ্ডল মধু সংগ্রহে যায়। ফোনে সে বলল, বাঘের মুখে পড়ার চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার ঘটে গিয়েছে। আমি যে বেঁচে আছি, সেটাই বাড়ির কেউ প্রথমে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু এই যা ঘটল, তার দায় কার? এত বছর নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছি, কখনও এ ভাবে নির্মাণকাজ হতে দেখিনি। প্রথমে তিনতলার ছাদ ঢালাই হল। এর পর একতলারটা ঢালাই হল। গত দু’দিনের বৃষ্টির পরে রীতিমতো জায়গাটা কাঁপছিল। আমাদের কাজে লাগিয়েছেন যিনি, তাঁকে বলায় বললেন, ভয় লাগলে কাজ ছেড়ে দিতে। পুরো মাসের টাকাও নাকি কেটে নেওয়া হবে। ভয় নিয়ে কাজ করতে গিয়েই আজ হয়তো এতগুলো প্রাণ চলে গেল!
(ভেঙে পড়া গুদামের নির্মাণ শ্রমিক)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে