Pahalgam Attack Victim

পহেলগাঁওয়ের ১০ মাস পার, চাকরির জন্য এখনও হন্যে হয়ে ঘুরছেন! নিহত সমীর গুহের স্ত্রী বলছেন, খোঁজই নেয়নি কেন্দ্র

সমীর কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি করতেন। গত এপ্রিলে পরিবার নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। স্ত্রী এবং কন্যার চোখের সামনে জঙ্গিরা তাঁকে গুলি করে খুন করে। ১০ মাস কেটে গিয়েছে। এখনও চাকরি পাননি সমীরের স্ত্রী।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৪
Share:

স্থায়ী চাকরির রোজগার হারিয়ে সমস্যায় পহেলগাঁওয়ে নিহত সমীর গুহের পরিবার। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

১০ মাস কেটে গিয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের ক্ষত এখনও সারেনি। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আর্থিক সাহায্য মিলেছে। কিন্তু চাকরির জন্য এখনও হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে নিহত সমীর গুহের স্ত্রী শবরী গুহকে। বেহালার পরিবার এখনও দিশাহারা। তাঁদের অবস্থার তেমন কোনও উন্নতি হয়নি গত ১০ মাসে। শবরী বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ঘটনার পর থেকে তাঁদের কোনও খোঁজই নেওয়া হয়নি!

Advertisement

সমীর কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি করতেন। গত এপ্রিলে পরিবার নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। স্ত্রী এবং নাবালিকা কন্যার চোখের সামনে জঙ্গিরা তাঁকে গুলি করে খুন করে। তাঁর মৃত্যুর পরে অথৈ জলে পড়েছিল গুহ পরিবার। বছর ছয়েক আগে কেনা ফ্ল্যাটের ঋণ পরিশোধ করতে করতেই নাভিশ্বাস উঠছিল শবরীর। সঙ্গে কন্যার পড়াশোনার খরচ। স্বামীর অফিস থেকে এখন পেনশনের টাকা পাচ্ছেন বটে। কিন্তু চাকরির নিশ্চিত আয় না-থাকায় সমস্যা হচ্ছে। দিন দিন কমে আসছে সঞ্চয়।

স্ত্রী, কন্যার সঙ্গে পহেলগাঁওয়ে নিহত সমীর গুহ। ছবি: সংগৃহীত।

স্বামীর কলকাতার অফিসেই চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন শবরী। এখনও অফিস থেকে কোনও জবাব আসেনি। একাধিক বার খোঁজ নিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের অফিস জানিয়েছে, তাঁর আবেদন দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে। এর বেশি আর কোনও তথ্য নেই! শবরীর কথায়, ‘‘এটা তো স্বাভাবিক কোনও মৃত্যু নয়! যাঁদের সঙ্গে ঘটেছে, একমাত্র তাঁরাই কষ্টটা বুঝতে পারছেন। বাকি সকলে আস্তে আস্তে ভুলে গিয়েছেন। আগে একটা চাকরি ছিল, স্থায়ী রোজগার ছিল। এখন কেবল পেনশনের ক’টা টাকা আছে। তা দিয়ে যে ভাবে চলার, সে ভাবেই সংসার চলছে।’’ আর্থিক টানাটানির কোনও প্রভাব অবশ্য কন্যার কেরিয়ারে পড়তে দিতে চান না শবরী। প্রাণপণে সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের কন্যা শুভাঙ্গী গত অক্টোবরে ১৮ বছরে পা রেখেছেন। কলকাতার এক বেসরকারি কলেজে সাইকোলজি নিয়ে স্নাতক স্তরে ভর্তি হয়েছেন। তার খরচে কার্পণ্য করছেন না মা। শবরীর কথায়, ‘‘মেয়ের ভবিষ্যৎটা নষ্ট করতে পারব না। তাই ওর পড়াশোনায় খামতি রাখতে চাই না।’’

Advertisement

পহেলগাঁও হামলায় পশ্চিমবঙ্গের তিন জন নিহত হয়েছিলেন। রাজ্য সরকার প্রত্যেক পরিবারের জন্য ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করেছিল। সেই টাকা আগেই পেয়েছেন শবরী। কিন্তু চাকরির বিষয়টি অনিশ্চিত। কেন্দ্র বা রাজ্য কোনও তরফেই সরাসরি সরকারি চাকরির কোনও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করার সময়ে বলেছিলেন, কেউ চাকরি চাইলে তাঁকে চাকরি দেওয়া হবে। শবরী অবশ্য রাজ্য সরকারের কাছে চাকরির জন্য কোনও আবেদন করেননি। আবেদন করেছেন নিহত স্বামীর অফিসে। কিন্তু ধন্দে রয়েছেন। বলছেন, ‘‘১০ মাস হয়ে গেল! আদৌ কি চাকরিটা পাব? দেওয়ার হলে কি এত দিনে দিত না? নাকি এই ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে আবেদনের জবাব আসতে এতটাই সময় লাগে?’’

সংসার চালাচ্ছেন বটে। কিন্তু টাকাপয়সা বা সরকারি সাহায্যের বিষয়ে এখনও তেমন সড়গড় নন শবরী। স্থানীয় প্রশাসনের উপর অবশ্য তাঁর কোনও ক্ষোভ নেই। গত ১০ মাসে স্থানীয় স্তরে সব রকমের সাহায্য পেয়েছেন। জানালেন, এলাকার কাউন্সিলর প্রায়ই খোঁজখবর নিয়ে যান। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এখনও তাঁদের বাড়িতে কেউ আসেননি, কেউ ফোনেও যোগাযোগ করেননি। এর আগে আনন্দবাজার ডট কম-কে শবরী বলেছিলেন, ‘‘যে ঘটনার জন্য এত কিছু বদলে গেল, এত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ওলটপালট হয়ে গেল, আমরা তার ভুক্তভোগী। আমাদের সঙ্গে তো কেউ এক বার দেখাও করল না! এনআইএ থেকে অফিসারেরা এক বার এসেছিলেন। কিন্তু সে তো তদন্তের জন্য। তার পরে আর কেউ আসেননি। আমাদের কী চাই, কেউ জানতে চাননি।’’

পহেলগাঁওয়ের ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা ২৬। অভিযোগ, পর্যটকদের মধ্যে বেছে বেছে পুরুষদের ‘টার্গেট’ করেছিল জঙ্গিরা। যাতে এক একটি হত্যা পাকাপাকি ভাবে পঙ্গু করে দেয় এক একটি পরিবারকে। ওই ঘটনার পর পাকিস্তানে সরাসরি হামলা চালায় ভারতীয় সেনা। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একাধিক পাক জঙ্গিঘাঁটি। গত মে মাসে দু’দেশের মধ্যে টানা চার দিন ধরে চলেছিল সশস্ত্র সেনা সংঘাত। কিন্তু আক্রান্তদের পরিবার এখনও সেই তিমিরেই। পহেলগাঁওয়ে নিহতদের পরিবারকে সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মহারাষ্ট্র সরকার। পুণের বাসিন্দা নিহত সন্তোষ জগদালের কন্যা আশাবরী জগদালেকে সেই চাকরির জন্য এখনও কেন্দ্র আর রাজ্যের দরজায় ঘুরতে হচ্ছে। সম্প্রতি রাজ্যসভার এক সাংসদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাতে আদৌ লাভ হবে কি না, কলকাতার সমীরের পরিবার তত দূর যেতে পারবে কি না, নিশ্চিত নয়।

হতাশ, তবু চাকরির আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারছেন না শবরী। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পাহাড়প্রমাণ চিন্তা নিয়েই মেয়েকে বড় করার স্বপ্ন দেখছেন। যে স্বপ্ন আগে স্বামীর সঙ্গে দেখতেন, এখন তা-ই দেখছেন একা একা। সমীরের বদলির চাকরি ছিল। ছুটি পেলেই সপরিবারে বেড়াতে যেতেন। বছরে এক বা একাধিক ভ্রমণ তাঁদের বাঁধা ছিল। সেই ভ্রমণই কাল হয়েছে। মিটে গিয়েছে সব সাধ। পহেলগাঁওয়ের স্মৃতি গত ১০ মাস ধরে বিষের মতো বিঁধে রয়েছে বেহালার জগৎ রায়চৌধুরী রোডের গুহ পরিবারের চৌকাঠে। চাকরির আবেদনের ইতিবাচক উত্তর কিছুটা হলেও চাপমুক্ত করতে পারে শবরীদের। কিন্তু তাঁদের দিকে কেন্দ্রীয় সরকার ফিরে তাকালে তো!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement