এই গাড়িতেই হয়েছিল গণধর্ষণ।
দিনে জিমে গিয়ে ঘাম ঝরানো, রাতে উদ্দাম পার্টি। নেশা-নাচা-গানায় ভরপুর মৌজ-মস্তি।
কলকাতায় থাকতে এই ছিল তার রোজকার রুটিন। পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণের পরে ফেরার হয়েও বেনিয়াপুকুরের কাদের খান সে অভ্যেস পাল্টায়নি বলে পুলিশ জেনেছে। তদন্তকারীরা বলছেন, আত্মীয়-পরিজনের বাড়িতে গা ঢাকা দিয়ে থাকাকালীনও কাদের খান নিয়মিত দিনের বেলা শরীরচর্চা করে গিয়েছে। রাত রাত নামলেই সপার্ষদ হাজির হয়েছে বাছাই পার্টিতে। নৈশ মৌতাতে ভাসিয়ে দিত নিজেকে।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নাইটক্লাব থেকে গ্রেটার নয়ডার ডেরায় ঢোকার সময়ই কাদের পুলিশের জালে ধরা পড়েছে। তবে ফেরার থাকাকালীন সে নিজের নাম তো বটেই, চেহারা, এমনকী চালচলনও বেবাক পাল্টে ফেলেছিল।
কী রকম? গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, সমস্তিপুর বা গাজিয়াবাদের আস্তানায় কাদের পরিচিত ছিল ‘বড়া মামু’ নামে। আর তার খুড়তুতো ভাই, তথা পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত মহম্মদ আলি ছিল ‘ছোটা মামু।’ কলকাতার ‘ক্লিন শেভ্ড’ কাদের পুলিশকে ধোঁকা দিতে মুখে ঢেকেছিল চাপ দাড়িতে। সম্পন্ন ব্যবসায়ী পরিবারের যে ছেলে একদা দামি গাড়ি বা মোটরবাইকে সওয়ার হয়ে কলকাতা দাপিয়ে বেড়িয়েছে, গত সাড়ে চার বছর সে যাতায়াত করেছে ট্রেনের জেনারেল কম্পার্টমেন্টে চড়ে। ভুলেও নিজের কাছে কোনও পরিচয়পত্র রাখেনি। আগে কাদেরের মুঠোয় ঘুরত নামী ব্র্যান্ডের মহার্ঘ মোবাইল ফোন। ফেসবুকে হাজিরা দিত নিয়মিত। ‘‘কিন্তু এই সাড়ে চার বছরে ও পারতপক্ষে মোবাইল ছোঁয়নি। ই-মেল বা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটও এড়িয়ে চলেছে।’’— মন্তব্য এক তদন্তকারীর।
কাদেরের বয়স এখন পঁয়ত্রিশ। গোয়েন্দা-সূত্রের খবর: একটা সময়ে টলিউডের এক অভিনেত্রীর সঙ্গে তার প্রেম ছিল। দু’জনের বিয়ে প্রায় পাকা হয়ে যায়। পার্ক স্ট্রিট-কাণ্ডের পরে কাদের যখন কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে মুম্বইয়ের এক হোটেলে, তখনও অভিনেত্রীটি তাঁর সঙ্গে ছিলেন বলে গোয়েন্দাদের দাবি। পুলিশ খবর পেয়ে ওখানে হানা দিয়েও কাদেরকে ধরতে পারেনি। তবে দু’জনের এক সঙ্গে থাকার প্রমাণ হিসেবে তদন্তকারীরা হোটেলটির রেজিস্টার কোর্টে জমা দেন। পাশাপাশি অভিযোগ ওঠে, ওই নায়িকার সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রেই পলায়নপর্বের গোড়ায় কাদের শাসকদলের কিছু নেতা ও পুলিশের একাংশের মদত পেয়েছে। পুলিশ অবশ্য এ-ও জানাচ্ছে, বেশ কিছু কাল দু’জনের কোনও যোগাযোগ নেই।
ঘটনা হল, পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণের আগেই কাদের খানের নাম জড়ায় একাধিক ফৌজদারি মামলায়। পার্টিতে গিয়ে কয়েক জনকে মাদকের ঠেকে নিয়ে যাওয়া ও পরে তাদের ব্ল্যাকমেল করার নালিশও মজুত। লালবাজারের খবর: ২০০৭-এ গুন্ডামির মামলায় গ্রেফতার হয়ে জামিনে ছাড়া পাওয়ার পরে পুলিশের একাংশের সঙ্গে কাদেরের ‘মাখামাখি’র সূত্রপাত। তখন সে গুন্ডাদমন শাখার এক অফিসারের ‘সোর্স’ হিসেবে কাজ করত। পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডের পরে কাদের যে ভাবে চম্পট দেয়, তার নেপথ্যে ওই অফিসারের ‘ভূমিকা’ সম্পর্কেও লালবাজারের অন্দরে জল্পনা কম নেই। এক গোয়েন্দা-অফিসারের কথায়, ‘‘মুম্বইয়ের হোটেলে পুলিশ পৌঁছনোর স্রেফ দশ মিনিট আগে কাদের হাওয়া হয়ে গেল! এতেই সন্দেহ জাগে, ভূত কি ছিল সর্ষের মধ্যেই?’’
বস্তুত সেই ইস্তক পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণের চাঁইয়ের খোঁজে হন্যে হয়ে ফিরেছে পুলিশ। ২০১৪-য় কাদেরের বাবা মারা যান। ২০১৫-য় মা। দু’বারই গোয়েন্দারা ভেবেছিলেন, এ বার কাদের বাড়ি ফিরবে। তাঁরা তক্কে-তক্কে থাকেন। কিন্তু অপেক্ষাই সার, ছেলে বাড়িমুখো হয়নি।
শেষমেশ কাদেরের ‘দুর্বলতা’ই তাকে ফাঁদে ফেলেছে। দুর্বলতা, মানে নাইটক্লাব। সাড়ে চার বছর আগে পার্ক স্ট্রিটে এক নাইটক্লাব থেকে বেরিয়ে তারা গণধর্ষণ করেছিল। সাড়ে চার বছর বাদে গ্রেটার নয়ডায় ‘নাইটক্লাব ফেরত’ কাদের খানকেই জিম্মায় নিয়েছে কলকাতার পুলিশ।