কালীঘাট মন্দিরের পাশে আদিগঙ্গায় এক সময় নৌকার ভাড়া ছিল আট আনা। মালবাহী নৌকায় নানা পণ্য পৌঁছে যেত টালিগঞ্জ, গড়িয়া, চেতলার বাজারে। আদিগঙ্গার জলেই মন্দিরের ভোগ রান্না হত, স্থানীয় মানুষ সেই জল পানও করতেন। খানিক দক্ষিণে পাঁচপোতা অঞ্চলে সেই জলেই মিলত সুস্বাদু মাছ, কাঁকড়া। পুলিন সরদার, অজয় দাসের মতো বহু মানুষের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল সেই সব দিন।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, কলকাতার ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে জড়িয়ে আছে পুরনো নানা খাল ও বিস্তীর্ণ জলাভূমি। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে ব্রিটিশ কলকাতার সঙ্গে সুন্দরবন ও পূর্ববঙ্গের সংযোগ রক্ষায় এই খালপথগুলিই ছিল প্রধান বাণিজ্যপথ। পরবর্তী কালে নতুন নতুন খাল যুক্ত হয়ে এই জলপথ-ব্যবস্থা জলাভূমিবেষ্টিত এক গ্রাম্য জনপদকে ব্রিটিশ ভারতের ব্যস্ততম অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করে।
সময়ের বিবর্তনে কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের এই পুরনো খাল ও জলাভূমিগুলো নির্বিচারে বুজিয়ে ফেলায় শহরের প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থায় চরম এক বিপর্যয় নেমে এসেছে। মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র আর জীববৈচিত্র। এই পরিপ্রেক্ষিতে, পুকুর ও খাল-সহ শহরের জলসম্পদের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করে চলেছে ‘জলাদর্শ কালেক্টিভ’। তথ্য সহায়ে, বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পেরও নানা আঙ্গিক ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এই কাজে শামিল করতে সচেষ্ট তাদের সদস্যেরা।
এই উদ্দেশ্যেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আগামী ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তাদের আয়োজনে চলছে ছবি, মানচিত্র ও তথ্যপঞ্জি দিয়ে সাজানো প্রদর্শনী, ‘টুওয়ার্ডস সাসটেইনেবল ফ্লোজ়’। প্রদর্শনীর পাশাপাশি, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রবীণ বাসিন্দাদের স্মৃতিকথায় আদিগঙ্গা ও সার্কুলার খালের সে কাল-এ কাল জীবন্ত হয়ে উঠবে। সঙ্গে থাকবে জলাশয়ের স্মৃতিবাহী কলকাতার বিভিন্ন স্থানের নামকরণের ইতিহাসের আলোচনাও।
চড়িয়াল খাল, ধানখেতি খাল, মণি খাল, এসডব্লিউএফ এবং ডিডব্লিউএফ চ্যানেলের ইতিকথা নিয়ে সেজে উঠবে মার্চের ১ থেকে ১৪ তারিখের প্রদর্শনী। এই পর্বে থাকবে ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে সংগৃহীত তথ্য ও মানচিত্র। ১৫ থেকে ২৮ মার্চের সূচিতে গুরুত্ব পাবে কেওড়াপুকুর খাল, টলি-পঞ্চান্নগ্রাম ও বাগজোলা খালের অতীত-বর্তমানের চালচিত্র। সঙ্গে থাকবে জলাভূমির অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অবস্থার উপরে আঁকা চিত্রপ্রদর্শনী (সঙ্গের ছবি)। ১ থেকে ১৪ এপ্রিল সমাপনী পর্বে ছবির প্রদর্শনীটি চলবেই— তার সঙ্গে থাকবে আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্মৃতিকথার ঝাঁপি।
প্রদর্শনী ও অনুষ্ঠানের কেন্দ্র গল্ফ গ্রিনের ‘ট্রাভেলিস্তান ক্যাফে’। সকাল ১১টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনীর সঙ্গে থাকছে আরও কিছু অভিনব উদ্যোগ। ১ মার্চ জলাভূমি সফরের মাধ্যমে উৎসাহীরা এই বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় করতে পারবেন। শেষ সপ্তাহে থাকবে জলাভূমির নিজস্ব খাবারের আস্বাদ নেওয়ার ব্যবস্থাও। দু’মাস ব্যাপী নানা উদ্যোগের বিশদ তথ্য পাওয়া যাবে ‘জলাদর্শ কালেক্টিভ’-এর ফেসবুক পেজেও।
পুরোধা
রেলগাড়ির রাজকীয় চলনে মুগ্ধ সুকুমার সেন (ছবি) শৈশবে বলেছিলেন, বড় হয়ে তিনি ইঞ্জিন ড্রাইভার হবেন। বাস্তবে তাঁর অনন্য মেধা ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসকে চালিত করে নতুন পথে, হয়ে ওঠেন ভারতে তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার পুরোধা। তাঁর বিদ্যাচর্চা ধাবিত নানা দিকে: পাঁচ খণ্ডের বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ কীর্তি; গোয়েন্দাকাহিনি, ভূত, বটতলা নিয়েও সমান উৎসাহী ছিলেন: ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি, গল্পের ভূত, বটতলার ছাপা ও ছবি প্রমাণ করেছে তাঁর গবেষণার বহুমুখ। আলাদা করে বলতে হয় ব্যুৎপত্তি সিদ্ধার্থ শব্দকোষ-এর মতো আকরগ্রন্থ, আত্মজীবনী দিনের পরে দিন যে গেল-র কথা। তাঁর জন্মের ১২৫ বছর পেরোল, এই উপলক্ষে ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুর ৩টেয় বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ’এর আয়োজনে অনুষ্ঠান, পরিষৎ-সভাঘরে। আচার্যের ভাষাতত্ত্ব, রবীন্দ্রচর্চা ও ইতিহাসচেতনা নিয়ে বলবেন উদয়কুমার চক্রবর্তী অমল পাল ও সুনন্দনকুমার সেন, সভামুখ্য রতনকুমার নন্দী।
তৃতীয় পথ
সাহিত্য, সাংস্কৃতিক তত্ত্ব, অর্থনীতির ইতিহাসের সেতু জোসেফ ফোগল। লিখেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ বই: অন ট্যারিইং-এর ইংরেজি অনুবাদটি (সিগাল বুকস) খ্যাত। পাশ্চাত্যে বহু যুগলালিত সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার বৈপরীত্যের ধারণার বাইরে বেরিয়ে এই চিন্তক বলেন এক তৃতীয় পন্থার কথা, ‘ট্যারিইং’। এই চিন্তাধারা জাগতিক জীবনে যুক্ত হতে অস্বীকার করে না, আবার সহজ প্রতিরোধের কৌশল হিসেবেও কাজ করে না; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রথাগত বাঁকগুলিকে বিলম্বিত, বর্ধিত বা স্থগিত করার চেষ্টা করে। ফ্রয়েড সোফোক্লিস মুসিল কাফকা তাঁর ভাবনার প্রেরণা। ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুর ৩টেয় প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে বলবেন তিনি, গ্যেটে ইনস্টিটিউট-ম্যাক্স ম্যুলর ভবন, সিগাল বুকস, প্রেসিডেন্সি এবং সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের উদ্যোগে।
সংস্কৃতি ঘিরে
গত তিন বছরের মতো এ বছরও যাপনচিত্র পত্রিকা আয়োজন করছে উৎসব। এ বার সঙ্গী কলকাতা আন্তর্জাতিক শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (কিফাল্ক)। শুধু সাহিত্য নয়, সংস্কৃতির নানা পরিসর মিলে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক উৎসব। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ কিফাল্ক সেন্টার, নন্দন-৩, ক্যালকাটা ক্লাব আর শিশির মঞ্চ উৎসবস্থল: হবে শিল্প কর্মশালা, শিল্প প্রদর্শনী, জনজাতি নৃত্য, স্কুলপড়ুয়াদের তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবির উৎসব, ছবি নিয়ে আলোচনা, দস্তানগোই, ভারতীয় সাহিত্য থিয়েটার ও শিল্প নিয়ে কথালাপ, ব্যান্ড সঙ্গীত, কবিতাপাঠ। পোল্যান্ড ও মিশর থেকে আসছেন কবি-লেখকেরা, দেশের নানা প্রান্ত থেকেও। ভারতীয় কবিতা, বাংলা কবিতা ও গ্রন্থপ্রচ্ছদের জন্য সম্মাননা অর্পণ করবেন উদ্যোক্তারা, এক জন তরুণ শিল্পী পাবেন বার্ষিক বৃত্তি।
কোন পথে
সাইবার-অপরাধ ও ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণার জেরে সাধারণ মানুষ শিকার হচ্ছেন আর্থিক ক্ষতি, সামাজিক অসম্মান, মানসিক বিপর্যয়ের। এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, অপরাধের সম্ভাব্য পথ চিহ্নিত করা ও তা প্রতিরোধের সুরাহাই এখন দরকার। এই ভাবনা থেকেই একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে প্রকাশনা সংস্থা ‘এলএফ বুকস ইন্ডিয়া’, আজ শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় নিউ টাউন রবীন্দ্রতীর্থ প্রেক্ষাগৃহে। থাকবেন জহর সরকার; কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম সেল-এর আধিকারিক এবং সাইবার-নিরাপত্তাক্ষেত্রে কর্মরত বিশিষ্টজন আলোচনা করবেন। প্রকাশ পাবে গল্প-সঙ্কলন সাইবার ক্রাইম ডায়েরি।
দেশ-মহাদেশ
ফোরাম ফর ফিল্ম স্টাডিজ় অ্যান্ড অ্যালায়েড আর্টস এবং এনইজ়েড ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজন, ‘ফেস্টিভ্যাল অব ফাইভ কন্টিনেন্টস’। ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আইসিসিআর-এর সত্যজিৎ রায় প্রেক্ষাগৃহে গুণিজনসমাগমে সপ্তাহব্যাপী উৎসবের শুরু। ১ মার্চ অবধি, প্রতিদিন বেলা ১২.৪৫-রাত ৯টা দেখানো হবে পাঁচ মহাদেশের প্রতিনিধি দু’ডজনেরও বেশি ছায়াছবি। ‘সিনেমা ইন্টারন্যাশনাল’ বিভাগে ডমিনিকান রিপাবলিক, গ্রিস, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, দক্ষিণ কোরিয়া-সহ আরও অনেক দেশের সমাজ ও জীবনের গল্প, কিংবদন্তি জাপানি চলচ্চিত্রকার নাগিশা ওশিমার সিনে-দর্শন ফিরে দেখা তাঁরই কাজের মধ্য দিয়ে, অন্যধারার ছ’টি ভারতীয় ছবিও আছে। গৌতম ঘোষের জীবনকৃতি নিয়ে তথ্যচিত্র, সঙ্গে রেট্রোস্পেক্টিভ বিভাগে তাঁর ছবিগুলির রেস্টোর্ড ভার্সন দেখার সুবর্ণসুযোগ।
উত্তরের খোঁজে
গঙ্গা ও তার ঘাটগুলোর হরেক মুহূর্তের দৃশ্য, উত্তর কলকাতার অলিগলির আলো-আঁধারি, বাড়ির রোয়াকে থমকে যাওয়া সময়, কোলাজে অগণিত মুখ ও মেজাজ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এ শহরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রূপ, আবার রাস্তায় আধুনিক পরিবহণের মাঝে ঘোড়াগাড়ি আর হাতে-টানা রিকশা মনে করায় শাশ্বত, আবহমান কলকাতাকে। নর্থ কলকাতা: সোল অব হেরিটেজ (প্রকা: এইচটুও পাবলিকেশন) সঙ্কলনে ১৯ জন আলোকচিত্রীর তোলা একশোরও বেশি আলোকচিত্রে কোথাও প্রতিফলিত উত্তর কলকাতার চেনা মুখ, কোথাও বা অ-দেখা চেহারা— সাদা-কালোয় (শুভ্রজিৎ সরকারের ছবিতে শোভাবাজার-লাল মন্দির এলাকা)। বিশিষ্ট আলোকচিত্রী রাজীব দে ও দেব লাহিড়ির দেখানো পথে হেঁটেছেন ‘উইন্ডো ফোটোগ্রাফি স্কুল’-এর সদস্যেরা, ক্যামেরার লেন্স পেরিয়ে মনের চোখ দিয়ে ছুঁতে চেয়েছেন উত্তর কলকাতার নাড়িটি।
আত্ম-সন্ধান
“আমার মৃত্যুর পর/ আমাকে যেন কবর দেওয়া হয়,/ আমি মাটি ফুঁড়ে গাছ হবো।/ বাঁশগাছ হয়ে ঝুঁকে দেখবো—/ এই রবিশস্যের দেশ!” এই উচ্চারণ কবির। আবার তিনিই যখন হাতে নেন রং-তুলি, তখন ক্যানভাসে যে আত্মপ্রতিকৃতি ফুটে ওঠে সেও তো মানুষী রূপ নয় কোনও, রঙে আলোয় জেগে ওঠা বাঁশের পত্রগুচ্ছ (ছবি)! কবি, চিত্রশিল্পী শ্যামলবরণ সাহার সাম্প্রতিক চিত্রকৃতি নিয়ে প্রদর্শনী বিড়লা অ্যাকাডেমিতে, ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ; শিরোনাম, ‘ইনার রিদম অব সেল্ফ স্পাইন অ্যান্ড লিরিক্যাল ড্রয়িংস’। আশির দশকে কলেজ অব ভিসুয়াল আর্টস-এ চিত্রকলার পাঠ, পাশাপাশি কবিতা লেখা গড়ে দিয়েছে তাঁর শিল্পবোধ, সেই চর্চাই চলেছে কয়েক দশক। ষাটের কোঠায় এসে সেই বোধেরই প্রকাশ ঘটেছে জলরঙে আঁকা সাম্প্রতিক চিত্রকৃতিতে। সেগুলি নিয়েই একক চিত্রপ্রদর্শনী।
শিল্পের প্রতিরোধ
একুশ শতকে নারীবাদ একস্তরী নয়, লিঙ্গ-নির্বিশেষে এই ভাবনায় বিশ্বাসী সবাইকে একত্র করার প্রয়াস সেখানে। আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পাশাপাশি প্রজনন অধিকার ও পরিবেশ রক্ষার মতো বিষয়ও এখন এই ভাবনাবৃত্তের অংশ। বিশ্বের নানা প্রান্তে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নারীবাদী লড়াইয়ের চালচিত্র সম্প্রতি ফুটে উঠেছে শহরে এক প্রদর্শনীতে, চিত্রকলা ফোটোগ্রাফি প্রিন্ট প্রোজেকশন ইনস্টলেশন ও ভিডিয়োয় দেখানো হচ্ছে ৩১ জন আন্তর্জাতিক নারীবাদী শিল্পীর কাজ; ব্যক্তিগত, সামাজিক ও বৈশ্বিক সঙ্কটের মুখে সচেতনতা ও প্রতিরোধের বয়ান। উটা রুহকাম্প ও স্যান্ডবক্স কালেক্টিভ-এর কিউরেশনে প্রদর্শনী ‘এমপাওয়ারমেন্ট’ চলছে গ্যেটে ইনস্টিটিউট-ম্যাক্স ম্যুলর ভবনে, তাদেরই আয়োজনে; ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত, রবিবার ও ছুটির দিন বাদে রোজ সকাল ১১টা-সন্ধ্যা ৭টা।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে