পার্ক সার্কাস ময়দানে জমায়েতের প্রস্তুতি। বুধবার। —নিজস্ব চিত্র।
দুপুরে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণ কনভেনশনে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে ডাক দিয়েছিলেন তাঁরা। সেখানে দানা বাঁধা সঙ্কল্পই ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল পার্ক সার্কাসের মাঠে। ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চে আলিয়ার বিভিন্ন শিক্ষক, প্রাক্তনী থেকে শুরু করে সমাজের নানা ক্ষেত্রের মানুষজন বুধবার সন্ধ্যাতেই পার্ক সার্কাসের মাঠে অবস্থানের তোড়জোড় শুরু করে দিলেন। এ দিনের কর্মসূচি অনেককেই ছ’বছর আগের নাগরিকত্ব আইন-বিরোধী আন্দোলনের দিনগুলি মনে করিয়েছে। দিল্লির শাহিনবাগের পথ ধরে তখনও পার্ক সার্কাস-সহ কলকাতার নানা প্রান্তে গণ অবস্থান ছড়িয়েছিল। সে বার সাধারণ ঘরের মুসলিম মহিলারাই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন। গত শনিবার প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ৬০ লক্ষের বেশি নাম বিবেচনাধীন থাকার পরে নানা মহলেই প্রতিবাদের আঁচ টের পাওয়া গিয়েছে। গড়ে উঠছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর বা হাই কোর্টে দরবার করতে সক্রিয় একাধিক মঞ্চ।
আলিয়ার গণ সম্মেলনের মঞ্চে বার বারই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যা করণীয়, করার কথা বলা হয়। সম্মেলনের পুরোভাগে থাকা মুখগুলির মধ্যেও অনেকেই নিজের বা তাঁর আত্মীয়-পরিজনের ভোগান্তি নিয়ে সরব হয়েছেন। আলিয়ার বাংলার অধ্যাপক সাইফুল্লা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার আশফাক আলির নাম বিবেচনাধীন তকমা পেয়েছে। সাইফুল্লা উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর এলাকার বাসিন্দা। তিনি গুমার ভোটার। তিনি বলেন, ‘‘আমার নাম শুধুমাত্র সাইফুল্লা। সব নথিতে তা-ই আছে। ২০০২-এর তালিকায় ভুল করে আমার নাম সামফুল্লা মণ্ডল লেখা হয়। কমিশনের নির্দেশমাফিক সেটা ঠিক করার সব রকম চেষ্টা করেছি। তবু শেষ পর্যন্ত আমার নামটাই বিবেচনাধীন রয়ে গেল।’’ আশফাক আলি ২০০২-এ মেদিনীপুরের ভোটার ছিলেন, এখন কসবা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার। তাঁর বাবার নামের সঙ্গে নিজের নাম কোনও অদ্ভুত কারণে মিলছে না বলে কমিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মনে হয়েছে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচ ডি তানিয়া পরভিন রাজারহাটে থাকেন। বেঙ্গল অ্যাকাডেমিয়া ফর সোশ্যাল এমপাওয়ারমেন্টের সদস্যা তরুণী বললেন, তাঁর দাদিমার (ঠাকুরমা) নামও ভোটার তালিকায় নেই।
এ বারের ভোটার তালিকায় বিবেচনাধীনদের মধ্যে মুসলিম মেয়েদের নামই দলে ভারী। কিন্তু সমাজের অন্য নানা গোষ্ঠীর দুরবস্থাও সামনে আসছে। কারিগরদের একটি সংগঠনের হয়ে বিশ্বেন্দু নন্দ বলছিলেন, ‘‘সামাজিক পরম্পরায় হস্তশিল্পী, অল্প শিক্ষিত ডিগ্রিহীন অনেকের পক্ষেই কাগজ দিয়ে নিজের পরিচয় প্রমাণ করা মুশকিল।’’ হকারদের একটি সংগঠনের নেতা হিমাদ্রি মুখোপাধ্যায়, নো এনআরসি মুভমেন্ট-এর বিপ্লব ভট্টাচার্যও ছিলেন। আলিয়ার ইসলামিক স্টাডিজ়ের অধ্যাপক মহম্মদ শামিম আখতার আগে বিহারের দারভাঙায় থাকতেন। এখন পশ্চিমবঙ্গেরই ভোটার। তাঁর নামও আছে বিবেচনাধীনের তালিকায়। শামিম বললেন, ‘‘বিএলও-কে নথি জমা দেওয়ার পরে কোনও রসিদের বন্দোবস্ত ছিল না। তিনি কী জমা দিচ্ছেন, তা যাচাই করার কী ব্যবস্থা ছিল, জানি না। নানা রকম অব্যবস্থা এবং তাড়াহুড়োর ফলেই এত জনের ভোগান্তি পরিস্থিতি তৈরি হয়।’’ আলিয়ার প্রাক্তনী, সংবিধান বাঁচাও মঞ্চ নামে একটি মানবাধিকার সংগঠনের সদস্য সাজিদ রহমান বলছিলেন, ‘‘আমরা রাস্তায় নামব, তবে শান্তিপূর্ণ ভাবে।’’
প্রতিবাদীদের তরফে সম্মেলনে ঠিক হয়, আগামী সোমবার, ৯ মার্চ কমিশনের ফুল বেঞ্চ কলকাতায় এলেও তাঁদের সামনে প্রতিবাদ করা হবে। কমিশনের দফতরের সামনেও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা অবস্থান শুরু হতে পারে। এ দিন সন্ধ্যায় ইফতারের পরেও প্রতিবাদীরা পার্ক সার্কাসের মাঠে আসতে শুরু করেন। আনুষঙ্গিক বন্দোবস্ত করে রাত আটটার পরে সবাই গণ অবস্থানে বসেন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে