মথুরাপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
মথুরাপুরের গোপীনাথপুরের মাঠ থেকে অভিষেক বলেন, ‘‘এ বার যে বুথে ২০০ লিড আছে, সেটা ৪০০ করতে হবে। যে বিধানসভায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধান রয়েছে সেখানে ৭০ হাজার করতে হবে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এমন অনেক বিধানসভা রয়েছে, যেখানে প্রায় এক লক্ষের বেশি ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছি আমরা। সেখানে ১০টি ভোট হলেও বেশি ভোট পেতে হবে এ বার। তবে এটা শুধু তৃণমূলের জয়ের জন্য নয়, এটা প্রতিরোধের ভোট, শিক্ষা দেওয়ার ভোট। প্রতিরোধের ভোট।’’ অভিষেক এ-ও বলেন, ‘‘আমার যত টুকু সামর্থ, এক্তিয়ার রয়েছে, আমি আমার মতো করে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অঞ্চলে অঞ্চলে জল-কল, রাস্তা পৌঁছে দিয়েছে। গত বার জেলায় ৩০-১ ছিল। এ বার ৩১-০ ফল করতে হবে। তার জন্য সমস্ত উন্নয়নের দায়ভার আমি আমার কাঁধে নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা শুধু ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করুন।’’
এসআইআর ইস্যুতে মন্তব্য অভিষেকের। তিনি বলেন, ‘‘৬০ লক্ষ মানুষকে এসআইআরে বিবেচনাধীন করেছে। ভোট দিতে দেবে না! কারণ, ভোট দিলে যদি তৃণমূলকে ভোট দেয়! এদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভাবে জবাব দিয়ে অন্ধকার করে দিতে হবে।’’
‘‘প্রধানমন্ত্রী বসে। রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে। আমরা নাকি রাষ্ট্রপতিকে অপমান করছি!’’ ছবি দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি বনাম রাজ্য সরকারের বিতর্কে অভিষেকের মন্তব্য। তিনি বলেন, ‘‘এটা পিআইবি-র পোস্ট করা ছবি। আমার নয়। রাষ্ট্রপতিকে অপমান কে করছেন? দেশের অপমান কে করছেন? দেখুন।’’ পাশাপাশি মণিপুরে হিংসার ঘটনায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কোনও মন্তব্য বা বিবৃতি মেলেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অমিত শাহকে নিশান করে বলেন, বাংলার বাজেটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সপ্তম পে কমিশনের কথা বলেছেন।
‘‘যাঁরা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন, তাঁরা রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া। রাজনীতির মানে মানুষের উন্নয়ন। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, পানীয় জলের ব্যবস্থা করা।’’ ফের অমিত শাহকে উদ্দেশ্য করে অভিষেক বলেন, ‘‘আমি ১২ বছরের সাংসদ। আমি আজ পর্যন্ত আমার লোকসভা কেন্দ্রের বাইরে কোনও সরকারি অনুষ্ঠানে যাইনি। আজ পর্যন্ত কোনও শিল্প সম্মেলনে যাইনি। কোনও খেলা-মেলায় যাইনি। কোনও ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, সরকারি পরিষেবা প্রদান অনুষ্ঠানে যাইনি। আমি জানি, একজন জনপ্রতিনিধি হতে গেলে তাঁকে অনেক বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হয়। আমি জানতে চাই, অমিত শাহ আপনার ছেলে কোন অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে আইসিসি-র প্রেসেডিন্ট হয়েছে মানুষকে বলুন। আপনার দলের লোকেরা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে দালাল বলছে!’’
যে স্থানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সভা করে গিয়েছেন গত ২ মার্চ, সেখানে রবিবার সভা করেন অভিষেক। তিনি শাহের সভার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘‘তাঁর বক্তব্য আমি শুনেছি। তিনি ৩০ মিনিট বক্তব্য রেখেছেন। আমি অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে দেখছিলাম। কারণ, মাঠের যা পরিস্থিতি ছিল আর এঁদের (বিজেপি) ‘পরিবর্তন যাত্রা’য় যা ভিড় হচ্ছে, তার থেকে জেসিবি দিয়ে যেখানে মাটি কাটা হয়, সেখানে লোক জড়ো হবে। এর চেয়ে চায়ের দোকানে লোক বেশি হয়।’’ তিনি শাহের সভার ভিড়ের সঙ্গে তাঁর সভার ভিড়ের তুলনা টেনে সংবাদমাধ্যমকে আবেদন করেন উপস্থিত জনতার ছবি দেখানোর জন্য। অভিষেক কটাক্ষের সুরে বলেন, ‘‘চার দিনের ব্যবধানে তৃণমূল সভা করেছে। ট্রেলারটা দেখালাম। সিনেমাটা দেখবেন, মে মাসে যে দিন ভোটের ফল বেরোবে।’’ শাহকে নিশানা করে অভিষেক আরও বলেন, ‘‘সভা করতে এসে উনি একাধিক তথ্য-পরিসংখ্যান দিয়েছেন। আমি পাল্টা কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান নিয়ে এসেছি। এগুলো আমাদের সরকারের নয়, এগুলো কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। হতেই পারে দেশের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয় না। হতেই পারে অর্থসচিবের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় না, কথাও হয় না। দেশের আর্থিক দুরবস্থা এবং পরিস্থিতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো জানেন না। কিন্তু ২ তারিখের সভা থেকে উনি বলেছেন বাংলার ঋণের পরিসংখ্যান ৮ লক্ষ কোটি টাকা। কোনও শিশু যদি বাংলায় জন্মায়, তার মাথার উপরে থাকছে ৭৭ হাজার টাকার ঋণ। আমি আপনাদের তথ্য দিচ্ছি শুনুন— ২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে দেশের ঋণের পরিসংখ্যান ছিল ৫৬ লপক্ষ কোটি টাকা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভারতবর্ষের ঋণের পরিমাণ ১ লক্ষ ৯৭ হাজার ১৯৭ লক্ষ কোটি টাকা! একটা শিশু ভারতে জন্মালে তার মাথায় ঋণের বোঝা ১ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা। এর দায় একমাত্র নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের।’’
অভিষেকের দাবি, বিজেপির কোনও সভায় লোক হচ্ছে না। রথযাত্রাও ‘ফ্লপ’। তিনি বলেন, ‘‘আমি তো বিধানসভা নির্বাচনে ওদের পঞ্চাশের নীচে নামাব বলেছি। কিন্তু দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩১-০ করার দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে।’’ তাঁর কটাক্ষ, ‘‘এমন রথযাত্রার অবস্থা, ড্রাইভার আর উপরে হাত নাড়ার চারটে লোক ছাড়া আর লোক নেই। বাংলায় এসআইআর করতে গিয়ে বিজেপিতে এসআইআর হয়ে গিয়েছে। বাংলার মানুষের অধিকার কাড়তে গিয়ে নিজেদের কবর নিজেরা খুঁড়েছে।’’
বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে মহিলা নির্যাতনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে মন্তব্য করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিশানা করেছেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তাঁর হাতে। তাঁরই অধীনস্থ এনসিআরবি-র যে তথ্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বলা হচ্ছে, মহিলাদের উপর নির্যাতন এবং অপরাধে দেশের একনম্বর স্থানে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, দু’নম্বর স্থানে রয়েছে মহারাষ্ট্র, তিন নম্বর স্থানে রয়েছে রাজস্থান। মহিলাদের উপর অপরাধে ফার্স্ট প্রাইজ় বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকারের, সেকেন্ড প্রাইজ় বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার, থার্ড প্রাইজ়ও বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকারের।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘ধর্ষণেও গোল্ড মেডেল বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকারের। সিলভার মেডেল, ব্রোঞ্জ মেডেলও ডবল ইঞ্জিন সরকারের।’’
নারীদিবসে অভিষেক মথুরাপুর থেকে বলেন, ‘‘দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা থেকেও দু’জন মহিলাকে সাংসদ করেছেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষের আশীর্বাদকে পাথেয় করে প্রতিমা মণ্ডল এবং সায়নী ঘোষ সাংসদ হয়েছেন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘এখানে চার জন সাংসদের দু’জন মহিলা। জেলা পরিষদের সভাধিপতি মহিলা। একাধিক পঞ্চায়েতে প্রধান, উপপ্রধান মহিলা। যে সংখ্যক মা-দিদি এবং বোনেদের উপস্থিতি লক্ষ্য করছি, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাঁদের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। না জাগিলে ললনা এ বিশ্ব জাগে না। নারীশক্তি, মাতৃশক্তি যদি কারও সঙ্গে থাকে, তাকে কোনও দিন কেউ হারাতে পারে না। আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তিন দিন ধরে কলকাতার রাজপথে ধর্নায় বসেছেন মানুষের স্বার্থে।’’ উল্লেখ্য, এসআইআর ইস্যুতে তৃণমূলের ধর্নার তৃতীয় দিন রবিবার। অন্য দিকে, মথুরাপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সভা করছেন। মন্দিরবাজার বিধানসভার ওই জায়গাতেই পাঁচ দিন আগে সভা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।