Advance excise duty collection mandatory

রাজ্যের শুল্ক মেটাতে হবে অগ্রিম, মমতা জমানার বাড়তি সুবিধা পাবেন না মদের সরবরাহকারীরা, আবগারি দুর্নীতি রুখতে কড়া শুভেন্দুর সরকার

আগামী সোমবার রাজ্য বিধানসভায় বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। তার আগে রাজস্ব বৃদ্ধির এ হেন পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন প্রশাসনিক কর্তারা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ ২১:২৮
Share:

—প্রতীকী ছবি।

পশ্চিমবঙ্গে মদ বিক্রি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। আগামী ২৫ জুন, ২০২৬ থেকে রাজ্যে কার্যকর হতে চলেছে আবগারি শুল্ক সংগ্রহের নতুন নিয়ম। অর্থ দফতরের নির্দেশিকা অনুযায়ী, এ বার থেকে প্রস্তুতকারক সংস্থা, ব্রুয়ারি বা বটলিং প্ল্যান্ট থেকে কোনও পণ্য সরানোর আগেই সংশ্লিষ্ট আবগারি শুল্ক এবং অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক সম্পূর্ণ ভাবে জমা দিতে হবে। ফলে মদ সরবরাহ ও বণ্টন ব্যবস্থায় আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে চলেছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। প্রসঙ্গত, আগামী সোমবার রাজ্য বিধানসভায় বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। তার আগে রাজস্ব বৃদ্ধির এ হেন পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন প্রশাসনিক কর্তারা।

Advertisement

এই বিষয়ে শুক্রবার সল্টলেকের ‘শুভান্ন’ ভবনে অবস্থিত ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বেভারেজেস কর্পোরেশন লিমিটেড’-এর সদর দফতরে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাজ্যের বিভিন্ন এফএল (বিদেশি মদ) এবং আইএমএল (দেশি মদ) ডিস্ট্রিবিউটরদের উপস্থিতিতে নতুন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন রাজ্যের আবগারি কমিশনার এবং কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। সেখানেই নতুন নিয়ম কার্যকর করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ডিস্ট্রিবিউটরদের প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা জানিয়ে দেওয়া হয়।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বর্তমানে চালু থাকা শুল্ক পরিশোধ ও বন্ডভিত্তিক হিসাব ব্যবস্থার পরিবর্তে আরও স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পদ্ধতি চালু করা হবে। সরকারের দাবি, এর ফলে রাজস্ব সংগ্রহ আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে এবং শুল্ক বকেয়া থাকার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে। একই সঙ্গে মদ সরবরাহ চক্রের উপর প্রশাসনিক নজরদারিও আরও শক্তিশালী হবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিস্ট্রিবিউটরদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। জানানো হয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থার অধীনে আগামী ২১ জুন সোমবার পর্যন্ত নতুন রিকুইজিশন বা সেলস অর্ডার জমা দেওয়া যাবে। এর পরে পুরনো নিয়মে আর কোনও নতুন আবেদন গ্রহণ করা হবে না।

Advertisement

এ ছাড়া ২২ জুনের পর কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে কোনও নতুন ‘অর্ডার অফ সাপ্লাই’ ইস্যু করা হবে না। ফলে ডিস্ট্রিবিউটরদের হাতে থাকা বিদ্যমান অর্ডারগুলিই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর করতে হবে। ইতিমধ্যে ইস্যু হওয়া সমস্ত অর্ডার আগামী ২৪ জুন দুপুর ২টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ম্যানুফ্যাক্টরি, ব্রুয়ারি বা বটলিং প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ‘অর্ডার অফ সাপ্লাই’ কার্যকর না হলে সংশ্লিষ্ট ‘অর্ডার অফ সাপ্লাই’ স্বয়ংক্রিয় ভাবে বাতিল হয়ে যাবে বলে জানানো হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বন্ড ভ্যালু রেজিস্টার পদ্ধতির অবসান। দীর্ঘ দিন ধরে চালু থাকা এই ব্যবস্থাটি ২৫ জুন থেকে সম্পূর্ণ ভাবে ‘ডিকমিশন’ করা হবে। তার পরিবর্তে ডিস্ট্রিবিউটরদের ‘পার্সোনাল লেজার’ অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক কেটে নেওয়া হবে। ফলে শুল্ক প্রদানের ক্ষেত্রে আলাদা কোনও বন্ড বা রেজিস্টার ব্যবস্থার প্রয়োজন থাকবে না। এ ছাড়া ডিস্ট্রিবিউটরদের ব্যাংক গ্যারান্টি এবং ‘পার্সোনাল লেজার’ অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত নথিপত্রও নতুন নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবগারি দফতরের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে রাজস্ব আদায়ের গতি বৃদ্ধি পাবে এবং আর্থিক স্বচ্ছতা আরও নিশ্চিত হবে।

মদ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ডিস্ট্রিবিউটর অবশ্য জানিয়েছেন, নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে কিছু প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, পরিবর্তনের সময়ে যাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। প্রসঙ্গত, গত বছর ৮ ডিসেম্বর গেজেট নোটিফিকেশন জারি করে জানানো হয়, বিদেশ থেকে আমদানি করা বিলিতি মদ এবং দেশে তৈরি বিলিতি মদ, দুই ক্ষেত্রেই উৎপাদনস্থল থেকে ডিস্ট্রিবিউটদের মদ নিয়ে যাওয়ার সময়েই আবগারি এবং অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক অগ্রিম দিতে হবে। কিন্তু ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি আরও একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে স্থগিত করে দেওয়া হয় ডিসেম্বর মাসের ওই নির্দেশিকা। পূর্ববর্তী সেই নির্দেশিকাকেই ফের ২৫ জুন থেকে চালু করছে বর্তমান রাজ্য সরকার।

আবগারি দফতর সূত্রে খবর, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট বেভারেজ কর্পোরেশন লিমিটেড’ (বেভকো)-কে কেন্দ্র করে দুর্নীতি প্রকাশ্যে এসেছে। ২০১৭ সাল থেকে এই সংস্থা তৈরি করে সরকার রাজ্যে সব ধরনের মদের একচেটিয়া ব্যবসা শুরু করে। আবগারি কর্তাদের একাংশের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের ‘আশীর্বাদ’ কাজে লাগিয়ে নতুন একদল ড্রিস্ট্রিবিউটার বেভকোর সঙ্গে ব্যবসা শুরু করে। ডিসেম্বর মাসের নির্দেশিকার আগে পর্যন্ত সমস্ত ধরনের আবগারি শুল্ক খুচরো বিক্রেতা পর্যন্ত পৌঁছোনোর পর তাঁদের কাছ থেকে টাকা পেয়ে সরকারকে মেটাতেন ড্রিস্ট্রিবিউটারেরা। অর্থাৎ ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’। নিজেদের পকেট থেকে টাকা না-দিয়ে বাজারে পণ্য বেচে টাকা দেওয়ার বাড়তি সুবিধা ভোগ করতেন ড্রিস্ট্রিবিউটাররা। আর রাজনৈতিক কারণেই ডিসেম্বর মাসে ড্রিস্ট্রিবিউটারদের অগ্রিম সমস্ত আবগারি শুল্ক দেওয়ার নির্দেশিকা স্থগিত রাখা হয় বলে দফতর সূত্রে খবর। নতুন সরকার ডিসেম্বর মাসের সেই নির্দেশিকাই ২৫ জুন থেকে চালু করার নির্দেশ দিল যাতে ড্রিস্ট্রিবিউটাররা বাড়তি সুবিধা না পায়।

সব মিলিয়ে, আগামী ২৫ জুন থেকে কার্যকর হতে চলা এই নতুন আবগারি শুল্ক ব্যবস্থা পশ্চিমবঙ্গের মদ সরবরাহ ও বণ্টন কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর প্রভাব রাজস্ব সংগ্রহ থেকে শুরু করে ডিস্ট্রিবিউটরদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা— সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট ভাবে দেখা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement