বৃহস্পতিবার দুপুরে আইপ্যাক-এর দফতরের সামনে ফাইল হাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
আইপ্যাকের দফতরে এবং সংস্থার কর্ণধারের বাড়িতে ইডি হানার জেরে বিরল নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে। অথচ বিরোধী দল বিজেপির প্রতিক্রিয়ায় কোনও ‘নাটকীয়তা’ নেই! মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে। কখনও আইপ্যাকের দফতরে। বার বার বিজেপি, অমিত শাহ এবং কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। বিজেপির প্রতিক্রিয়া কিন্তু মাপা থেকেছে।
কারণ কী? বিজেপি সূত্রের দাবি, ইডি হানার গতিপ্রকৃতি এবং তার ফলাফল সম্পর্কে শীর্ষনেতৃত্ব ‘আত্মবিশ্বাসী’। তাই তাঁরা ‘বিচলিত’ হননি। প্রতীকের বাড়ি বা আইপ্যাক দফতর থেকে মুখ্যমন্ত্রী নানা নথি নিয়ে গিয়েছেন বলে তিনি নিজে দাবি করা সত্ত্বেও বিজেপি নেতৃত্ব অবিচলিত। তাঁদের ব্যাখ্যা, দলের মনোবল ধরে রাখতে মমতা ‘নথি সরানোর’ ছবি তৈরি করেছেন। এক নেতার কথায়, ‘‘অনেকটা ‘দৃশ্যম’ ছবির মতো।’’
মমতাকে প্রতীকের বাড়ি থেকে ফাইল হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে রাজ্য বিজেপির অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির নিরসন করেন এক কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি আপাতত পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাংগঠনিক, রাজনৈতিক এবং নির্বাচনী কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত জনা পাঁচেক পর্যবেক্ষক বা প্রভারীর একজন। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নড্ডার বৈঠকে যোগ দিতে তিনি তখন বিধাননগর সেক্টর ফাইভের একটি হোটেলে ছিলেন। রাজ্যের নেতারাও সেখানে হাজির। রাজ্য বিজেপির কয়েকজনকে ওই কেন্দ্রীয় নেতা আশ্বস্ত করে কোথাও কোনও মন্তব্য না-করার পরামর্শ দেন। নড্ডাকে প্রশ্ন করা হলে তিনিও শুধু বলেন, ‘‘নমস্কার।’’
রাজ্য বিজেপির একাংশের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী প্রতীকের বাড়ি বা আইপ্যাকের দফতর থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কিছু নিয়ে যাননি। তেমন হলে তিনি সে কথা প্রকাশ্যে জানাতেন না। সেই ছবিও তৈরি হতে দিতেন না। বিজেপির ওই অংশের আরও ব্যাখ্যা, তৃণমূল তথা রাজ্য সরকারেরর পরামর্শদাতা সংস্থার দফতরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা হানা দিল আর মুখ্যমন্ত্রী কিছু করলেন না, এই বার্তা ছড়িয়ে গেলে মমতার ‘রাজনৈতিক ক্ষতি’ হত। রাজ্য জুড়ে তৃণমূল কর্মীদেরও মনোবল ভেঙে যেত। তাই মুখ্যমন্ত্রী কিছু ছবি তৈরি করেছেন। এমন একটা ভাষ্য তৈরি করেছেন যে, ইডি ‘তেমনকিছু’ করতে পারেনি।
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাবমূর্তির কফিনে নিজেই শেষ পেরেক পুঁতে দিলেন! তিনি যা করছেন, তাকে অনৈতিক না বলাই ভাল। এটা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত এবং ফৌজদারি অপরাধ। সরকারি সংস্থার তদন্তের কাজে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বাধা দিয়েছেন। ইডির হাত থেকে মুখ্যমন্ত্রী ফাইল নিয়ে, হার্ড ডিস্ক নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকার কথা নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছেন।’’
প্রসঙ্গত, শমীকের অনেক আগেই ওই বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি মমতার কাজকে সরাসরি ‘অনৈতিক’ বলেই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তবে তদন্ত নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি। ঘটনাচক্রে, শমীক তা বলেননি। বিজেপি সূত্রের দাবি, এটি কাকতালীয় ভাবে হয়নি। উচ্চতর নেতৃত্বের তরফে ‘সুনির্দিষ্ট বার্তা’ রয়েছে। তাই রাজ্য নেতাদের সব প্রতিক্রিয়াই মাপা।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা যা ঘটিয়েছেন, তা গোটা ভারতে ‘নজিরবিহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন শমীক। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ফাইল-হার্ডডিস্ক নিয়ে চলে যাওয়ার ফলে ইডি তদন্ত ভেস্তে গেল, এমন মন্তব্য তিনি ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। সেই সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের জবাবে শমীক বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী তদন্ত ভেস্তে দিতে পেরেছেন কি না, তা ইডি বলতে পারবে। তিনি ভিতরে কী করেছেন, তা তো আমাদের জানা নেই! রাজনৈতিক শালীনতা বজায় রেখে যতটুকু বলা যায়, আমরা সেটুকুই বলছি। আর কিছু জানার থাকলে ইডিকে জিজ্ঞাসা করুন।’’