ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধনে স্বতন্ত্র শান্তিপুরের রাস উৎসব

শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে শ্রীরাধিকা ও অন্যান্য গোপনারীদের নৃত্যগীত উৎসব রাস নামে পরিচিত। রাসের ইতিহাস প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হয় সেই মহাভারতের যুগে। শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ যখন গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলায় মত্ত, রাসের সেই আকর্ষণে স্বয়ং যোগমায়াও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

Advertisement

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৪ নভেম্বর ২০১৬ ১৯:৪৯
Share:

শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে শ্রীরাধিকা ও অন্যান্য গোপনারীদের নৃত্যগীত উৎসব রাস নামে পরিচিত। রাসের ইতিহাস প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হয় সেই মহাভারতের যুগে। শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণ যখন গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলায় মত্ত, রাসের সেই আকর্ষণে স্বয়ং যোগমায়াও সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। অবশ্য সেই রাসে অন্য পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। এতে মহাদেবের মনে বিস্ময় জেগেছিল যে কী সেই আকর্ষণ যার টানে তাঁর গৃহিণীও সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। সেই কৌতূহলেই মহাদেব নারীর বেশে রাস অঙ্গনে উপস্থিত হলেন।

Advertisement

রাস অঙ্গনে নিমেষেই অন্য পুরুষের উপস্থিতি অনুভব করায় শ্রীকৃষ্ণ সেই স্থান ত্যাগ করেন। ফলে ঘটে গেল রাস ভঙ্গ! যোগমায়া অবশ্য ঘোমটা মাথায়, প্রসূতির ছদ্মবেশে মহাদেবকে চিনতে পেরে ভর্ৎসনা করে সেই স্থান ত্যাগ করতে বলতেই, মহাদেব বলেছিলেন, শ্রীকৃষ্ণের রাস তাঁর দেখা হল না ঠিকই তবে কলিযুগে তিনি বিশ্ববাসীকে এই রাস দর্শন করাবেন।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, শান্তিপুর বড়গোস্বামী বাড়ির আদিপুরুষ অদ্বৈতাচার্য ছিলেন মহাদেবের অংশ। শোনা যায়, তিনি তাঁর কৃষ্ণ বিগ্রহের রাসপূজা করতেন। অবশ্য সে সময় রাস উৎসবের আকার ধারণ করেনি। প্রায় ৩৫০ বছর আগে বড় গোস্বামীবাড়ির গৃহদেবতা রাধারমণ জিউ এক বার চুরি হয়ে যায়। পরে সেই মূর্তি যখন পাওয়া যায় তখন বাড়ির সকলে ঠিক করেন কৃষ্ণ বিগ্রহের পাশে রাধিকা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এক রাস পূর্ণিমায় সাড়ম্বরে শ্রীমতী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর রাধারমণ ও রাধিকার বিগ্রহের মিলন উৎসবের মাধ্যমেই শান্তিপুরের রাস উৎসবের সূচনা হয়েছিল।

Advertisement

বেলোয়াড়ি ঝাড় ও ফানুসের আকর্ষণে ভিড় করেন জনতা।

বিবাহের উৎসবে যেমন বধু পরিচিতির একটা প্রথা আছে, তেমনই এক শোভাযাত্রার মাধ্যমে নগরবাসীর সঙ্গে শ্রীরাধিকার পরিচয় পর্ব সারা হয়েছিল সে যুগে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য গোস্বামীবাড়ির বিগ্রহও এই শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহণ করেছিল। এই শোভাযাত্রাই কালের গণ্ডি পেরিয়ে ভাঙা রাসের শোভাযাত্রা নামে পরিচিত হয়।

এই পরিবারের সত্যনারায়ণ গোস্বামী জানালেন, পুরনো ঐতিহ্য মেনে উৎসবের প্রথম দিন অদ্বৈতাচার্য পূজিত বিগ্রহ সীতানাথকে নিয়ে নগর পরিক্রমা হয়। বড় গোস্বামীবাড়ির সব ক’টি কৃষ্ণ বিগ্রহকেই রাস মঞ্চে স্থাপন করে বিশেষ পুজো করা হয়। এই উপলক্ষে ভক্তিগীতি, কীর্তন পরিবেশন করা হয়। ভোগে থাকে নানা ধরনের ফল, মিষ্টি, মেওয়া ফল, ক্ষীর, ননি, মাখন ইত্যাদি। দিনের বেলা বিগ্রহগুলি মন্দিরে থাকে এবং অন্নকূট উৎসবে নানা ধরনের পদ ভোগ দেওয়া হয়। তিন দিন ব্যাপী এই উৎসবে আজও প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়।

তৃতীয় দিনে ভাঙারাসের শোভাযাত্রাটি নানা দিক থেকে আকর্ষণীয়। থাকে ঢাকের নাচ। এতে অংশগ্রহণ করে প্রায় ১০৮টি ঢাক। শোভাযাত্রায় বিশালাকৃতি একটি খাঁচায় দু’জন পুরুষ মহিলার বেশে নৃত্য ও গান করেন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে। একে বলে ময়ূরপঙ্খীর গান। বিবিধ ঘটনাকে অবলম্বন করে থাকে সঙের মিছিল। রাধাকৃষ্ণের বেশে থাকে বালক-বালিকাদের নৃত্য। তবে মূল আকর্ষণ বিশাল হাওদায় সোনার গয়নায় সজ্জিত দেবতার বিগ্রহগুলি। বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার হলেও আজও ব্যবহার হয় বেলোয়ারি ফানুস। আগে বাহকদের কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হলেও বর্তমানে সেগুলি ট্রেলারে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বড়গোস্বামী বাড়ি থেকেই ভাঙা রাসের সূচনা হয়েছিল বলেই আজও এই পরিবারের শোভাযাত্রা বের হয় সবার আগে। তার পরে অন্যান্য গোস্বামীবাড়ির শোভাযাত্রা বের হয়। রাস্তার দু’ধারে দেখা যায় অসংখ্য অপেক্ষারত ভক্ত।

ঐতিহ্যে অটুট বড় গোস্বামী বাড়ির রাস।

পরের দিন হয় কুঞ্জভঙ্গ এবং ঠাকুরনাচ। এ দিন বিগ্রহগুলির ঘরে ফেরার অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান চলে দুপুর দু’টো থেকে সাড়ে চারটে পর্যন্ত। হয় নামসংকীর্তন। পরে বিগ্রহের সব গয়না খুলে স্নান করিয়ে অভিষেক করানো হয়। এ দিন শ্রীকৃষ্ণকে মহিলারা চামর দানের সুযোগ পান। এ ভাবেই সমাপ্তি ঘটে চার দিনের উৎসবের। দেবতাকে এ দিন সবচেয়ে বেশি পদের ভোগ দেওয়া হয়।

শন্তিপুরের অন্যতম প্রাচীন শ্যামচাঁদ মন্দিরের রাস উৎসবও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শ্যামচাঁদ ও রাধিকা ভাঙা রাসের শোভাযাত্রায় বের হন না। মন্দিরের সামনে বিশেষ মঞ্চে তাঁদের অধিষ্ঠান। মন্দিরের তিন দিন ব্যাপী এই উৎসবে অসংখ্য ভক্ত সমাগম হয়। মন্দির প্রাঙ্গণে এক মাস ব্যাপী মেলাও।

তেমনই শান্তিপুরের প্রাচীন বিগ্রহ বাড়িগুলির মধ্যে সাবেক বনেদিয়ানা ও আভিজাত্যে অটুট দীনদয়াল বাড়ির রাস উৎসব। এর সূচনা করেছিলেন রামচন্দ্র প্রামাণিক। রাসে পরানো হয় সোনার গয়না। রাস উপলক্ষে এ বাড়ির প্রতিমা শোভাযাত্রায় বের হয় না। বরং ঠাকুরদালান সেজে ওঠে বেলজিয়াম কাচের ঝাড়বাতি আর ফানুসে। বৈদ্যুতিক আলো নয়। আজও ব্যবহৃত হয় মোমবাতি। এই পরিবারের প্রসেনজিৎ প্রামাণিক বলছিলেন, ‘‘বায়না দিয়ে তৈরি বিশেষ এই মোমবাতি জ্বলে প্রায় ছ’ঘণ্টা। অন্যান্য জায়গায় নানা ধরনের বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহৃত হলেও আমারা অতীতের আমেজ ধরে রাখতে বছরের কয়েকটা দিন মোমবাতি ব্যবহার করি। তা ছাড়া মোমবাতির স্নিগ্ধ আলোয় দর্শনার্থীরা কিছুক্ষণের জন্য অতীতের আমেজে ফিরে যান।’’

ভাঙা রাসের শোভাযাত্রা।

শান্তিপুরের অন্যান্য বাড়িগুলির মধ্যে মধ্যম গোস্বামী বাড়ি, ছোট গোস্বামী বাড়ি, পাগলা গোস্বামী বাড়ি, মদনগোপাল গোস্বামী বাড়ি, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর বাড়ি, বাঁশবুনিয়া গোস্বামী, আতাবুনিয়া গোস্বামী বাড়ির রাস উৎসব আজও নিষ্ঠা, এবং আভিজাত্যে অটুট। অন্যান্য পরিবারগুলির মধ্যে সাহা বাড়ি, খাঁ চৌধুরী বাড়ি, আশানন্দ বাড়ি, বংশীধারী ঠাকুর বাড়ি, মঠ বাড়ি, রায় বাড়ি, গোপীনাথ জিউ ঠাকুর বাড়ির রাসও সমান আকর্ষণীয়।

তবে শুধু সাবেক বিগ্রহ-বাড়িই নয়, শান্তিপুরের বারোয়ারি রাসও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে। এদের মধ্যে শ্যামচাঁদ মোড়, লক্ষ্মীতলাপাড়া বারোয়ারি, বড় গোস্বামীপাড়া বারোয়ারি, শান্তিপুর কামারপাড়া, শান্তিপুর শ্যামবাজার, বউবাজার পাড়া উল্লেখ্য।

ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement