WB Municipal Election 2022: পুর-স্বাস্থ্যের ভগ্নদশা

১৮টি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা প্রায় ৭৩ হাজার। পরিবার প্রায় ২০,৫৫০টি। অথচ স্বাস্থ্য পরিষেবার নজরদারির জন্য রয়েছেন মাত্র ১৮ জন আশা কর্মী।

Advertisement

কিংশুক গুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৭:৩৮
Share:

অচল পুরসভার অ্যাম্বুল্যান্স।

জেলা শহর ঝাড়গ্রাম। অথচ তার নিজস্ব স্বাস্থ্য পরিকাঠামোটাই বেহাল! পুরসভার একমাত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র শয্যাবিহীন। নেই স্থায়ী চিকিৎসক। নার্সের পদও খালি। ফার্মাসিস্ট ও ল্যাব টেকনিশিয়ানও নেই। একজন অস্থায়ী চিকিৎসক সপ্তাহে দু’ থেকে তিনদিন বহির্বিভাগে রোগী দেখেন। ফার্মাসিস্ট না থাকায় একজন পিএইচএম (পাবলিক হেলথ নার্স) রোগীদের ওষুধ দিতে গিয়ে হিমসিম খান। যে দিনগুলিতে চিকিৎসক থাকেন না ওই দিনগুলিতে বর্হিবিভাগে পিএইচএমকেই সাধারণ রোগীদের ওষুধ দিতে হয়। একটু বেশি অসুস্থ রোগীদের জেলা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ল্যাব টেকনিশিয়ান না থাকায় রক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষাও হয় না। তার জন্য রোগীদের জেলা হাসপাতালে যেতে হয়, অথবা বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হয়।

Advertisement

ঝাড়গ্রাম পুরসভা তৈরি হয়েছিল ১৯৮২ সালে। বাম আমলে পুরসভার চারটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ছিল। সেখানে চিকিৎসকও বসতেন। এখন সেগুলি কার্যত বন্ধ। পুরসভার নিজস্ব প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি অবশ্য চালু হয় তৃণমূলের সরকারের জমানায়। ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল নতুন জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ঝাড়গ্রাম। ওই দিনই বলরামডিহি পুর ময়দান চত্বরে পুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির উদ্বোধন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোড়ায় একজন স্থায়ী চিকিৎসক ও দু’জন স্টাফ নার্স ছিলেন। কিন্তু দু’জন নার্সই অবসর নিয়েছেন। আগে ফার্মাসিস্ট ও ল্যাব টেকনিশিয়ান ছিলেন। তাঁরাও চাকরি ছেড়ে অন্যত্র যোগ দিয়েছেন। বছর দু’য়েক আগে স্থায়ী চিকিৎসক চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসককে চুক্তিভিত্তিক ভাবে নিয়োগ করা হয়েছে। ৭৩ বছরের ওই চিকিৎসক সপ্তাহে দু’ থেকে তিনদিন বর্হিবিভাগে পরিষেবা দেন। তবে শিশুদের ও করোনার প্রতিষেধক অবশ্য নিয়মিত দেওয়া হয় সেখানে।

ওই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অধীনে যে চারটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে, সেগুলি হল ১ নম্বর ওয়ার্ডের কদমকানন, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের শক্তিনগর, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের পুরাতন ঝাড়গ্রাম এবং ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বেনাগেড়িয়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে মাসে একবার শিশুদের প্রতিষেধক দেওয়া হয়। চিকিৎসক না থাকায় সেগুলি থেকে আর কোনও পরিষেবা মেলে না বললেই চলে। শক্তিনগর এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা বেলারানি বেরা বলছেন, ‘‘অনেক আগে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক বসতেন। এখন সেখানে পরিষেবা মেলে না। পুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও রোজ চিকিৎসক বসেন না। তাই চটজলদি প্রয়োজনে আমরা জেলা হাসপাতালেই যাই।’’

Advertisement

পুরসভার সুলভ মূল্যের নিজস্ব অ্যাম্বুল্যান্সটিও বহু বছর ধরে অচল। ফলে দরিদ্র পুরবাসীকেও জরুরি প্রয়োজনে মোটা টাকা দিয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করতে হয়।

শহরে ১৮টি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা প্রায় ৭৩ হাজার। পরিবার প্রায় ২০,৫৫০টি। অথচ স্বাস্থ্য পরিষেবার নজরদারির জন্য রয়েছেন মাত্র ১৮ জন আশা কর্মী। রয়েছেন চার জন সুপারভাইজ়ার। শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্যের তদারকির পাশাপাশি, পুরসভার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যাবতীয় সমীক্ষা করতে হয় তাঁদের। ডেঙ্গি, করোনা, যক্ষ্মা, কুষ্ঠের মত যাবতীয় সমীক্ষাও বাড়ি-বাড়ি গিয়ে করেন আশা কর্মীরা। স্বল্প সংখ্যক আশা কর্মী থাকায় সমীক্ষার কাজে বিলম্ব হয়। কাজটাও যথাযথ হয় না বলেও অভিযোগ। পুরসভা সূত্রের অবশ্য দাবি, শহরেই রয়েছে জেলা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। সেই কারণে বড় সমস্যা হয় না। শহরে ২০১৯ সালে মাত্র একজন ডেঙ্গি আক্রান্ত হন। তারপরে আর কেউ ডেঙ্গি আক্রান্ত হননি বলেও দাবি করেছে ওই সূত্র।

বিরোধীদের অবশ্য খোঁচা, ঝাড়গ্রাম পুরসভার উদ্যোগে স্বাস্থ্য পরিষেবা বলতে কিছুই নেই। বিগত বাম পুরবোর্ডের প্রাক্তন পুরপ্রধান তথা জেলা সিপিএম নেতা প্রদীপ সরকার বলছেন, ‘‘লোক দেখানো পুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গেলেই স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল অবস্থাটা বোঝা যায়। আমাদের আমলে চালু হওয়া চারটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রই এখন বন্ধ।’’ বিজেপির জেলা সভাপতি তুফান মাহাতোর কটাক্ষ, ‘‘ঝাড়গ্রাম পুর-শহরের বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাও এগিয়ে বাংলার অন্যতম উদাহরণ। পুরবাসীর স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে।’’

বিদায়ী পুর-চেয়ারপার্সন কবিতা ঘোষের অবশ্য দাবি, ‘‘বাম আমলে পুরসভার নিজস্ব স্বাস্থ্য পরিকাঠামো কার্যত কিছুই ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলেই শহরে পুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। সেখানে পরিকাঠামোর ঘাটতি মেটাতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শহরে চারটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে শক্তিনগর ও বেনাগেড়িয়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের নতুন ভবনের জন্য সুডা-র (স্টেট আরবান ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি) কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। এছাড়াও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের নৃপেন পল্লিতে নতুন একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির জন্য রাজ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement