নুলিয়া নেই, অবাধে ঝুঁকির সমুদ্রস্নান

নজরদারি নেই। সমুদ্রে কোনও পর্যটক বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ানোরও কেউ নেই। দেশের সৈকত শহরগুলির মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে দিঘার নাম। ভিন্‌ রাজ্য থেকেও অনেক পর্যটক প্রতিবছর দিঘায় বেড়াতে আসেন। ঘোরার আনন্দে অনেকেই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই চলে যান সমুদ্রের গভীরে।

Advertisement

সুব্রত গুহ

শেষ আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০০:০৭
Share:

ষে কোনও সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। অথচ উদাসীন প্রশাসন। সোহম গুহর তোলা ছবি।

নজরদারি নেই। সমুদ্রে কোনও পর্যটক বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ানোরও কেউ নেই। দেশের সৈকত শহরগুলির মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে দিঘার নাম। ভিন্‌ রাজ্য থেকেও অনেক পর্যটক প্রতিবছর দিঘায় বেড়াতে আসেন। ঘোরার আনন্দে অনেকেই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই চলে যান সমুদ্রের গভীরে। অথচ সেখানে কোনও বিপদ ঘটলে পর্যটকদের পাশে দাঁড়ানোর কথা নুলিয়াদের। তাঁরাই পর্যটকদের যে কোনও বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। অথচ গত ১৯ অগস্ট থেকে সৈকতশহর দিঘার সমুদ্রতটে বন্ধ রয়েছে নুলিয়া পরিষেবা।

Advertisement

কেন বন্ধ হল এই পরিষেবা? বিপদগ্রস্ত পর্যটককে এখন থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব কে নেবে? সদুত্তর নেই প্রশাসনের কাছে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের ডেপুটি কন্ট্রোলারের দায়িত্বপ্রাপ্ত তমলুকের মহকুমাশাসক শুভ্রজ্যোতি ঘোষ সদ্য বদলি হয়ে জেলায় এসেছেন। তিনি বলেন, ‘‘রাজ্যের অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের পক্ষ থেকে দিঘার সমুদ্র সৈকতে নিযুক্ত নুলিয়াদের প্রতি তিনমাস করে কাজের বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই হিসেবে গত ১৯ মে-১৮ অগস্ট পর্যন্ত দিঘার নুলিয়াদের কাজ দেওয়া হয়েছে।’’

সামনেই পুজো। পুজোর ক’দিন দিঘায় পর্যটকদের ভিড় বাড়বে। পুজোর আগে নুলিয়া পরিষেবা চালু হওয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই দিঘার হোটেল মালিকদের সংগঠন সরব হয়েছে। পরিষেবা বন্ধ থাকায় কাজ হারিয়েছেন স্থানীয় ১৯ জন নুলিয়াও। অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের অধীন বিপর্যয় মোকাবিলা বিভাগ ওই ১৯ জন নুলিয়াকে প্রশিক্ষণ দেয়। প্রশিক্ষণের পর গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তাঁদের দিঘায় পর্যটকদের নিরাপত্তায় স্বার্থে নিযুক্ত করা হয়। গত ১৯ অগস্ট আচমকা পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সঙ্কটে নুলিয়ারা। তাছাড়াও নুলিয়াদের গত তিনমাসের মজুরিও বকেয়া রয়েছে বলে অভিযোগ।

Advertisement

উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার অশোকনগর থেকে দিঘায় বেড়াতে এসেছেন চুনীলাল দত্ত, হুগলির হালিশহরের সমীর আইচ। তাঁদের কথায়, “দিঘাকে আধুনিক সৈকত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে বলে চারিদিকে নানা বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। অথচ সমুদ্র সৈকতে পর্যটকরা বিপদে পড়লে তাদের বাঁচানোরই কেউ নেই।’’ তাঁরা আরও বলেন, ‘‘নুলিয়া না থাকায় বেশ কিছু পর্যটক দুঃসাহসিক ভাবে স্নান করতে সমুদ্রের অনেক গভীরে চলে যাচ্ছেন। তাদের সতর্ক করার কেউ নেই। যে কোনও সময় বড় বিপদ ঘটে যেতে পারে।’’

নুলিয়া রতন দাসের অভিযোগ, “গত তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। তার উপর আচমকা কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন আমরাই চরম সমস্যায় পড়েছি। একাধিকবার স্থানীয় রামনগর-১ ব্লক অফিসে গিয়েও বকেয়া বেতন কবে পাওয়া যাবে সে বিষয়ে সদুত্তর মেলেনি।’’ রামনগর-১ ব্লক অফিস সূত্রে দাবি, দিঘার সৈকতে কর্মরত ১৯ জন নুলিয়ার মধ্যে প্রতিমাসে কে কতদিন কাজ করেছেন তার তালিকা দিঘা থানা থেকে ব্লক অফিসে এসেছে। বিল তৈরি করে জেলার অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের কাছে
পাঠানো হবে।

নুলিয়া উজ্জ্বল জানা, রতন দাসের অভিযোগ, “দীর্ঘ তিনমাস মজুরি না মেলায় চরম আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। বিকল্প কোনও কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে বেশিরভাগ নুলিয়াদের পরিবারের লোকেরা অনাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।” তাঁদের আরও অভিযোগ, ‘‘দৈনিক ৩৩৮ টাকা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে প্রতিমাসে ২৮ দিন সৈকতে কাজ করতে হয়। আমরা মাসে ২৮ দিনের পরিবর্তে প্রতিদিনই কাজ করছিলাম। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেলে ৪টে পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তারপরেও মজুরি না পাওয়ায় সমস্যা বেড়েছে।’’ তাঁদের বক্তব্য, ‘‘প্রতিদিন নিজেদের রিকশায় দিঘা থানা থেকে স্পিডবোট সৈকতে নিয়ে গিয়ে সারাদিন কাজ করতে হয়। তারপর ফের সন্ধ্যায় দিঘা থানায় স্পিডবোট জমা দিয়ে আসতে হয়। তিনমাস বেতন না পাওয়ায় এক একজন নুলিয়ার বকেয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার টাকা ছুঁয়েছে।’’ বকেয়া বেতন অবিলম্বে দেওয়া ও আচমকা নুলিয়া পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে দিঘার কর্মচ্যুত নুলিয়ারা আজ, মঙ্গলবার তমলুকে জেলা প্রশাসনিক ভবনে যাবেন বলেও তাঁরা জানান।

শুভ্রজ্যোতিবাবু বলেন, ‘‘মাস্টার রোলের মাধ্যমে অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতর নুলিয়াদের পারিশ্রমিক দেয়। মাস্টার রোলের বিল তৈরি করে রামনগর-১ ব্লক প্রশাসন। নুলিয়াদের মাস্টার রোলের বিল তৈরির কাজ শেষ করে তা পর্যালোচনার কাজ চলছে বলে ব্লক প্রশাসন জানিয়েছে। বিল এলেই নুলিয়ারা বকেয়া পারশ্রমিক পেয়ে যাবেন।’’

দিঘায় কবে নতুন করে নুলিয়া নিয়োগ করা হবে?

উত্তরে শুভ্রজ্যোতিবাবু বলেন, ‘‘অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতর থেকে নির্দেশ এলেই নুলিয়াদের ফের কাজে নিয়োগ করা হবে। এখনও পর্যন্ত তেমন কোন নির্দেশ আসেনি। তবে আশা করছি, নুলিয়াদের ফের তিনমাসের জন্য কাজে নিযুক্ত করার নির্দেশ শীঘ্রই পাওয়া যাবে।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement