জেলা পঞ্চায়েত সম্মেলন

রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে উন্নয়নের বার্তা

নির্বাচনের দু’বছর পর সম্মেলন করে বোঝাতে হল পঞ্চায়েতের দায়িত্ব ও কতর্ব্য! যে ঘটনায় খুশি নির্বাচিত পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরা। দেরিতে হলেও এই সম্মেলনের পর অনেকের ‘বোধোদয়’ হবে বলেও আশাবাদী বিরোধীরা।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০০:৩৩
Share:

নির্বাচনের দু’বছর পর সম্মেলন করে বোঝাতে হল পঞ্চায়েতের দায়িত্ব ও কতর্ব্য! যে ঘটনায় খুশি নির্বাচিত পঞ্চায়েত প্রতিনিধিরা। দেরিতে হলেও এই সম্মেলনের পর অনেকের ‘বোধোদয়’ হবে বলেও আশাবাদী বিরোধীরা।

Advertisement

হঠাত্‌ এতদিন পর কেন নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্য থেকে কর্মাধ্যক্ষ - সকলকে বোঝাতে হচ্ছে তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে? প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এর প্রধান কারণ উন্নয়নের কাজে ঘাটতি। কেন উন্নয়নে ঘাটতি? পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, বেশিরভাগ পঞ্চায়েত সদস্যই তাঁদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন নন। এমনকি অনেক পঞ্চায়েত প্রধান ও কর্মাধ্যক্ষরাও ব্যতিক্রম নন। এ ব্যাপারে প্রশাসনিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরেও তাঁদের নিজেদের ভাবনাচিন্তার উন্নতি ঘটানো যায়নি বলেই কাজেও খামতি থেকে যাচ্ছে। এক পদস্থ আধিকারিকের কথায়, “ইন্দিরা আবাস যোজনা বা শৌচাগার নির্মাণের উপভোক্তার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে যদি উপভোক্তার রাজনৈতিক রঙ দেখতে গিয়ে তালিকা তৈরিতেই দেরি হয় তাহলে বাস্তাবায়িত হবে কী করে?”

সম্প্রতি পঞ্চায়েত সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। রাজ্যে তো এই সম্মেলন হবেই। প্রতিটি জেলাতেও যাতে সম্মেলন করা যায়, সে জন্যও নির্দেশ এসেছিল নবান্ন থেকে। সেই নির্দেশ মেনেই বুধবার পঞ্চায়েত সম্মেলন করল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা। যেখানে রাজ্যের পঞ্চায়েত দফতরের যুগ্ম সচিব পরিতোষ রায়ও উপস্থিত ছিলেন।

Advertisement

সম্মেলনে প্রথমে বোঝানো হল গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির দায়িত্ব ও কর্তব্য। তারপরই বোঝানো হল, গ্রাম পঞ্চায়েতকে কিভাবে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলা যায়। তার জন্য যে সঙ্কীর্ণ রাজনীতি ছেড়ে কমিউনিটি সংহতি-র প্রয়োজন, সমস্ত মানুষের যোগদানও জরুরি তাও বোঝানো হয়। ইন্দিরা আবাস যোজনা এবং মিশন নির্মল বাংলা প্রকল্প রূপায়ণে পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতির ভূমিকা ও বিকেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা। এ ছাড়াও বিগত চার বছরের কাজকর্মের পর্যালোচনাও করা হয়েছে।

কিন্তু এতদিন পর কেন এসব বোঝাতে হল? প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, কাজকর্মের খতিয়ান দেখতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ খাতেই টাকা পড়ে রয়েছে। চলতি আর্থিক বছর শেষ হতে হাতে মাত্র দু’মাস রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ পঞ্চায়েত সমিতি বা গ্রাম পঞ্চায়েত ৭০ শতাংশ অর্থও খরচ করতে পারেনি। ৯০ শতাংশের বেশি অর্থ ব্যয় করেছে মাত্র ১টি পঞ্চায়েত সমিতি। সেটি হল গড়বেতা-২ ব্লক। ৭টি পঞ্চায়েত সমিতি ৮০ শতাংশের বেশি অর্থ খরচ করতে পেরেছে। সেগুলি হল, দাঁতন-১, ঘাটাল, মেদিনীপুর সদর, শালবনি, গড়বেতা-১, কেশপুর ও কেশিয়াড়ি। ১১টি পঞ্চায়েত সমিতি ৭০শতাংশের বেশি অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে। জেলার সার্বিক খরচের হার ৭৪.৫৯ শতাংশ। সারা বছরে জেলার ২৯টি পঞ্চায়েত সমিতি তৃতীয় ও ত্রয়োদশ অর্থ কমিশন, বিআরজিএফ, একশো দিনের কাজের প্রকল্প-সহ গুরুত্বপূর্ণ ১১টি খাতে আগে পড়ে থাকা ও চলতি বছর মিলিয়ে ৫৮৩ কোটি ২৯ লক্ষ টাকা পেয়েছিল। তার মধ্যে এখন পর্যন্ত খরচ করতে পেরেছে মাত্র ৪৩৫ কোটি ৬ লক্ষ টাকা। ১৪৮ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা এখনও পড়ে রয়েছে।

সারা বছর ধরে যাঁরা ৭০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পারেনি তারা কী ভাবে দু’মাসে পড়ে থাকা কোটি কোটি টাকা খরচ করবে? আবার খরচ না করতে পারলে পরের ধাপের বরাদ্দ অর্থও মিলবে না। ধরা যাক, স্বচ্ছ ভারত অভিযান বা এ রাজ্যে যার নাম দেওয়া হয়েছে মিশন নির্মল বাংলা, সেই প্রকল্পে কোন ব্লকে কোন মানুষের বাড়িতে শৌচাগার রয়েছে সেই তালিকা পর্যন্ত এখনও ওয়েবসাইটে তুলতে পারেনি। অভিযোগ, এখানেও সঙ্কীর্ণ রাজনীতি। গোষ্ঠী দেখে তালিকা তৈরি করতে গিয়ে সার্বিক উন্নয়নই ধাক্কা খাচ্ছে। একদিকে এখনও ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের নির্বাচিত সদস্যরা অনেকটাই অনভিজ্ঞ থেকে গিয়েছেন, তার উপর রঙ, গোষ্ঠী যে সার্বিক উন্নয়নে প্রভাব ফেলছে, তা পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন সকলেই। তাই সম্মেলন করে সকলকে উজ্জীবীত করার এই প্রচেষ্টা। যে প্রচেষ্টাকে অবশ্য সাধুবাদ জানাচ্ছেন সকলেই।

কংগ্রেসের নির্বাচিত জেলা পরিষদ সদস্য বিকাশ ভুঁইয়া বলেন, “দেরিতে হলেও সরকার বুঝেছে সঙ্কীর্ণ রাজনীতি ছেড়ে অনভিজ্ঞ নির্বাচিত সদস্যদের বোঝানো প্রয়োজন। সংসদকে গুরুত্ব না দিয়ে, মানুষকে গুরুত্ব না দিয়ে, রঙ ও গোষ্ঠী দেখে কাজ করলে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এবার এই সম্মেলন তা থেকে বেরিয়ে আসার কথাই ঠারেঠারে বুঝিয়ে দিল। সত্যিই তা কাজে লাগলে ভালোই হবে।” লালগড় পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূলের বন ও ভূমির কর্মাধ্যক্ষ উদয়শঙ্কর রায়ের কথায়, “কিছু ক্ষেত্রে তো আমাদের কয়েকজনেরও দুর্বলতা ছিল। এই সম্মেলন সেই দুর্বলতা কাটিয়ে দেবে বলেই আশাবাদী।” আর জেলা পরিষদের দলনেতা তৃণমূলের অজিত মাইতি বলেন, “চলতি আর্থিক বছরে যাতে সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতি একশ শতাংশ কাজ করতে পারে সে জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। কিভাবে সেই কাজ করা হবে সে বিষয়ে তাঁদের রূপরেখাও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।” কিছু পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতিতে কর্মী সঙ্কটের কারনে উন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে বলে দাবিও করেছেন। অজিতবাবু বলেন, “এ ব্যাপারে তাঁদের লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। আমরা আন্তরিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।”

এ দিনের অনুষ্ঠানে প্রথমের সারিতে থাকা পাঁচটি পঞ্চায়েত সমিতি ও পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েতকে পুরস্কৃতও করা হয়। পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় থাকা পঞ্চায়েত সমিতিগুলি হল গড়বেতা-২, দাঁতন-১, ঘাটাল, মেদিনীপুর সদর ও শালবনি। পঞ্চায়েতগুলি হল ডেবরা ব্লকের রাধামোহনপুর, কেশিয়াড়ির সাঁতরাপুর ও লালুয়া, ঘাটালের দেওয়ানচক এবং চন্দ্রকোনা-১ ব্লকের মাংরুল। এদিনের অনুষ্ঠানে জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মীনা, জেলা সভাধিপতি উত্তরা সিংহ, দুই অতিরিক্ত জেলাশাসক পাপিয়া ঘোষ রায়চৌধুরী, সুশান্ত চক্রবর্তী, জেলা পরিষদের সচিব দিব্যনারায়ণ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement