সমবায় ব্যাঙ্কের ভোটে ছাপ্পা, বুথ দখলে অভিযুক্ত তৃণমূল

দীর্ঘদিন বামেদের দখলে থাকা মেদিনীপুর শহরের পিপলস্ কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের পরিচালন সমিতির দখল নিল তৃণমূল। পরিচালন সমিতির মোট আসন ছিল ৫১টি। ৪টি আসনে আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিলেন তৃণমূল সমর্থিত প্রার্থীরা। রবিবার ভোট হয় বাকি ৪৭টি আসনে। ৪৬টি আসনেই জয়ী হন তৃণমূল সমর্থিতরা। একটি আসন পেয়েছে বাম। ফল তৃণমূলের অনুকূলে ৫০-১।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০০:০৮
Share:

গেটে পুলিশ থাকলেও ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে অবাধেই যাতায়াত ।

দীর্ঘদিন বামেদের দখলে থাকা মেদিনীপুর শহরের পিপলস্ কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের পরিচালন সমিতির দখল নিল তৃণমূল। পরিচালন সমিতির মোট আসন ছিল ৫১টি। ৪টি আসনে আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিলেন তৃণমূল সমর্থিত প্রার্থীরা। রবিবার ভোট হয় বাকি ৪৭টি আসনে। ৪৬টি আসনেই জয়ী হন তৃণমূল সমর্থিতরা। একটি আসন পেয়েছে বাম। ফল তৃণমূলের অনুকূলে ৫০-১।

Advertisement

বাম, কংগ্রেস, বিজেপির মতো বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, সন্ত্রাস করে ভোটে জিতেছে শাসক দল। তৃণমূলের গুন্ডা বাহিনী পুলিশের সামনেই বুথ দখল করে অবাধে ছাপ্পা ভোট দিয়েছে। সিপিএমের দাবি, তারা অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার কৌশিক চক্রবর্তীকে লিখিত অভিযোগপত্র দিয়েছে। পুলিশ অবশ্য বড় ধরনের গোলমালের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। একই দাবি সমবায় দফতরের। পশ্চিম মেদিনীপুরের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিষ্ট্রার অফ কো-অপারেটিভ সোসাইটি (এআরসিএস) মদনমোহন ঘোষ বলেন, “সুষ্ঠু ভাবেই নির্বাচন হয়েছে। সামান্য গোলমাল হয়ে থাকতে পারে। তবে আমি কোনও অভিযোগ পাইনি।” পুলিশ সূত্রে খবর, জেলা পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ এ দিন ছুটিতে ছিলেন। গোলমালের পর ঘটনাস্থলে আসেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) অংশুমান সাহা। তাঁকে ঘিরে বাম কর্মী-সমর্থকেরা নিজেদের অভিযোগ জানাতে থাকেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অবশ্য গোলমাল নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে শুধু আশ্বাস দিয়েছেন, অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখা হবে। আর জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান তথা মেদিনীপুরের বিধায়ক মৃগেন মাইতির বক্তব্য, “এই জয় মানুষের জয়। এরই নাম পরিবর্তন!”

বিরোধীদের মতে, খাস মেদিনীপুর শহরে এমন প্রহসনের নির্বাচন কোনও দিন হয়নি। গাড়িতে করে খড়্গপুর থেকে তৃণমূলের গুন্ডা বাহিনী এসেছে বলেও তাদের অভিযোগ। একের পর এক বুথ থেকে বিরোধী এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। বহু ভোটার এসে দেখেছেন, তাঁদের ভোট পড়ে গিয়েছে। শহরের প্রবীণ এক শিক্ষকের কথায়, “বয়স আশি পেরিয়ে গেল। এমন অভিজ্ঞতা কখনও হয়নি। বেলা একটার সময় বুথে গিয়ে শুনলাম, আমার ভোট পড়ে গিয়েছে।”

Advertisement

সমবায় ব্যাঙ্ক দখলের পরে তৃণমূলের জয়োল্লাস।

সকাল ১১টা নাগাদ এ দিন অশান্তি শুরু হয়। বেলা ১২টা নাগাদ গোলমাল চরমে পৌঁছয়। প্রতিবাদে বিরোধী এজেন্টদের অধিকাংশ বেলা ১টা নাগাদ ভোটগ্রহণ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসেন। সিপিএমের শহর জোনাল সম্পাদক সারদা চক্রবর্তী জানান, তৃণমূলের গুন্ডা বাহিনী বুথের দখল নেওয়ার পরই তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রার্থী প্রার্থিপদ প্রত্যাহার করেন। ভোটে সন্ত্রাসের অভিযোগে এলআইসি মোড় অবরোধ করেন কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকেরা। গোলকুঁয়াচকে অবরোধ করে বামেরা। আর পঞ্চুরচকে বিজেপি-র কর্মী- সমর্থকেরা। এই তিন পৃথক পথ অবরোধের জেরে ভোগান্তিতে পড়েন পথচলতি মানুষ। কিছু পরে অবশ্য পুলিশের আশ্বাসে অবরোধ ওঠে। সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য কীর্তি দে বক্সীর অভিযোগ, “শহরের বুকে ভোট লুঠ করা হল। সবটাই পরিকল্পনামাফিক। সুষ্ঠু ভাবে ভোট হলে ওরা একটা আসনও পেত না।” বিজেপির শহর সভাপতি অরূপ দাস বলেন, “এ ভাবে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হবে, কেউই ভাবতে পারেননি।” বুথ এজেন্ট ছিলেন শহরের কংগ্রেস কাউন্সিলর কৌস্তভ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “বিরোধী এজেন্টদের মেরেধরে বার করে দেওয়া হল। কেশপুর-গড়বেতায় এ ভাবে ভোট হয়। একই কায়দায় মেদিনীপুর শহরে ভোট করাল তৃণমূল।”

বিরোধীদের অভিযোগ, শাসক দলকে বুথ দখলের পথ করে দিয়েছে পুলিশই। সাধারণত যে কোনও নির্বাচনেই ভোটারকে পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোটগ্রহন কেন্দ্রে ঢুকতে হয়। অন্যদিকে, ভোটগ্রহন কেন্দ্রে ঢুকতে পারেন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। বুথে তাঁদের যেতে দেওয়া হয় না। এই ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টোটা। যে পেরেছেন, সেই অবাধে মেদিনীপুর কলেজের ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ঢুকেছেন। দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। অন্য দিকে, বেছে বেছে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ অবশ্য পক্ষপাতের অভিযোগ মানতে চায়নি।

শহরের এই সমবায় ব্যাঙ্কের পরিচালন সমিতির দখল নেওয়াটা যে শাসক দলের জরুরি ছিল, তা বোঝা গিয়েছে তৃণমূল শিবিরের ছবিতেই। ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের অদূরে দলের ক্যাম্প অফিসে হাজির ছিলেন জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান মৃগেন মাইতি, দলের জেলা সভাপতি দীনেন রায়, দুই জেলা কার্যকরী সভাপতি প্রদ্যোৎ ঘোষ, আশিস চক্রবর্তীরা। ভোট-লুঠের অভিযোগ প্রসঙ্গে দীনেনবাবুর বক্তব্য, “বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে তেমন গোলমাল হয়নি।”

ছবি: সৌমেশ্বর মণ্ডল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement