কল্যাণী থানার সামনে ছাত্রদের হাতে ভাঙচুর হওয়া পুলিশের গাড়ি।
সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কিছু ছাত্রের বিরুদ্ধে কল্যাণী থানায় ভাঙচুরের অভিযোগ উঠল। ভাঙচুর করা হয়েছে পুলিশের গাড়িও। ছাত্রদের হাতে আক্রান্ত হন চার পুলিশকর্মী। অভিযোগ, থানায় ‘হামলা’ চালানোর সময়ে কল্যাণী গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওই ছাত্রদের প্রশ্রয় দিয়েছেন কলেজের রেজিস্ট্রার বিষ্ণুপদ বিশ্বাস। তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রবিবার কল্যাণীর বিশেষ আদালতে তাঁকে হাজির করা হলে বিষ্ণুপদবাবুকে জেল হাজতে রাখার নির্দেশ দেন বিচারক। সোমবার ফের আদালতে তোলা হবে তাঁকে। বিষ্ণুপদবাবু অবশ্য সমস্ত অভিযোগই উড়িয়ে দিয়েছেন। ছাত্রদেরও দাবি, শান্তিপূর্ণ ভাবেই বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে।
ধৃত রেজিস্ট্রার বিষ্ণুপদ বিশ্বাস।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার রাতে। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পিছনে পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের অনুকূল মোড়ে রাত ১০টা নাগাদ স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে বচসা বাধে ওই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কয়েক জন আবাসিক ছাত্রের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেই দিন রাতে কিছু ছাত্র মদ্যপ অবস্থায় হস্টেলে ফিরছিলেন। সে সময়েই অনকূল মোড়ে বসে থাকা স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে তাঁদের কথা কাটাকাটি শুরু হয়। তা গড়ায় হাতাহাতিতে। ছাত্রদের পাল্টা অভিযোগ, একটি মদের ঠেক রয়েছে ছাত্রাবাসের কাছেই। ওই ঠেকটি নিয়ে আপত্তি জানালে স্থানীয় যুবকেরাই তাঁদের মারধর করেন।
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের জেরে এলাকা তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কিছু ছাত্র পুলিশের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখান। রেজিস্ট্রারই এই ঘটনায় মদত দেন বলে অভিযোগ। স্থানীয় কাউন্সিলর তৃণমূলের বাসন্তী দাস পরিস্থিতি সামাল দিতে ছাত্রাবাসে গেলে তাঁকেও হেনস্থা করা হয় বলে অভিযোগ। বাসন্তীদেবী বলেন, “ওদের জন্যই ছুটে গিয়েছিলাম। আমরা ওদের বলেছিলাম অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে দিতে। কিন্তু ছাত্রেরা চিৎকার করতে লাগল যে, অভিযুক্তদের ওদের হাতে তুলে দিতে হবে। ওরাই নাকি যা ব্যবস্থা করার করবে। আমাকেও অকথ্য গালিগালাজ করে কয়েক জন ছাত্র।”
এর পর পুলিশ রেজিস্ট্রারকে লিখিত অভিযোগ জানানোর কথা বললে শ’দেড়েক ছাত্রকে নিয়ে তিনি কল্যাণী থানায় যান। অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরে পুলিশ বেরিয়ে যায় অভিযুক্তদের ধরতে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সে সময়ে থানাতেই বসেছিলেন ওই ছাত্রেরা। ভোর ৩টের পরেও পুলিশ কারওকে ধরতে না পারায় থানায় বিক্ষোভ শুরু করেন তাঁরা। অভিযোগ, বিষ্ণুপদবাবু নিজেই ডিউটি অফিসারের টেবিল উল্টে ফোন ভেঙে কাগজপত্র লন্ডভন্ড করে দেন। পুলিশকর্মীদের লক্ষ করে ইট-পাটকেল ছোড়া হয়। চার জন পুলিশকর্মী জখম হন। অভিযোগ, মহিলা পুলিশদেরও কটূক্তি করা হয়। পুলিশকে তাড়া করেন ছাত্ররা। আইসি-র গাড়ি-সহ বেশ কয়েকটি গাড়ির কাচ ভাঙা হয়।
পুলিশ পাল্টা লাঠি নিয়ে তাড়া করে ছত্রভঙ্গ করে ছাত্রদের। পুলিশের দাবি, সে সময়ে গুলিও ছোড়ে বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ অফিসারদের অকথ্য গালিগালাজ করার পাশাপাশি কর্তব্যরত সরকারি কর্মীদের উপর হামলা, সম্পত্তি ভাঙচুর ও সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগে রেজিস্ট্রার ও ৯ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করা হয়। তবে কোনও ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়নি। নদিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অরিন্দম দত্ত রায়চৌধুরী বলেন, “পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর হলেও রেজিস্ট্রারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের খোঁজে তল্লাশি চলছে।” তবে বিষ্ণুপদবাবুর কথায়, “আমি থানার ভিতরে যত ক্ষণ ছিলাম, কোনও বিক্ষোভ হয়নি।” আর ছাত্রদের বক্তব্য, এলাকার যে যুবকরা তাদের মারধর করেছিল, তাদের গ্রেফতারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ ভাবেই বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন তাঁরা। ওই কলেজের অধ্যক্ষ কৃষ্ণেন্দু চক্রবর্তী বলেন, “রাতে আমি ঘটনার কথা জানতে পারিনি। পুরো ঘটনাই অনভিপ্রেত।” পুলিশ জানিয়েছে, ছাত্ররা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, তাদের খোঁজেও তল্লাশি চলছে।
বিষ্ণুপদবাবু কল্যাণীর তৃণমূল বিধায়ক রমেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের আত্মীয়। এলাকার তৃণমূল নেতৃত্ব চান এই ঘটনায় পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নিক। পুরসভার বিরোধী দলনেতা সিপিএমের শান্তনু ঝা বলেন, “বিধায়কের আত্মীয়, এই পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে একটা সরকারি কলেজের প্রশাসনিক কর্তা যে ভাবে আইন ভাঙলেন, ছাত্রদের বিপথে চালিত করলেন, সেটা নিন্দনীয় বলাই যথেষ্ট হয় না। প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা নিক।” রমেন্দ্রনাথবাবুর ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। কল্যাণী পুরসভার চেয়ারম্যান তৃণমূলের নীলিমেশ রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ জানাতে বলেছি নিগৃহীত কাউন্সিলরকে।” আর কল্যাণীর যুব তৃণমূল নেতা অরূপ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “থানায় ঢুকে গণ্ডগোল পাকানোটা অন্যায় হয়েছে। আমরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছি।”
ছবি: বিতান ভট্টাচার্য।