তদন্তে নামল পুলিশ।
মাস ছয়েক আগে বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল ছেলেটি। কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিল।
নাকাশিপাড়ায় পাঁচ বছরের শিশু কোয়েলকে খুনের মামলায় সেই যুবককেই খুঁজছে পুলিশ। কিন্তু গোটা একটা দিন পেরিয়ে গেলেও তার নাগাল পায়নি। ,গত বৃহস্পতিবার, কোয়েল নিখোঁজ হওয়ার রাত থেকেই সে উধাও।
তদন্তে নামা ইস্তক পুলিশের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেশি কুল। যে যুবক উধাও হয়ে গিয়েছে, কুল গাছ থাকার দরুণ গ্রামে তাদের বাড়িটি ‘কুলবাড়ি’ বলে পরিচিত। কুলের লোভে আশপাশের অনেক শিশুরই ওই বাড়িতে যাতায়াত। যে নির্মীয়মাণ বাড়ির সিঁড়িতে রক্তের দাগ পাওযা গিয়েছে, সেখানেও পাওয়া গিয়েছে দেশি কুল।
ওই বাড়ির পিছনে লেবু বাগানের ভিতরে যেখানে কনডোমের ছেঁড়া প্যাকেট মিলেছে, সেখানেও পুলিশ কুল পড়ে থাকতে দেখেছে। শুক্রবার সকালে তার কাছেই পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল কোয়েলের মৃতদেহ। প্রাথমিক ভাবে পুলিশের অনুমান, ওই সব কুল একই গাছের। এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে কুলের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠাচ্ছে পুলিশ।
যে মাঠে শিশুটিকে শেষ বারের মতো খেলতে দেখা গিয়েছিল, তার এক দিকে কোয়েলদের বাড়ি, উল্টো দিকে কুলবাড়ি। গ্রামবাসী জানান, মাঠের পাশে কুলগাছের নীচে এলাকার শিশুরা বেশির ভাগ সময়ে ভিড় করে থাকে। সেই ভিড়ে থাকত ফুল ব্যবসায়ী অমর বৈদ্যের মেয়ে কোয়েলও।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সে তার কাকার ছেলে, বছর সাতেকের আকাশের সঙ্গে খেলা করছিল। আকাশ পুলিশকে জানিয়েছে, খেলা শেষে কোয়েল কুল গাছতলার দিকেই ছুটে দেয়। তার পর থেকে আর তার কোনও খোঁজ মেলেনি।
কোয়েলকে কেন খুন করা হল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। প্রত্যক্ষদর্শী আত্মীয়-পড়শিদের সঙ্গে পুলিশের বক্তব্যেও ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
কোয়েলের মা শীলা বৈদ্য বা তার বারো বছরের দিদি মৃতদেহ দেখেননি। কিন্তু লেবু বাগানে গিয়ে দেহ দেখেন কাকিমা রীতা। তাঁর দাবি, ‘‘শরীরে আর মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্যান্টের নিচে তলপেটেও রক্ত দেখেছি।’’ মুখে, কপালে, বুকে-পিঠে চোট-আঘাতের কথা পুলিশও বলছে।
কিন্তু তদন্তকারী পুলিশ অফিসার মুকুল মিঞাঁর দাবি, কোয়েলের ঠৌঁটে রক্ত লেগে থাকলেও নিম্নাঙ্গে কোন রক্তের দাগ তাঁরা দেখেননি। রীতা বলেন, ‘‘আমি নিজে না দেখলেও লোকমুখে শুনেছি, কোয়েলের হাতে নাকি দশ টাকার নোট ধরা ছিল। ওরা খুব গরিব। ঠিক মতো খাওয়া হয় না। সেই কারণেই হয়তো টাকার লোভ দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে ওর উপরে অত্যাচার করেছে।’’ যদিও পুলিশের দাবি, সুরতহালের সময়ে শিশুটির হাতে কোনও টাকা ছিল না। ধর্ষণেরও প্রমাণ মেলেনি বলে পুলিশের দাবি।
কনডোমের ছেঁড়া প্যাকেট নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এতে কেউ-কেউ যেমন ধর্ষণের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন, পুলিশেরই একটি মহলের প্রশ্ন, পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করার জন্য কনডোমের কী দরকার? না কি, অন্য কারও যৌনকর্ম দেখে ফেলার মাসুল দিতে হয়েছে তাকে? তা যদি সত্যিও হয়, শিশুটিকে এত মারধর কেন করা হল তা পরিষ্কার নয়।
জেলা পুলিশের এক কর্তার কখায়, ‘কেন সারা শরীরে এত আঘাতের চিহ্ন? শ্বাসরোধ করে বা অন্য কোনও সহজ উপায়েই খুন করা যেত!’’ পুলিশের একটা বড় অংশের মতে, খুনির কোনও গোপন জিঘাংসা বা বিকৃতি না থাকলে এত এলোপাথাড়ি আঘাত করা স্বাভাবিক নয়।
পরিবারটির প্রতি কারও কোনও জিঘাংসা ছিল কি?
কোয়েলের মা শীলার বক্তব্য, ‘‘আমরা খুবই গরিব। আমাদের প্রতি কেন কারও রাগ থাকবে? তবে এটুকু বলতে পারি যে কোয়েল শেষ বার ওই বাড়িটার দিকেই গিয়েছিল। তার পরে আর ওকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওই ছেলেটা সে দিন থেকেই উধাও হয়ে গিয়েছে। এ বার ভাবুন, কে খুন করে থাকতে পারে।’’
এরই মধ্যে পুলিশ গ্রামের তিন যুবককে থানায় নিয়ে গিয়ে জেরা করেছে পুলিশ। কিন্তু তেমন কিছু না পাওয়ায় তাদের ছেড়েও দেওয়া হয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এক যুবকের খোঁজে তল্লাশি চলছে। তাকে ধরতে পারলেই তদন্ত অনেকটা এগোবে।’’