অসীমকুমার সাহা
কারাবাস তার কাছে আশীর্বাদ হয়েছিল। কারণ, জেলে ঢুকে সে ভিন্ রাজ্যে অপরাধের জাল ব্যাপক ভাবে ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায়। কয়েক জন বন্দিকে নিজের নেটওয়ার্কে সামিল করে। ভারতীয় টাকার জাল নোটের নেটওয়ার্ক। এতটাই ব্যাপক ছিল সেই জাল যে, পঞ্জাব, হরিয়ানা থেকে দামী গাড়ি হাঁকিয়ে মালদহে তার কাছে উজিয়ে এসে প্রতি সপ্তাহে ৩০-৪০ লক্ষ টাকার জাল নোট নিয়ে যেত সে সব রাজ্যের কারবারিরা।
জাল নোট চক্রের সেই চাঁই, মালদহের অসীমকুমার সাহা, প্রায় দেড় বছর পালিয়ে বেড়ানোর পরে মঙ্গলবার ভোরে ধরা পড়েছে এনআইএ-র গোয়েন্দাদের হাতে। এনআইএ জানিয়েছে, কলকাতা বিমানবন্দরের ২ নম্বর গেটের কাছে যশোর রোড থেকে ৩৬ বছরের অসীমকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএ-তে মামলা রয়েছে। গত ৩০ অগস্ট অসীমের হদিস পেতে ৫০ হাজার টাকা ইনাম ঘোষণা করে এনআইএ। জাল নোটের কোনও কারবারির ক্ষেত্রে এটাই সর্বোচ্চ ইনাম।
অসীমের বাড়ি কালিয়াচকের চরিঅনন্তপুরে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ওই এলাকায় অসীমের এতটাই প্রভাব যে, কেউই তার ব্যাপারে মুখ খুলছিল না। এনআইএ-র এক কর্তা বলেন, ‘‘এর পরে আমরা ইনাম ঘোষণা করি। আর অসীমকে ধরতে সেটাই কাজে এসেছে।’’গোয়েন্দা সূত্রের খবর, এ রাজ্যে তো বটেই, ভিন রাজ্যেও জাল নোটের কারবারে অসীম পুরনো নাম। ২০১২ সালে পঞ্জাব পুলিশ তাকে জাল নোটের একটি মামলায় গ্রেফতার করে এবং বিচারে সাজা পেয়ে বছর খানেকের জন্য তার ঠাঁই হয় পাটিয়ালা জেলে। সেখানেই নিজের জাল আরও ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় অসীম।
তদন্তকারীরা জানান, পাটিয়ালা জেলে পঞ্জাবের ফতেগড় সাহিবের ব্যবসায়ী রাজন চোপড়ার সঙ্গে আলাপ হয় অসীমের। রাজনের কেটারিং ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট-এর ব্যবসা। অনুষ্ঠানের জন্য হল-ও ভাড়া দিত সে। তবে বহু ক্ষেত্রেই লোক ঠকানোর অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সেই সময়ে রাজনও
একটি জালিয়াতির মামলায় সাজা পেয়ে পাটিয়ালা জেলে। আবার ওই জেলেই ছিল রাজনদের ঘনিষ্ঠ, হরিয়ানার অম্বালার সুনেশ শর্মা। সুনেশের কাছ থেকে দামী গাড়ি ভাড়া নিত রাজন। জালিয়াতির একই মামলায় রাজন আর সুনেশ দু’জনেই জড়িয়েছিল।
গোয়েন্দারা জেনেছেন, জেলে অসীম ওই দু’জনকে বোঝায়, তাদের ব্যবসায় বহু নগদ লেনদেন হয় এবং জাল নোটে পাওনা মেটালে বিপুল লাভ। সাজা খেটে বেরনোর পরে এক সঙ্গে তারা কাজ শুরু করে। তবে গত বছর ১২ মে রাজন ও সুনেশ কালিয়াচকের সুজাপুর হাসপাতাল মোড়ে ন’লক্ষ টাকার জাল নোট-সহ ধরা পড়ে যায়। তাদের জেরা করে অসীমের নাম বেরোয়। তার পর থেকেই অসীম পলাতক। এ বছর জুনে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ হয়।
এনআইএ সূত্রের খবর, পাটিয়ালা জেলে অসীম পঞ্জাবের আরও কয়েক জনকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে জাল নোটের কারবারে টেনেছিল।। এক গোয়েন্দা অফিসার বলেন, ‘‘মালদহের হোটেলের ঘরেই ভিন্ রাজ্য থেকে আসা লোকেদের জাল নোট দিত অসীম। ফলে ক্রেতাদের ঝুঁকি কম।’’ গোয়েন্দারা জানান, ৩০০-৩২০ আসল টাকায় ১০০০ টাকার জাল নোট কিনত অসীম। তার পরে ৪৫০ টাকায় বিক্রি করত হাজার টাকার ওই জাল নোট।