Manisankar mukhopadhyay

স্বতন্ত্র জগতের খোঁজ

আমার মা-বাবা বিবাহকালে উপহার পেয়েছিলেন একাধিক চৌরঙ্গী। একটি সাক্ষাৎকারে শংকর নিজেই জানিয়েছিলেন, ২০১২ সাল পর্যন্ত চৌরঙ্গী উপন্যাসের ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

যশোধরা রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৫
Share:

মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।

মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, সংক্ষেপে শংকর চলে গেলেন। একটা যুগাবসান ঘটল, এই বহুব্যবহৃত বাক্যটি অন্তত শংকরের ক্ষেত্রে একেবারেই অতিকথন নয়। বস্তুত যে দশকগুলোতে আমাদের প্রজন্মের বেড়ে ওঠা, সেই দশকগুলো অধিগত ছিল বা বলা ভাল অধিকৃত ছিল বাংলা গল্প উপন্যাসের লেখকদের, এবং শংকরের মতো সফল জনপ্রিয় লেখকদেরই। গৃহবধূ থেকে কেরানি, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে, বিনোদন যখন ছিল বই পড়া, পাড়ায় পাড়ায় ছিল আম পাঠকের জন্য অজস্র লাইব্রেরি, আর বিবাহ, জন্মদিন, বা অন্য যে কোনও উপলক্ষে যখন উপহার হিসেবে ছিল বই, সে সময়ের বাংলা সাহিত্যকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে গিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের অন্যতম শংকর।

আমার মা-বাবা বিবাহকালে উপহার পেয়েছিলেন একাধিক চৌরঙ্গী। একটি সাক্ষাৎকারে শংকর নিজেই জানিয়েছিলেন, ২০১২ সাল পর্যন্ত চৌরঙ্গী উপন্যাসের ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। আর একটি বই ঘরে ঘরে থাকত, স্বর্গ মর্ত্য পাতাল নামে একত্রিত তিন উপন্যাস। যার দু’টি আজকের বাঙালি চিনেছেন সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রায়ণের সুবাদে, জন-অরণ্য ও সীমাবদ্ধ। অন্যটি ছিল, আশা আকাঙ্ক্ষা। নানা রকমের প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘প্রাইভেট লিমিটেড’ শব্দবন্ধ পড়ে যে বয়সে কৌতূহল হত এর অর্থ জানার, সেই সময়েই শংকরের সীমাবদ্ধ বলে দিয়েছিল লিমিটেড শব্দটির সীমিতি ও বন্দিত্বের অভিঘাত। এ ভোলার নয়।

এপ্রিল ১৯৫৫-তে প্রকাশ পায় কত অজানারে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পায় বিপুল জনপ্রিয়তা এবং ‘কাল্ট স্টেটাস’ । এই বইয়ের চরিত্র বারওয়েল, ভারতের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার। ওল্ড পোস্ট আপিস স্ট্রিটে সাক্ষাৎ কাহিনির কেন্দ্রীয় কথকের সঙ্গে এই সাহেব ব্যারিস্টারের। এ লেখা শুরু করেছিলেন লেখক তাঁর ১৯ বছর বয়সে। বাস্তব জীবনে এই ইংরেজ উকিলের ‘মুনশিয়ানা’ করতে করতেই পেশাগত জীবনের একটা মাইলফলক পেরিয়েছিলেন শংকর। শহর কলকাতার অলিগলিকে তিনি বিখ্যাত ভাবে প্রায় ডিকেন্সীয় ঢঙে নানা পেশা অবলম্বনের মধ্য দিয়ে দেখেছিলেন। চূড়ান্ত দারিদ্র নয়, কিন্তু অনিশ্চিতি আর ঝুঁকিপ্রবণতার এক শহুরে জীবনপথকে ছেনে দেখা এই কথাসাহিত্যিক যেন প্রচলিত গণ্ডির বাইরে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতন টেনে নিলেন বাংলার আম পাঠককে। হরেক অভিজ্ঞতা, হরেক পেশার গল্প দিয়ে এক সরস উপাদেয় অথচ তথ্যমূলক লেখার জগৎ তৈরি করেছিলেন তিনি। এমন জনপ্রিয়তা সেই পঞ্চাশ ষাট সত্তর দশকে স্বল্পই লেখক পেয়েছিলেন, আবার ওই দশকগুলোই সম্ভব করেছিল এঁদের মতো মহীরুহের সৃষ্টি। কেননা টেলিভিশন আমদানির পূর্বযুগে বই পড়াই বিনোদনের সেরা তখন।

বাংলা সাহিত্যে, বোধ করি, তথাকথিত শিক্ষক-অধ্যাপক পেশার লেখকদের প্রজন্ম থেকে সম্পূর্ণ সরে আসার ধারা চলছে এই দশকগুলিতে। তার মধ্যে স্বতন্ত্র, নিজস্ব, ভিন্ন, নতুন, অচেনা পেশাগত জগৎকে, বেসরকারি কর্মজগৎকে দারুণ নিখুঁত বিবরণধর্মিতায় খুলে দেওয়া পাঠকের সামনে— এটাই শংকরের ইউএসপি, আজকের ভাষায়। আগে-পরে অনেক লেখক এসেছেন উপন্যাসের ক্ষেত্রে, অনেক বিস্তৃত, বৃহৎ কর্মকাণ্ড নিয়ে। কিন্তু শংকর নিজের জায়গাটি প্রথম দিন থেকে যে ভাবে তৈরি করেছিলেন, তা অনন্য এবং বিস্ময়কর।

৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বাংলা সাহিত্যের এই যুগন্ধর। আমাদের কাছে রয়ে গেল তাঁর ক্ষুরধার দেখাটি। চৌরঙ্গীর মতো সফল কাহিনি যা উপন্যাস হিসেবে ক্লাসিক, চলচ্চিত্র আকারেও উত্তমকুমারের গুণে কাল্টধর্মী, পরবর্তীতে রিমেকের অনুপ্রেরণাও, প্রকাশের পর-পরই হিন্দিতে অনূদিত ও পেপারব্যাক পকেটবুক হিসেবে তুমুল পঠিত, ইংরেজি অনুবাদে (অরুণাভ সিংহ কৃত) পুরস্কারপ্রাপ্ত। ২০২১ সালে তাঁর আত্মজীবনী একা একা একাশি-র জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্তি মনে করায়, কিছু কিছু সময়ে পুরস্কারদেরই দেরি হয়ে যায় প্রাপকের কাছে পৌঁছতে। আসলে কোনও পুরস্কার দিয়েই মাপা যায় না জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে গগনচুম্বী শংকরকে। সর্বভারতীয় স্তরে, ভারতীয় পাঠক তিন জনকে সবচেয়ে ভাল চেনেন, হিন্দি অনুবাদের মাধ্যমে। তাঁরা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী ও শংকর।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন