জাতীয় সড়কে ভুটভুটি, অটো। — নিজস্ব চিত্র
হিলি সীমান্ত থেকে ত্রিমোহিনী হয়ে ঠাকুরপুরা দিয়ে সোজা চলে গিয়েছে ৫১২ নম্বর জাতীয় সড়ক। বুধবার বিকেলে এই রাস্তারই সেঁওয়াই মোড়ের কাছে ভুটভুটিকে বাঁচাতে গিয়ে বালুরঘাটের সাংসদ অর্পিতা ঘোষের গাড়ি উল্টে যায়। হাত ও পায়ের হাড় ভেঙে গুরুতর জখম হন অর্পিতা। এখন তিনি কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুর্ঘটনাও এড়ানো যায়নি। অর্পিতার গাড়ির ধাক্কায় সেই ভুটভুটির এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। কিন্তু ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টা কেটে গেলেও ওই পথে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচলের ছবিটা এতটুকুও বদলায়নি।
বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনাস্থল ওই সেঁওয়াই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার মোড়গুলিতে ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থাই নেই। তাই সংযোগকারী ছোট রাস্তা থেকে জাতীয় সড়ক ধরে দেদার ভুটভুটি, অটো চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অটো-ভুটভুটির দাপটে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে জাতীয় সড়কে চলতে হয়। প্রশাসন বিষয়টি আগে থেকে নজর দিলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। জেলাশাসক তাপস চৌধুরী বলেন, ‘‘জাতীয় সড়কে স্পিড ব্রেকার দেওয়ার নিয়ম নেই। অনেক ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত থেকে ভুটভুটির লাইসেন্স দেওয়া হয়। কিন্তু হাইওয়েতে ভুটভুটি চলতে পারবে না। ভোটের পর পঞ্চায়েতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে জাতীয় সড়কে ভুটভুটি চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ জারি করা হবে।’’
তত দিন অবশ্য বদলের কোনও আশা দেখা যাচ্ছে না। বালুরঘাট থেকে হিলি যাওয়া ওই জাতীয় সড়কের মাঝে দেখা গিয়েছে সেঁওয়াই মোড়, খাঁপুর মোড়, কামালপুর মোড়ে গ্রামীণ সরু পাকা রাস্তাগুলি ওই জাতীয় সড়কে এসে মিলেছে। ব্যস্ত ওই জাতীয় সড়ক দিয়ে রোজ হিলির দিকে যায় বহির্বাণিজ্যের পণ্যবোঝাই ট্রাক ও লরির সারি। তাদের মধ্যেই গ্রামীণ রাস্তা ধরে হাট থেকে মালপত্র ও যাত্রী নিয়ে ছুটে চলছে যন্ত্রচালিত রিকশাভ্যান ভুটভুটি, অটো, ট্র্যাক্টর। বুধবার বিকেলে হিলি থেকে ফেরার পথে অর্পিতার গাড়ি সেঁওয়াই মোড়ের একটি বাঁকের কাছে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। সে সময় ওই ভুটভুটি ছাড়াও একটি যাত্রীবাহী বাস দ্রুতগতিতে পাশাপাশি চলে আসে। বাসটিকে কাটিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। ভুটভুটিকে ধাক্কা মেরে সাংসদের গাড়িটি রাস্তার পাশে একটি গাছে ধাক্কা দেয়। তার পরে পাশের নয়ানজুলির জলে পড়ে যায়। দুর্ঘটনায় ওই ভুটভুটির যাত্রী প্রদীপ বেসরা নামে (১৯) বালুরঘাটের চকরামপ্রসাদ গ্রামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। সেই সময় গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ে গলি রাস্তা থেকে জাতীয় সড়কে উঠছিল স্থানীয় বাসিন্দা মধুমিতা বর্মণ। গাড়ির ধাক্কায় ওই ছাত্রীও আহত হয়। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, দ্রুতগামী রাস্তায় দুর্ঘটনা এড়াতে গতি নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? কেনই বা জাতীয় সড়কে অটো, ভুটভুটির মতো যানবাহন নিষিদ্ধ করা হয়নি? ওই এলাকায় বাসিন্দা শিক্ষক প্রশান্ত মন্ডল, কৃষিজীবী শ্যামল মন্ডল, দীপেন মোহান্তরা বলেন, ‘‘হাটের দিনগুলিতে রাস্তার অবস্থা আরও বিপজ্জনক হয়ে যায়। একেই দিনরাত বাইরের ট্রাক-লরি ওই রাস্তা ধরে অনবরত হিলির দিকে যাতায়াত করে। তার উপর জায়গায় জায়গায় সংযোগকারী রাস্তাগুলি থেকে ভ্যানো (ভুটভুটি), অটো বিনা বাধায় জাতীয় সড়কে উঠে পড়ে। ফলে বড় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকেই যায়।’’ জেলা পুলিশ সুপার রশিদ মুনির খান বলেন, ‘‘জাতীয় সড়কের সঙ্গে যেখানে গ্রামীণ রাস্তাগুলি যুক্ত হয়েছে, সে সব জায়গায় ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণে কী করা যায়, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা হচ্ছে।’’
এ দিনও দুর্ঘটনাস্থলে সেই একই দৃশ্য। মনে হচ্ছিল, ২৪ ঘণ্টা আগে এখানে কোনও দুর্ঘটনাই ঘটেনি। সেই একই ভাবে চলেছে ভুটভুটি, অটো। আদৌ কি বদলাবে এই ছবি, প্রশ্ন করছেন স্থানীয় মানুষরাই।