অক্টোবরেও ৩০ ডিগ্রি, কালিম্পঙে চাহিদা এসি-র

কলকাতাকে ছুঁয়ে ফেলছে কালিম্পং! অক্টোবরে বাংলার এই শৈলশহরের তাপমাত্রা দেখে এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। চিরাচরিত হিমেল আবহাওয়ার বদলে কালিম্পঙে রীতিমতো গরম! ফ্যান, টেবিল ফ্যান কিনতে স্থানীয় বাসিন্দারা লাইন দিচ্ছেন দোকানে।

Advertisement

কিশোর সাহা

শেষ আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০১৪ ০১:৫৮
Share:

বিক্রি হচ্ছে পাখা। কালিম্পঙে বিশ্বরূপ বসাকের তোলা ছবি।

কলকাতাকে ছুঁয়ে ফেলছে কালিম্পং!

Advertisement

অক্টোবরে বাংলার এই শৈলশহরের তাপমাত্রা দেখে এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। চিরাচরিত হিমেল আবহাওয়ার বদলে কালিম্পঙে রীতিমতো গরম! ফ্যান, টেবিল ফ্যান কিনতে স্থানীয় বাসিন্দারা লাইন দিচ্ছেন দোকানে। আবহবিদদের একাংশ বলছেন, এখন কালিম্পং মহকুমার কোথাও কোথাও দিনের তাপমাত্রা উঠে যাচ্ছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও উপরে। মঙ্গল ও বুধবার কালিম্পং শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই সময়ে কলকাতার তাপমাত্রা তার চেয়ে সামান্য কয়েক ডিগ্রি বেশি।

কালিম্পঙের পুরনো বাসিন্দারা বলছেন, অক্টোবরে বেশ শীত-শীত ভাব পড়ে যেত এই শৈলশহরে। গায়ে চাপাতে হত হাল্কা জ্যাকেট। কিন্তু এখন তো গায়ে মোটা জামা চাপানোর কথা শুনলেই আঁতকে উঠছেন তাঁরা। অনেকেই বলছেন, কালিম্পঙের চেনা জলবায়ুটাই যেন বদলে গিয়েছে। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতের চেনা ছন্দটাই আর মেলে না। আবহবিদেরা এর জন্য দায়ী করছেন অনিয়মিত বৃষ্টিপাতকে। তাঁরা বলছেন, সময়ে বৃষ্টি না হওয়াতেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তার ফলেই তাপমাত্রার এমন উল্টো মতিগতি। শুধু কালিম্পং নয়, উত্তরবঙ্গের প্রায় সব শৈলশহরেই এমন পরিবর্তন দেখছেন আবহবিজ্ঞানীরা।

Advertisement

কালিম্পঙের চেহারা যে ক্রমশ বদলাচ্ছে, তা গত কয়েক বছর ধরেই মালুম হচ্ছিল এলাকার পুরনো বাসিন্দাদের। কী সেই বদল?

এই শৈলশহরের বড় হোটেল, দোকানে বসছিল বাতানুকূল যন্ত্র। এখন তো ছোট-মাঝারি মাপের হোটেলেও বাতানুকূল যন্ত্র থাকছে। ফ্যান, টেবিল ফ্যানের দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। শহরে সাড়ে তিন দশক ধরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবসা মিত্তল পরিবারের। দোকানের কর্ণধার অভিষেক মিত্তল বললেন, “বছর দশেক হল ফ্যানের চাহিদা দেখা যাচ্ছে। এখন তো হু-হু করে বিক্রি হয়। এ বার কুলার, এসি-র চাহিদাও বাড়ছে।”

হাওয়া যে বদলাচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে শহরের পুরনো বাসিন্দাদের চালচলনেও। কালিম্পঙের বিধায়ক তথা গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা হরকাবাহাদুর ছেত্রী শহরে থাকলে সকালে ঘণ্টাখানেক ডম্বরচকে হাঁটাহাঁটি করতেন। এ দিন মিনিট কুড়ি হেঁটেই দরদর করে ঘামতে শুরু করলেন। বাড়ি ফিরে শরীর জুড়োতে ফ্যান চালিয়ে বসতে হল তাঁকে। প্রবীণ মোর্চা নেতা বলছেন, “কালিম্পং কী ছিল, আর কী হয়ে গেল! অক্টোবরে হাল্কা জ্যাকেট গায়ে দিতাম। এখন তো জ্যাকেটের কথা ভাবলেই ঘাম দিচ্ছে।”

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রধান সুবীর সরকার পাহাড়ি এলাকার জলবায়ুর পরিবর্তনের ব্যাপারে একাধিক সমীক্ষা করিয়েছেন। তাতেই ধরা পড়েছে, পাহাড়ের অন্য এলাকার তুলনায় কালিম্পঙের তাপমাত্রা গড়ে ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ছে।

কেন এই হাল? আলিপুর আবহাওয়া দফতরের অধিকর্তা গোকুলচন্দ্র দেবনাথের ব্যাখ্যা, উত্তরবঙ্গে গত ক’বছর ধরে বর্ষার বৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মেঘ-বৃষ্টির অভাব থাকায় বাড়ছে তাপমাত্রা। “শুধু কালিম্পং নয়, উত্তরবঙ্গের তরাই-ডুয়ার্সের জেলাগুলিতেও একই কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে”বলছেন হাওয়া অফিসের অধিকর্তা।

পরিবেশবিদেরা বলছেন, কালিম্পঙের বদলে যাওয়ার পিছনে বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য দূষণও বড় কারণ। যে ভাবে জঙ্গল কেটে ঘনবসতি বা অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ ও গাড়ি ব্যবহার শুরু হয়েছে, তার ফলেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বর্ষার নিজস্ব ছন্দ নষ্টের পিছনে সেটাও একটা বড় কারণ। হরকাবাহাদুর বলছেন, “আগে কালিম্পঙে ৫০ শতাংশ বনাঞ্চল ছিল। এখন তা ২৫ শতাংশের নীচে নেমে এসেছে বলে শুনেছি।”

এ ছাড়াও পরিবেশবিদেরা জানাচ্ছেন, সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় চারপাশে পাহাড় থাকায় সূর্যের আলো সরাসরি পৌঁছতে পারে না। কিন্তু কালিম্পং পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত, তাই পাহাড়ের আড়াল নেই। এখানে সরাসরি রোদ বেশি পৌঁছয়। সুবীরবাবু বলছেন, এ ছাড়াও আরও নানা কারণ রয়েছে। সেগুলি নিয়ে গবেষণা দরকার। না হলে কালিম্পঙের পরিবেশ আরও খারাপ হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধিও আটকানো যাবে না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement