বদলপুর হাইস্কুল প্রাঙ্গনে নিরাপদেই বংশবৃদ্ধি করে চলেছে মধুকরের দল। ছবি: অমিত মোহান্ত।
ভোরের আলো ফুটলেই তাদের গুঞ্জনে গমগমে হয়ে ওঠে গোটা স্কুল চত্বর। তাছাড়া নাকি দিনের অন্য সময় মোটের পর শান্তই থাকে তারা। কয়েক লক্ষ মৌমাছিকে সঙ্গে নিয়ে তাই বছরের পর বছর দিব্যি কাটাচ্ছেন শিক্ষক আর পড়ুয়ারা। দক্ষিণ দিনাজপুরের বংশীহারি ব্লকের বদলপুর হাইস্কুল প্রাঙ্গনে নিরাপদেই বংশবৃদ্ধি করে চলেছে মধুকরের দল। স্কুলের বারান্দা, কার্নিশ, বারান্দার গ্রিল, শিক্ষকদের ঘরের চারপাশ-সহ গোটা স্কুলভবন ছেয়ে গেছে একের পর এক মৌচাকে। বর্তমানে যার সংখ্যা ৭২টি। স্কুলের ভিতর মৌমাছির এই বংশবৃদ্ধি সাড়া ফেলেছে গোটা এলাকায়।
প্রায় আড়াই হাজার ছাত্রছাত্রীর নিত্য যাতায়াত ওই স্কুলে। খুদে পতঙ্গরা এযাবত্ পড়ুয়াদের কোনও ক্ষতি করেনি। তাই একরকম নিশ্চিন্ত স্কুলের প্রধানশিক্ষক। মৌমাছি থেকে বিপদের সম্ভাবনা মাথায় আসেনি অভিভাবকদেরও। কিন্তু সম্প্রতি বিষয়টি জানতে পেরে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা স্কুল পরিদর্শক। স্কুল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, বছর চারেক আগে থেকেই এই স্কুলের ভেতর কয়েকটি মৌচাক ছিল। ফি বছরই ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাস নাগাদ চাকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। স্কুলের আশপাশের জমিতে এই সময়ে ব্যাপক হারে সর্ষে চাষ হয়। সর্ষে ফুলের মধু সংগ্রহের তাগিদেই এই বাড়বৃদ্ধি বলে মনে করেন তাঁরা। প্রতিবছর মৌচাকের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এবার ৭২টি চাক তৈরি করে ফেলেছে মৌমাছির দল। সকালের দিকটা মধু সংগ্রহের জন্য ভোঁভোঁ শব্দ তুলে দলবেঁধে ঘোরাফেরা ছাড়া স্কুল শুরুর পর তাদের খুব একটা বের হতে দেখা যায়না। স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী চন্দনা দাসের কথায়, “প্রথম প্রথম দু চারজন ছাত্রছাত্রীকে মৌমাছি হুল ফোটালেও প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে আমরা শান্ত থাকায় মৌমাছিরাও শান্ত রয়েছে।” তবে স্কুলের টিফিন আর ছুটির সময় শিক্ষক ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীদের সতর্ক থাকতে হয়, পাছে কোনও খুদে পড়ুয়া মৌচাকে ঢিল না ছোড়ে।
পড়ুয়াদের অভিভাবক শান্ত দাস, বিমল দাসদের কথায়, “গত ৪ বছর ধরে স্কুলের ভিতরে মৌমাছিরা দলে দলে চাক বেধে রয়েছে। খুদে পতঙ্গরা পড়ুয়াদের কোনও ক্ষতি করেনি। তাই মৌচাক ভেঙে ওদের ক্ষেপিয়ে কেউ ক্ষতি করুক আমরা চাই না।” স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিপদতারণ কবিরাজ তো উত্তরোত্তর মৌচাকের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও মৌচাক ভাঙার উপরে রীতিমত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তিনি বলেন,“ছাত্রছাত্রীরা নির্দেশ মেনে কেউই মৌমাছিদের বিরক্ত করেনা। মৌচাকেও কেউ ঢিল ছোড়ে না। ফলে নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে স্কুলকে নিজের আস্তানা করে নিয়েছে মৌমাছিরা।” তিনি জানান, কয়েকদিন আগে ব্লকে অনুষ্ঠিত কৃষিমেলায় আসা সরকারি আধিকারিকেরা এই স্কুলে এসে মৌচাকের বহর দেখে অবাক হয়েছেন। প্রশংসাও করে গিয়েছেন তাঁরা।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা স্কুল পরিদর্শক(ডিআই) দীপঙ্কর রায় অবশ্য বদলপুর হাইস্কুলের মধ্যে ৭২টি মৌচাক তৈরির খবরে অবাক হয়েছেন। তিনি বলেন, “কিছুদিন আগেও ওই স্কুলে ৪৫টি মৌচাক রয়েছে বলে শুনেছিলাম। এই পরিমাণে চাকের সংখ্যা বৃদ্ধিতে অবাক হচ্ছি।” তার বক্তব্য, জীব বৈচিত্রের বিষয়টি ধরলেও বিপদের আশংঙ্কা একটা থেকেই যায়। তিনি বলেন, “কোনও কারণে মৌমাছির দল ক্ষেপে গেলে সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে যেতে পারে। একাধিক মৌমাছির দংশনে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই দিকটা স্কুল কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিত। অবিলম্বে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্থানীয় বিডিও অফিস ও দমকলকে জানিয়ে রাখা উচিত্ স্কুল কর্তৃপক্ষের।
এতদিন বিষয়টি নিয়ে না ভাবলেও স্কুল পরিদর্শক উদ্বেগ প্রকাশ করার পর নড়েচড়ে বসেছে বদলপুর হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষকও। পড়ুয়াদের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তবে এখনই মৌচাক ভাঙার কোনও পরিকল্পনা যে তাদের নেই তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাই পঠনপাঠনের সময় নিস্তব্ধতা আর ছুটির সময় পড়ুয়াদের কোলাহলে অভ্যস্ত এই মধুকরদের দিনলিপিতে আপাতত পরিবর্তন আসছে না কোনওই।