টেবিলের উপর রাখা কয়েক পৃষ্ঠা কাগজ। গোটা বক্তৃতাটাই লিখে এনেছিলেন বছর পঞ্চান্নর রফিকুর রহমান। তৃণমূলের আমডাঙার বিধায়ক। বিধানসভার বাজেট বিতর্কে অংশ নিয়ে তা দেখে গড় গড় করে পড়েও যাচ্ছিলেন দিব্যি। কিন্তু বিড়ম্বনা হলো, দু’পৃষ্ঠা পড়ার পর! তৃতীয় পৃষ্ঠাটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! আতিপাতি করে খুঁজেও না! ফলে ভাঙা রেকর্ডের মতো দ্বিতীয় পৃষ্ঠার শেষ বাক্যের অসম্পূর্ণ অংশটুকুই আউড়ে যাচ্ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল ক্রমশ অস্বস্তি গ্রাস করছে তাঁকে! ততক্ষণে আশপাশে শুরু হয়ে গিয়েছে ফিসফাস, কানাকানি। অধিবেশন বয়কট করে বিরোধীরা সভায় নেই। কিন্তু সতীর্থ তৃণমূল বিধায়করাই মুখ টিপে হাসাহাসি শুরু করে দিয়েছেন। এমনকী দলেরই কেউ পিছন থেকে ফুট কাটলেন, ‘‘বাংলায় ফিরে এসো বাবা!’’
আর এক বিধায়কের টিপ্পনি, ‘‘রফিকুরের বক্তৃতাই বুঝি বিধানসভায় বর্তমান শাসক দলের কোনও সদস্যের ইংরেজিতে দেওয়া শেষ বক্তৃতা হয়ে রইল!’’ কারণ, এর পরই দল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যে, এত ‘পরিশ্রম’ করে তৃণমূলের আর কাউকেই ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতে হবে না! সহজ সরল বাংলায় বললেই চলবে!
রফিকুর একা নন, তৃণমূলে ইংরেজি বিড়ম্বনা ইদানীং বেড়েছে! দলে এমনও বিধায়ক রয়েছে যাঁরা ইংরেজিতে বক্তৃতায় দেওয়ায় স্বচ্ছন্দ বললেও কম বলা হয়, এক কথায় তুখোড়! যেমন নদীয়ার করিমপুরের বিধায়ক মহুয়া মৈত্র। পড়াশুনা ও চাকরি সূত্রে দীর্ঘ দিন বিদেশে ছিলেন মহুয়া। অভ্যাসবশতই ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন তিনি। কিন্তু তৃণমূল নেতারাই স্বীকার করছেন, ওঁর বক্তৃতা তথ্য সমৃদ্ধ হলেও শুধু ভাষার কারণে অনেক সতীর্থ বিধায়কের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি মহুয়াকে সেটা ডেকে বলেওছেন পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। মহুয়াও তাঁকে কথা দিয়েছেন, যত়টা সম্ভব বাংলাতেই বলবেন।
কিন্তু কেবল মহুয়াকে সমঝে দিয়েই পার্থবাবুর সমস্যা মেটেনি। বিড়ম্বনা হচ্ছে রফিকুরদের নিয়ে। দলের এক শীর্ষ সারির নেতা জানান, অনেকে এমন ইংরেজি বলছেন, তাতে আমাদেরই অস্বস্তি হচ্ছে। কেউ বা দু’লাইন ইংরেজিতে বক্তৃতা দিয়ে খেই হারিয়ে তার পর বাংলায় বলছেন। কেউ ইংরেজিতে বলার চেষ্টা করছেন, অথচ ব্যকরণগত নানান ভুলে ভরা কথা বলছেন। সমস্যা হল, তাতে যে বিষয়ের উপর বিতর্ক হচ্ছে তার থেকেই দৃষ্টি সরে যাচ্ছে। এর থেকে সবাই বাংলায় বললেই ভালো। পরিস্থিতি এখন দাঁড়িয়েছে যে সরকার পক্ষের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষ প্রতিদিন বিভিন্ন বিল বা বিতর্কের জন্য দলের তরফে বক্তা তালিকা তৈরির আগে ইচ্ছুক বক্তাদের পাখি পড়ানোর মতো বলছেন,‘‘প্রয়োজনে এক আধটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহারে অসুবিধা নেই। কিন্তু মোটের উপর বাংলাতেই বলবেন। একেবারে সরল মাতৃভাষায়!’’
কখনও আবার কবিয়ালের মতো নির্মলবাবু দলের নেতাদের বলছেন, ‘‘খাতা দেখে গান গেয়ো না, উল্টে পাতা যেতেই পারে!’’
রাজ্য মন্ত্রিসভার এক বর্ষীয়ান সদস্য অবশ্য বলেন, ইংরেজিতে বক্তৃতা দেওয়ার চেষ্টা খারাপ নয়। তবে যাঁরা রাজনীতি করছেন, তাঁদের মাথায় রাখা উচিত তিনি বিষয়টি কীভাবে উপস্থাপন করলে তা মানুষের বোধগম্য হবে। তাই খেয়াল করলে দেখা যাবে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনওই বিধানসভায় বা কোনও জনসভায় ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন না। বরং এমন সহজ ও চলতি ভাষায় বক্তৃতা দেন যাতে মানুষের মনে হয় তিনি তাঁদেরই এক জন। ইদানীং জাতীয় রাজনীতি সম্পর্কে বার্তা দেওয়ার সময় তিনি হিন্দি বা ইংরেজির ব্যবহার করলেও তা সেটুকুতেই সীমিত রেখেছেন মমতা। অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র, পূর্ত মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, পরিবহণ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় বা শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও একই কারণে বিধানসভায় বাংলাতেই বক্তৃতা দেন। বাকিদেরও এটা বুঝতে হবে।